পরিবহনগুলোকে সিসিটিভির আওতায় আনা প্রয়োজন


Published: 2020-12-29 13:42:49 BdST, Updated: 2021-01-20 09:14:43 BdST

জিসান তাসফিকঃ ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে বাস থেকে লাফ দেওয়া কিংবা চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে ফেলে দেওয়া বা হত্যা করা এগুলো এখন প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই কথাগুলো যখন মানুষের নজরে পরে তখন তাদের মাঝে আতঙ্ক আর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ শনিবার সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের সড়কে এমনই আরেক ঘটনার কথা গণমাধ্যমের দ্বারা জানা যায়।

সেখানে অভিযুক্ত করা হয়েছে বাসচালক ও হেলপারকে। যেখানে কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রীকে সম্ভ্রম রক্ষার্থে বাস দিয়ে লাফ দিয়ে আহত হয়েছ। চলন্ত বাসে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। শুধু ধর্ষণ নয়, চলন্ত পরিবহনে আরও অপরাধ হয়ে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ছিনতাই, চুরি, গাড়ি হতে ফেলে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আবিস্কারের মধ্যে অন্যতম হল পরিবহন ব্যবস্থা। বাস, ট্রাক, মোটার সাইকেল সহ বিভিন্ন রকমের গাড়ি তথা মোটরযান পরিবহন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত যাতায়াতের জন্য বাস, মিনিবাসসহ ছোট ছোট পরিবহন ব্যবহার করা হয়। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত গরিব শ্রেণির লোকজন অর্থাৎ যাদের নিজেস্ব পরিবহন ব্যবস্থা নেই তারাই যাতায়াত করে থাকে। দূরপাল্লার পরিবহন কিংবা স্বল্প যাত্রার, সব ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যবস্থা থাকে।

এর তদারকির দায়িত্বে থাকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য থাকে বাংলাদেশ পুলিশের হাইওয়ে পুলিশ বিভাগ ও স্থানীয় থানা গুলো। এছাড়াও পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিজস্ব সমিতি রয়েছে। কিন্তু এত ব্যবস্থার পরেও কোনো ক্রমেই অপরাধের সংখ্যা কমে নাই আর এর দায়ভার কেউই নিতে চায় না। দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সেই ক্ষতি নিয়েই থাকতে হয়। বাস্তবতা হল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এ ব্যাপারে উদাসীন।

ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, গাড়ি চাপা দেওয়া সহ অন্যান্য অপরাধগুলোও চলন্ত পরিবহনে হয়ে থাকে । এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব এটি আশা করা একদমই ভুল। কারণ সমাজে খারাপ মন প্রভৃতির মানুষ থাকবেই। আর তাছাড়া এর কিছুসংখ্যক অপরাধ অসাবধানতাবশত কিংবা ভুলের কারণে হয়ে থাকে, যেমন সড়ক দূর্ঘটনা।

কিন্তু নজরদারী এবং আইনের শাসন সুষ্ঠু ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা গেলে এর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে অধিকাংশ যাত্রী পরিবহনে কোনো সিসি টিভিফুটেজ ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ বাসের অভ্যন্তরে বাস চালক, হেলপারগন ও যাত্রীগণের মধ্যে গতিবিধি ও কার্যকলাপে নজরদারী করার কোনো উপায় নাই। তবে এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় তা হল এতগুলো বাস নজরদারী করা আদও কি সম্ভব! সিসিটিভি সংরক্ষণের উপায় থাকতে হবে।

যখন যে বাসের নামে অভিযোগ আসবে, তখন সে বাসের সিসিটিভি ফুটেজে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে এখানেও মানুষের প্রশ্ন থাকতে পারে যে অপরাধীরা যদি সংরক্ষিত সিসিটিভি ফুটেজকে নষ্ট অথবা গরমিল করে তাহলে অপরাধী শনাক্ত কিভাবে হবে? এখানে বলা রাখা ভালো যে এত অল্পসময় সব বিনষ্ট করা যায় না এবং আর যদি করা হয়ও, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যাবে অপরাধ হয়েছে কিনা এবং কারা অপরাধী?

এছাড়াও জিপিএস ট্রাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে অপরাধ সংগঠনের সময়ে ঐ স্থানে কারা ছিল তাও ধরা সম্ভব। জিপিএসের মাধ্যমে মোবাইল ট্রাকিং করা যায় আর বর্তমান যুগে মোবাইল ব্যবহার করে না এমন মানুষ নেই বললেই চলে।

এছাড়াও প্রচলিত সমাজে প্রচলিত আইনের ও সংশোধনের প্রয়োজন আছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ ও আছে যে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩৩ (১) অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে। ন্যায়বিচারের মূলনীতি অনুযায়ী Every person is innocent until prove guilty অর্থাৎ দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ। আর এধরনের মামলাতে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত করতে হয়।

( Proved beyond reasonable doubt ) এগুলো সারা বিশ্বের সবধরনের বিচার ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশের মামলার সাক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ের সাক্ষ্য আইন ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা । অপরাধী সনাক্তকরণের নতুন পদ্ধতি, সিসিটিভি ফুটেজ ও জিপিএস সহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি উক্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। যার ফলে সিসিটিভি ফুটেজে যতই অপরাধী যতই সনাক্ত হয় না কেন? বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত থেকে যায়। আর আসামীরা চাইলে এর সুযোগ নিতে পারে।

২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধন করে এখানে মৃত্যুদণ্ডের বৃদ্ধি ও সাক্ষ্য হিসেবে ডিএনএ কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেটা কেবল ধর্ষণ হবার পরের বিষয়। কিন্তু ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়েছে এটাও ধর্ষণের মত অপরাধ নয় ঠিকই কিন্তু কোনো অংশে কমও নয়। কেননা যদি এখানে নারী নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হত তাহলে সেও ধর্ষণ শিকার হত এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে হত্যা ও করা হয়। পার্শ্ববর্তি রাষ্ট্র ভারতের সাক্ষ্য আইনের Electronic Evidence নামে এই ধরনের সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা আছে। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী আইন প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করা।

সিসিটিভি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন হলে বাসের অভ্যন্তরে ও এর সংলগ্ন অপরাধ কমে যাবে। কেননা তখন সবাইকে দেখবে যে তাদের কার্যকলাপের ভিডিও সংরক্ষিত করা হচ্ছে এবং আইনের অন্তর্ভুক্ত। খুব সহজে ধরা পরার ভয়ের কারণে অপরাধগুলো করতে চাইবে না। আর সর্বশেষে অপরাধীকে শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সেটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে। সর্বোপরি বলা যেতে পারে যে সিসিটিভি ফুটেজ সহ আধুনিক ব্যবস্থা পরিবহনগুলোতে বাধ্যতামূলক করা হলে বর্তমান সরকার ও দেশের জন্য সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে।

লেখক:
জিসান তাসফিক
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।