প্রতিবন্ধকতার আবর্তে অনলাইনে উচ্চশিক্ষা কতটুকু সফল হবে?


Published: 2020-09-06 19:39:24 BdST, Updated: 2020-10-02 05:05:23 BdST

ড. মোঃ হাসনাত কবীরঃ অনলাইনে উচ্চশিক্ষা সারা বিশ্বে একটি স্বীকৃত শিক্ষা ‌মাধ্যম। এটি শ্রেণী কক্ষে পাঠদানের সমতুল্য না হলেও বিকল্প ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যতটা না আত্মিক হয় তার চেয়ে বেশী হয় প্রফেশনাল। ফলে ছাত্র-শিক্ষকের মধুর সম্পর্ক বা পাঠদানের কলাকৌশল বিষয়ে যে প্রচলিত ধারণা সেটা কম পাওয়া যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

তবে বর্তমানে ডিজিটাল টেকনোলজির আশির্বাদ, আর্থিক সাশ্রয়ী, নামি-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুরত্ব বিবেচনায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমাগত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক নামি প্রতিষ্ঠান যারা শিক্ষা ও গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত তা‌রাও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশে অনলাইন উচ্চশিক্ষা কতটা যৌক্তিক বা অন্য ভাবে বললে আমরা কতটুকু প্রস্তুত। যদিও আমরা ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজিতে অনেকখানি অগ্রসর হয়েছি, তথাপি অনলাইনে উচ্চশিক্ষা পরিচালনা করার মতো অবকাঠামো এখনো গড়ে উঠেনি। যারমধ্যে দেশব্যাপী দ্রুত গতির ও নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা অন্যতম। ক্লাস রুমের বিকল্প হিসেবে অনলাইনে শিক্ষা সেবা দেওয়ার জন্য যেসব আধুনিক টেকনিক্যাল সাপোর্ট/প্লাটফর্ম প্রয়োজন সেগুলোও আমাদের নেই, তবে তৈরি করা সম্ভব। সর্বোপরি আমরা মানুষিক ভাবে এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এর অন্যতম কারণ এবিষয়ে আমরা এতদিন তেমন কোন চিন্তা-ভাবনা করি নাই।

প্রয়োজনের তাগিদে এখন আমরা চিন্তা করছি বা করতে বাধ্য হয়েছি কারণ "করোনা মহামারী"। বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনর আয়ুস্কাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য না থাকায় প্রায় ৪০ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয় এই বিষয়ে সবাই একমত। বিশেষজ্ঞদের মতে করোনার আয়ুস্কাল যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে এই সব ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কী?

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে ছাত্র-ছাত্রীদের অফুরন্ত অবসর সময় কিছুটা কাজে লাগবে এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা হবে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে তাদের স্বস্তি ফিরে আসবে এবং পাঠ্যক্রম এগিয়ে যাবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা যেকোন সময় অনলাইন থেকে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরে যেতে পারব। আর যেখানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো উচ্চ শিক্ষা অব্যাহত রেখেছে।

সেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শুরু না করলে ছাত্র-ছাত্রীরা ভয়ানক সেশনজটের কবলে পড়বে, এমনিতেই তাদের বিভিন্ন কারণে সেশনজটের শিকার হতে হয়। পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী বৈষম্যের শিকার হবে এবং চাকুরীর আবেদনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাবে।

উপরোক্ত বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০-৪০ % ছাত্র-ছাত্রীর অনলাইনে ক্লাস করার আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা সহ আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন মাধ্যম এবং সূধী জনের মতামত থেকে উঠে এসেছিল। অনলাইন ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিত আশানুরূপ হবে না এটা বাস্তবতা।

বর্তমানে অনলাইন ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতি প্রায় ৫০%। কোন কোন সহকর্মীর ক্লাসে উপস্থিতর চিত্র আরও করুণ। এর অন্যতম কারণ ইন্টারনেট স্পিড এবং ডেটা প্যাক ও ডিভাইস কেনার সামর্থ্য। ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর দ্রুত উন্নতি সম্ভব নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র তাদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ চলে টিউশনি করে। করোনা কালে সেই উপার্জনও বন্ধ।

