সিনহা হত্যা ও বাংলাদেশের রুগ্ন আইন কাঠামো


Published: 2020-08-20 16:54:49 BdST, Updated: 2020-10-31 16:45:59 BdST

ইসরাফিল রনিঃ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মেজর অবঃ রাশেদ খান সিনহা হত্যা মামলায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এ পি ভি এন) ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে (র‌্যাব) এ নিয়ে এ ঘটনায় ১০ পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।

মামলার ভাষ্যমতে টেকনাফের শামলাপুরে তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় মেজর অবঃ সিনহা। পুলিশ থেকে পরে বলা হয় নিহত ব্যক্তি ছিল মাদক ব্যবসায়ী। যাইহোক, নিঃসন্দেহে এটি বিচারবহির্ভূত অবৈধ হত্যা।

আসুন জেনে নেয়া যাক এদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার সূত্র, ইতিহাস এবং অসহায় আইন ও সংবিধানের ইতি ও বর্তমান কথা।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড হচ্ছে এক প্রকার বে-আইনি হত্যাকান্ড যাতে সাধারণত রাজনৈতিক ব্যবসায়িক বা সামাজিক ব্যক্তিত্ব অথবা অপরাধীকে রাষ্ট্রপ্রদত্ত আইনত বিচারের পূর্বেই হত্যা করা হয়। এটি সাধারণত সশস্ত্র বাহিনী দ্বারাই হয়ে থাকে। বর্তমান বাংলাদেশ এমন বীভৎস হত্যাকান্ডে বিশ্ব মানচিত্রে কুলষিত হয়ে আছে।

আমরা যদি এমন অমানবিক হত্যাকান্ডের দিকে তাকাই আমাদের চোখে ভেসে উঠে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে কিভাবে শান্তিবাহিনী দ্বারা বেপরোয়া বিচারবহির্ভূত হত্যা চালানো হয়েছে। এর দীর্ঘকাল পর বিএনপি জামাত জোট ২০০২ সালে ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে এমন হত্যাযজ্ঞ চালায়। আবার ঐ হত্যাকে বৈধতা দিতে যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন ২০০৩ প্রনয়ণ করা হয়। যাইহোক, ২০১২ সালে ১৪ জুন উক্ত আইনকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

এবার আসি শেখ হাসিনা সরকারের কথায় আমরা দেখতে পাই ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ফলাও করে বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধের বিষয়টি লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার এখন এমন হত্যাকান্ড বন্ধের আদৌ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে? ডিসেম্বর ২০১৯ এ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ইত্তেফাককে জানায় চলতি বছরে ১১ মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়ছেন ৩৬২ জন। জোট হিউম্যান রাইর্টস ফোরাম বাংলাদেশ ২০২০ এর ১৫ জুন রিপোর্টে দেখান ১ বছরে দেশের বন্ধুকযুদ্ধে নিহত ৪৮১, শারিরীক নির্যাতনে ২৩, লাশ উদ্ধার ৩১।

এবার আইন কি বলে দেখা যাক,আমরা জানি আইন হচ্ছে কিছু নিয়মনীতি যা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য তৈরি হয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগ হলো অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর নিরাপদ ও শেষ আশ্রয়স্থল। একই সাথে বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবকও বটে। দেখা যাক সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক গুলি করা এবং হত্যা নিয়ে আইন কি বলে।

police Regulation Bengal (PRB) পুলিশের জন্য পুর্নাঙ্গ আচরণ বিধান। এই আইনের ১৫৩ ধারায় পুলিশকে ৩টি ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
১। ব্যক্তির আত্মরক্ষার।
২। বেআইনি সমাবেশ ছত্র ভঙ্গ করতে।
৩। কতিপয় পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার কার্যকর করার জন্য।

উল্লেখ্য, দণ্ডবিধি ৯৬-১০৬ ধারাবলে পুলিশ নিজের বা অন্যের জানমাল রক্ষায় গুলি ব্যবহার করবে। ফৌজধারি কার্যবিধি ১০৭-১২৮ ধারামতে প্রথমে ছত্রভঙ্গের নির্দেশ দিবে পরে বলপ্রয়গের নিয়ম রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডনীয় অপরাধী হলেই কেবল মৃত্যু ঘটানো যায়। ১৫৩(ঘ)।

যদি বাংলাদেশ সংবিধানের দিকে নজর দিই। ধারা ৩১ঃ প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। ৩২ ধারামতে আইনানুগ ভিন্ন কাউকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। ৩৫(৩) বলা হয়েছে ফৌজধারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেকের আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত বিচার লাভের অধিকারী হবে।

এছাড়াও মানবাধিকার সনদের ৩, ৭, ১০ ধারায় সাম্য,ন্যায় স্বাধীনতা এবং আইনের আশ্রয় ও সু বিচার পাওয়ার বিষয়টি লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশের মোড়লদের দ্বারা আমাদের মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। হত্যা,খুণ,গুম ও রাহাজানি যেন এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দিনে দুপুরে এমন নগ্নহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলারও যেন কেউ নেই। কিছুদিন আগেও আমেরিকাতে এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় প্রথমে আামেরিকা পরে সারা বিশ্ব কম্পিত হয়েছিলো
প্রতিবাদ এভাবেই করতে হয়।

যাইহোক, উপরে আলোচিত বিচারবহির্ভূত হত্যার জঘন্য চিত্রটি আইন ও মানবতার সাথে সাংঘর্ষিক। আমাদের দেশের সর্বস্তরের সকল রাজনৈতিক এবং সামাজিক দল, জাত ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ যদি এখনো এ বিষয়ে সোচ্চার না হয় তবে এটি আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে যা কখনো নির্মূল করা যাবেনা।

লেখক:
ইসরাফিল রনি
আইন বিভাগ, ২য় বর্ষ, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২০ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজে//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।