অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষা: শিক্ষার্থীদের না


Published: 2020-05-07 14:39:59 BdST, Updated: 2020-05-25 14:15:06 BdST

মাশরাফি বিন মোক্তার, শাবি: সারা দেশ এখন করোনার জ্বরে কাঁপছে। এর ভয়াল থাবায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই। আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিন শত শত বনি আদম। এই ক্লান্তিকালে করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন তাদের দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন সেখানে ইন্টারনেটের খরচ বহন করা তাদের উপরে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা ছাড়া কিছু নয়। শিক্ষার্থীদের টিউশন বা খন্ডকালীন কাজ নেই। ঘরে ঘরে উপার্জন বন্ধ। কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না। অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথ বন্ধ। এদের সন্তানেরাই তো এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ে। তাই এই ফি এর বোঝা আরো সংকটাপন্ন করবে দেশের মানুষকে। করোনা পরবর্তী যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে, তাও ভোগাবে মানুষকে। তাই ফি কেবল শিথিল বা নমনীয় নয়, অবিলম্বে এক সেমিস্টার ফি মওকুফ করার দাবি করছি।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের দুর্বলতার কথা আমরা সবাই জানি। একই সাথে সকলেরই অনলাইনে ক্লাস করার উপযোগী ডিভাইস আছে এমন ভাবাটা বাতুলতা। তাই  অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিনীত ভাবে আমি ও আমার  সহপাঠিদের পরামর্শ বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানাচ্ছি।

১। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় আমাদের মাঝে অনেকেই আছে যারা দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিজেদের মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে। বর্তমানে তারা সবাই ঐসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবারের সাথে অবস্থান করছে। এরকম অনেক অঞ্চল আছে যেখানে এখনও ভালোভাবে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, উপরন্তু 3G/4G নেটওয়ার্ক সেসব এলাকায় এখনও যায় নি। এসব এলাকার কেউ যে অনালাইনে ক্লাস করতে পারছে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২। দেশে এখন বর্ষাকাল চলছে। আমাদের দেশে বিদ্যুতের উন্নয়ন হলেও এখনো প্রায় সব এলাকায় অল্প বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে যারা ব্রডব্যান্ড বা WiFi-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট চালায় তারা মাঝে মাঝেই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

৩। যারা মোটামোটি ভালো নেটওয়ার্কের আওতায় আছে তারাও সবাই ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়ার মত আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়। দেশের এই অবস্থায় আমরা অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক সমস্যায় পড়েছি। এর ফলে পূর্বের অনেক স্বাবলম্বী পরিবারও এখন বিপদের সম্মুখীন। এমনকি অনেক শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সাহায্য দেওয়া হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটের জন্য অর্থ খরচ করা অনেকের জন্যই সম্ভবপর নয়।
আমরা নিজেরা হিসাব করে দেখেছি যে প্রতিটি এক ঘন্টার ক্লাসে কমপক্ষে ১৫০-২০০ মেগাবাইটের ডাটা প্রয়োজন। অর্থাৎ ৫-৬ টি ক্লাস করতে আমাদের ১ গিগাবাইটের বেশি ডাটা লাগবে। বর্তমানে বিভিন্ন অপারেটরের ডাটার মূল্য ও মেয়াদের পার্থক্য থাকলেও এই মূল্য প্রায় ৫০-৯০ টাকা প্রতি গিগাবাইট।

এদিকে আমাদের স্বাভাবিক সময়ে ব্যাচভেদে সপ্তাহে গড়ে ১২-১৭ ঘণ্টা থিওরি ক্লাস হয়। সুতরাং, নিয়মিত ক্লাস হলে আমাদের প্রতি সপ্তাহে ইন্টারনেটের পিছনে কমপক্ষে ১০০-৩০০ টাকা খরচ হবে যা মাস শেষে ৪০০-১২০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। উক্ত হিসাব শুধুমাত্র মোবাইল ইন্টারনেটের হিসাব এবং জানুয়ারি থেকে জুন সেমিস্টারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে সাধারণত মাসে ১০০০-১৫০০ টাকা বিল হয়ে থাকে।

