করোনা: ভাবতে হবে পোল্ট্রি ও ডেইরি খাত নিয়েও


Published: 2020-05-09 21:25:53 BdST, Updated: 2020-05-30 20:47:52 BdST

ইফতেখার হোসেন চৌধুরী: সভ্যতার উন্নয়নের ফলে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পুরো পৃথিবীব্যাপী দিনে দিনে বাড়ছে ডেইরি এবং পোল্ট্রি ফার্ম। বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও বাড়ছে ডেইরি ও পোল্ট্রি ফার্ম যা দেশের প্রাণীর আমিষের যোগানের পাশাপাশি লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এবং ডেইরি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের কারণে দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠছে ডেইরি ফার্ম ও পোল্ট্রি ফার্ম। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের এ গুরুত্বপূর্ণ খাত।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে দেশে প্রায় ৮১ হাজার নিবন্ধিত ডেইরি ফার্ম আছে যা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বিগত কয়েক বছর ধরে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে দুগ্ধ খাতে উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ৩০ হাজার লাখ টন থেকে বেড়ে ৯৪ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও দেশের মোট ডিম এবং মুরগীর মাংসের চাহিদা পূরণে সক্ষম আমাদের দেশের পোল্ট্রি ফার্ম গুলো।

বর্তমান সময়ে পুরো পৃথিবীর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু করোনা মহামারি। পুরো পৃথিবীতে দিনে দিনে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশে ও বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। করোনায় সৃষ্টি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার কতৃক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। যার ফলে যান চলাচলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যদিও জরুরী খাদ্য সামগ্রী লকডাউনের বাইরে। দুগ্ধজাত শিল্পের প্রধান ক্রেতা মিষ্টান্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় এবং বড় বড় দুগ্ধজাত প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলো গ্রামীণ পর্যায়ে দুগ্ধ সংগ্রহ কার্যক্রম স্থগিত রাখায় বিপাকে খামার মালিকরা। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে দুগ্ধ সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছে খামার মালিকরা।

ডেইরি শিল্পের মতো পোল্ট্রি শিল্পের সার্বিক অবস্থাও দিনে দিনে অবনতির পথে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বয়লার জাত মুরগী নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ কতৃক করোনা সংশ্লিষ্ট গুজবের কারণে উৎপাদন খরচের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা লোকসান বয়লার জাত মুরগী বিক্রি করছেন খামারীরা। খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন কারী প্রতিষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকার ফলে এই গরমে খামারীদের জন্য ডিম সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে এই মহামারিতে পাশ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাপথে ডিম আমদানি থেমে নেই। যার ফলে ডজন প্রতি ডিমের দাম কমেছে ২০-৩০ টাকা।

আশারবাণী হলো বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কতৃক ঘোষিত প্রণোদনার একটি বিশেষ অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি ও প্রাণী সম্পদ সংক্রান্ত খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষিত হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে ৪ শতাংশ হারে ঋণ সুবিধা পাবে খামারীরা।

আরো আশার বাণী বিগত ১৯ এপ্রিল সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম খাদ্যের দাম বাড়ানো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন এবং চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ার জ্ঞাপন করেন। তিনি অতি শ্রীঘই প্রাণীসম্পদ সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করবেন বলে জানান। চিন্তার বিষয় এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের ডেইরি এবং পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। করোনা পরবর্তী সময়ে ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্পের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়:

১.বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত প্রণোদনায় কৃষি ও পোল্ট্রি খাতের প্রণোদনার সুষম বন্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
২.বাংলাদেশ ব্যাংক এর সঠিক তদারকির মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম পরিচলনার সাথে সাথে তৃণমূলে ঋণের সুষম বন্টন নিশ্চিতকরণ।
৩.গো-খাদ্য উৎপাদন কারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর রেয়াত করতে হবে
৪.করোনা কালীন সময়ে পোল্ট্রি মুরগী সংক্রান্ত সকল ধরণের গুজব কঠোর হাতে দমন করতে হবে
৫.বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ত্রাণ সহয়তা কার্যক্রমে দুধ,ডিম এবং পোল্ট্রি মুরগীর মাংস অন্তভূক্ত করা যাতে করে জনগণের প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণের সাথে সাথে পোল্ট্রি ও ডেইরী খাতের ক্ষতির পরিমাণ কমানো যাবে
৬.দেশীয় প্রতিষ্ঠান সমূহকে ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি দেওয়া।
৭.করোনা পরিস্থিতিতে দুধ এবং ডিম বহনকারী গাড়িসমূহকে বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে
৮.গো-খাদ্য এবং ভ্যাকসিন ব্যবসায় বিদেশী কোম্পানির দৌরাত্ম্য কমাতে হবে।
৯.করোনা পরিস্থিতিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কতৃক গো-খাদ্যের দাম বাড়ানো কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
১০.করোনা কালীন সময়ে জেলা ও উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয় সমূহকে আরো বেশী খামারী বান্ধব গড়ে তুলতে হবে যা খামারীদের ক্ষতি পোষাতে সকল ধরণের সহয়তা এবং মনোবল বৃদ্ধি করবে।
১১.উপজেলা পর্যায়ে কম খরচে সব ধরণের টিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
১২.বীমা কোম্পানি গুলোতে পোল্ট্রি বীমা চালু নিশ্চিত করতে হবে।
১৩.গুঁড়া দুধ আমদানিতে বেশি পরিমাণ শুল্ক আরোপ করতে হবে।
১৪.দেশব্যাপী সরকারী ব্যবস্থাপনায় দুগ্ধ সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে হবে।
১৫.পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে গরু এবং মহিষের প্রক্রিয়াজাত করা মাংস আমদানি বন্ধ করতে হবে।

বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বলা যায়, করোনা পুরো দেশের পোল্ট্রি এবং ডেইরি খাতে যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে তা উত্তরণে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।খামারী বান্ধব প্রকল্প গুলো যেনো লাল-ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকা পড়ে না যায় সেদিকে বিশেষ নজরদারি করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, করোনা সংক্রমণ হ্রাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো পুরো মন্ত্রণালয় এবং এর অধিনস্ত সকল কার্যালয় সমূহের একাগ্রতা এবং খামারীদের সচেতনতাই পারে করোনা কালীন ক্ষতি পুষিয়ে ওঠতে।

লেখক: ইফতেখার হোসেন চৌধুরী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ০৯ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।