পারিবারিক আয় কমে যাওয়ায় তারা বিপাকে। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা যোগান দেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। আর যারা ক্লাস করছে, হয়তো তাদের পক্ষেও বেশি দিন কনটিনিউ করা সম্ভব হবে না। সরকার অথবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশনের পক্ষ থেকে এই সমস্যা সমাধানের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই কাম্য।

পরিকল্পনাহীন অনলাইন শিক্ষা ছাত্রদের কোন উপকারে আসবে না। এতে ছাত্রদের শুধু অর্থ ও সময় নষ্ট হবে। উপরন্ত যেসকল শিক্ষার্থী চাকুরী বা উচ্চতর ডিগ্রি জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি তাঁরা বাঁধা গ্রস্থ হবে। খুব সাধারণ ভাবে বললে - একটি ইয়ারে ৫ (পাঁচটি) কোর্স আছে, তিনটি কোর্সের অনলাইন ক্লাস হচ্ছে কিন্তু দুইটি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ছাত্রদের সেশনজট কমার কোন সম্ভাবনা থাকবে না।

প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিজেস্ব নিয়ম-কানুন অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। কাজেই যেকোনো প্রতিষ্ঠান নিজে উদ্যোগী হয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও পরীক্ষা গ্রহণের সতন্ত্র কৌশল প্রনয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যার বিচারে ছোট ও মাঝারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাদের অধিভুক্ত কলেজ নেই বা থাকলেও সংখ্যায় অনেক কম, তাঁরা অনেকটাই সুবিধা জনক অবস্থায় আছে। প্রায় ৩০ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যাদের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১০ হাজারের কম।

এর মধ্যে প্রায় ২০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী আবার ৫ হাজারের নীচে। এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস অনেকটাই সহজ। ছোট এবং অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রী অনুপাতে সম্ভবত বাজেট কিছুটা বেশি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন ও শিক্ষক সমিতি এবিষয়ে চিন্তা ভাবনা করতে পারে। যদিও সকল ছাত্র-ছাত্রীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন, তথাপি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে।

ক্লাস করা সম্ভব না হলেও যেসব ছাত্র ছাত্রীর দুই-একটি পরীক্ষা আটকিয়ে গিয়েছে বিশেষত টার্মিনাল ডিগ্রী (৪র্থ বর্ষ ও মাস্টার্স) তাদের পরীক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবস্থা নিতে পারে। যেহেতু গণপরিবহন সহ সবকিছুই চলছে, সেহেতু ছাত্র-ছাত্রী নির্দিষ্ট দিনে বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরে আসবে।

অথবা সিমিত পরিসরে শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আবাসিক হল খোলা রাখা যেতে পারে।বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি সাবজেক্টে ২০-১০০ ছাত্র-ছাত্রী থাকে,‌ সব ক্লাস ফাঁকা থাকাই সর্বোচ্চ সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সকল পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব। পর্যায়ক্রমে সকল ইয়ারের পরীক্ষা নেওয়া ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সল্প মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে টেলিটক। এতে ছাত্রদের কিছুটা আর্থিক সাশ্রয় হবে। দেশের অন্য মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো এই ক্রান্তিকালে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে দাঁড়াতে পারে। সমাজের বিত্তবানরা ব্যাক্তিরা এগিয়ে আস্তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন ও শিক্ষককের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

অনলাইনে উচ্চশিক্ষার প্রতিবন্ধকতা গুলো চিন্তিত হয়েছে। আমাদের আর্থিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এবিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে সরকারসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিন্তা ভাবনা করা দরকার। ইতিমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্তহীনতায় অনলাইনে উচ্চশিক্ষা মাঝপথে মুখথুবড়ে পরার সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. মোঃ হাসনাত কবীর
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর
ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ০৬ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আরআর//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।