৪। অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও ভালো নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও লকডাউনের কারণে বাহিরে যেতে পারছে না। এ অবস্থায় ইন্টারনেটের জন্য রিচার্জ অথবা বিল দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না অনেকের জন্য।

৫। শিক্ষার্থীদের মাঝে অনেকেই আছে যারা তাদের পরিবারের বড় সন্তান। এ অবস্থায় পরিবারের সাথে থাকার কারণে অনেককেই সারাদিন বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালন করা সহ বাবা-মাকে সাহায্য করতে হয়। এ অবস্থায় তাদের জন্য অনলাইন ক্লাসে সময় দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।

৬। আমাদের সব ব্যাচে ৩০-১০০ জন শিক্ষার্থী। এতজন শিক্ষার্থী একসাথে অনলাইনে ক্লাস করলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে মতামত আদান-প্রদান অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ধীরগতির ইন্টারনেটের দরূণ ভিডিও লোডিং নিতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়। ভিডিও ব্যবস্থা UDP সংযোগ হওয়ার ফলে যথাযথ স্পীড না থাকলে লেকচারের মাঝের তথ্য হারিয়ে যায়। এছাড়াও অনেক সময় অনেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকার কারণে নয়েজের সৃষ্টি হয় যা মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটায়।

৭। উল্লেখিত ৬ নং সমস্যার সমাধান হিসেবে অনেক শিক্ষক ক্লাস রেকর্ড করে আপলোড দিয়ে থাকেন। কিন্তু এরপরও রেকর্ডেড ক্লাস ডাউনলোড করে দেখতে লাইভ ক্লাসের থেকেও অতিরিক্ত ডাটা খরচ হয়। আবার যারা খারাপ নেটওয়ার্কে থাকে তারা রেকর্ডেড ক্লাস ডাউনলোড করতেও সমস্যার মুখোমুখি হয়। এছাড়াও রেকর্ডেড ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কোন ধরনের প্রশ্ন থাকলে তা করতে পারে না। ফলে তা সরাসরি ক্লাসের মত ফল দেয় না।

৮। এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের আগে হতে হয় নি। এই কথা যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য সত্য, তেমনি শিক্ষকদের জন্যও সত্য। অনেক শিক্ষকই আছেন যারা অনালাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। তাদের জন্য হঠাৎ করে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর শিক্ষকদের লিখে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো টুল থাকলেও পূর্ব প্রশিক্ষণ না থাকার দরূণ অনেক শিক্ষকের পক্ষে অনলাইন ক্লাসে এসব টুল ব্যবহার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে তারা শুধু অনলাইন ক্লাসে বই, অথবা স্লাইড দেখে যা পড়েন, শিক্ষার্থীদের তাই শুনতে হয়। এভাবে শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের ক্ষতি ছাড়া তেমন কোন উপকারে আসবে না বলে আমরা মনে করি।

৯। বর্তমানের মহামারীতে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকে মারা যাচ্ছে। এর মাঝে আমাদের নিজেদের পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরাও আছেন। প্রতিদিন এ ধরনের খবর আমাদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলছে। আমরা সবাই নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছি। এমন অবস্থায় অনলাইনে ক্লাস করা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও হুমকির মুখে ফেলবে বলে আমরা মনে করি।

১০। সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদের সবার জীবনের বড় একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব কোর্সই আমরা চাইলে অনলাইনে করতে পারি। কিন্তু এরপরও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই শিক্ষার সুন্দর পরিবেশের জন্য। এরপরও যদি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সেই ক্লাসের মাধ্যমে প্রাপ্ত শিক্ষা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা দেয়া সম্ভব নয়।

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সিলেট।

ঢাকা, ০৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।