''পৃথিবী নতুন চ্যালেঞ্জের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে"


Published: 2020-04-18 11:16:36 BdST, Updated: 2020-05-28 16:52:59 BdST

ফারহান ইশরাক: মানুষ আজ অসহায়। দিশেহারা। করোনার ভয়াবহ কড়াল গ্রাসে বিশ্ব সভ্যতা আজ লন্ড-ভন্ড। আধুনিক সব আয়োজন যেন এলোমেলো-তছনছ। ক্ষমতাধর ও বাঘা বাঘা রাস্ট্র নায়করা হিমশিম খাচ্ছে। কোভিড-১৯ এর থাবা যেন সর্বত্র। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিস্কারে ব্যর্থ। এমনি এক পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে মার্চের ১৬ তারিখ।

১৮ তারিখে হল থেকে বাসায় ফিরি। প্রথম ক'টা দিন ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে, আবার চিরচেনা সবুজ চত্বরে ফিরে যাব। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অবরুদ্ধ জীবন আরো দীর্ঘায়িত হলো৷ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ দিল অনির্দিষ্টকালের জন্য। নিজের আর পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে ঘর থেকে বের হওয়ারও উপায় নেই।

অগত্যা এক ধরনের গৃহবন্দী জীবনই কাটাতে লাগলাম। একঘেয়ে ঘরে থাকার ক্লান্তিও মানিয়ে নিয়েছি কিছুটা। দীর্ঘদিন ধরে রাত জাগার অভ্যাস থাকায় এই বন্দী জীবনেও ঘুমাতে ঘুমাতে রোজ চারটা-সাড়ে চারটা বেজে যায়। তাই ইচ্ছে থাকলেও বেলা ১২টার আগে দিনের আলো দেখার সৌভাগ্য হয় না আর।

যদিও এ অখণ্ড অবসর ভীষণ ক্লান্তিকর, কিন্তু দিনগুলো কীভাবে যেন কেটে যাচ্ছে। একেক দিন একেকভাবে৷ অনেকগুলো বই পড়া বাকি ছিল, সেগুলো পড়ে শেষ করলাম। এখনো আরও বেশ কিছু বাকি। মুভিও দেখা হলো প্রচুর। এভাবেই সময় কাটছে। সাথে বেশ কিছু অনলাইন কোর্সও সঙ্গ দিচ্ছে এই অবসর সময়ে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ জানাই অনলাইল প্রোগ্রামে যুক্ত করার জন্য।

তা নাহলে এই বন্দীজীবন আরো বেশি অসহনীয় হয়ে উঠত। তবে এর বাইরেও একটা দুশ্চিন্তার রেখা দিন যাওয়ার সাথে সাথে বেড়েই চলেছে। করোনা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে কী হবে দেশের স্বাস্থ্যখাতের, কী হবে অসহায় জনগোষ্ঠীর, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি-ই বা কোনদিকে যাবে - এই প্রশ্নগুলো ভাবিয়ে তুলছে অনেক বেশি। করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দেশের সিংহভাগ জনগণ এখনো সচেতন নন।

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার এই সংকটকালেও মানুষের অকারণে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করা যায়নি। আবার দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঘরে বসে থাকারও জো নেই। ঘরে থাকলে ক্ষুধা মিটবে কী করে? সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তাই তাদের প্রতি এগিয়ে আসা উচিত সবার। বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনকে দেখলাম এ ধরনের মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। সমাজের বিত্তবান শ্রেণীরও অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অসহায় মানুষের প্রতি।

নিজ উদ্যোগে এবং অন্যান্য সংগঠনের মাধ্যমে আমিও চেষ্টা করেছি তাদেরকে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করার। এখনো পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে ৭০ টিরও বেশি পরিবারকে ৭-১০ দিনের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছি। মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজার রাখার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। নিজ অবস্থান থেকে সবাই যদি আরো একটু এগিয়ে আসেন, এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য তিনবেলার খাবার ব্যবস্থা করা খুব একটা কঠিন হবে না হয়তো।

কোভিড-১৯ এর এই প্রাদুর্ভাব কতদিন চলবে কেউ জানে না। ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি সারা বিশ্ব। পৃথিবীজুড়ে মৃত্যুর নদী বয়ে চলেছে। উন্নত বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি৷ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হয়তো পৃথিবীর দীর্ঘ সময় লাগবে। দেখতে হবে আরো হাজারো মানুষের লাশ। জীবাণুর ভীড়ে নিজের প্রিয়জনকেও ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ। ত্রাণের চাল চুরি হচ্ছে, মানুষে মানুষে বাড়ছে বৈষম্য। তবে এতসব নেতিবাচকতার ভীড়েও কিছু বিষয় আশার আলো দেখাচ্ছে সবাইকে।

মানুষের প্রতি মানুষ যেভাবে এগিয়ে আসছে, এটি মানবসভ্যতারই জয়গান। আক্রান্তদের পরিচর্যায় জীবন দিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। প্রকৃতির দূষণের মাত্রা কমে আসছে। সামুদ্রিক প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক জীবনধারায় ফিরে যাচ্ছে। করোনা পরবর্তী পৃথিবী তাই হতে যাচ্ছে এক নতুন পৃথিবী। এই নতুন পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলোও হবে ভিন্ন। এতদিন আমরা দেখে এসেছি সামরিক শক্তিমত্তার মানদণ্ডে দেশগুলোকে বিচার করতে। কিন্তু আজ বিশ্বের সামরিক শক্তিধর দেশগুলোও অসহায়।

পৃথিবী আরেকটি অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। নতুন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই মন্দা কাটিয়ে ওঠা। বিশ্বনেতাদের মনোযোগী হতে হবে গবেষণা ও স্বাস্থ্যখাতে সিংহভাগ বাজেট বরাদ্দের জন্য। নতুন কোনো মহামারী যাতে বিশ্ববাসীকে আক্রমণ করতে না পারে, সে বিষয়েও এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে সবাইকে। সমাজে ধনী-গরীবের মাঝে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

রোগী নয়, ঘৃণা করতে হবে রোগকে, যুদ্ধ করতে হবে জীবাণুর বিরুদ্ধে। দুর্দিনের এই ঘোর অমানিশা কেটে যাওয়ার পর, অনাগত সেই নতুন একটি পৃথিবীর অপেক্ষায় এখন বিশ্ববাসী। সে পৃথিবী সাজাতে হবে আমাদেরই। এখন থেকেই নিতে হবে নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার প্রস্তুতি।

লেখাসত্ত্বঃ ফারহান ইশরাক
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

ঢাকা, ১৮ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফই//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।