করোনায় ভ্যাকসিন, ড্রাগ নাকি অ্যাভিগান?


Published: 2020-04-13 21:59:04 BdST, Updated: 2020-05-25 08:14:23 BdST

শফিকুল ইসলামঃ সম্প্রতি ভ্যাকসিন (টিকা) এবং ড্রাগ (ঔষধ) ব্যাপার দুইটি আমাদের কাছে গোলমেলে হয়ে গেছে। যদিও আমি সরাসরি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র নই, তবে এই ব্যাপারে সাধারন একটা ধরনা দেয়ার চেষ্টা করবো। প্রথমেই বলে নেই, কোন নির্দিষ্ট রোগের ভ্যাকসিন আর তার ড্রাগ একই জিনিস না।

ভ্যাকসিন এমন একটি বস্তু যা কোন সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করানো হয় কোন সুনির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্যে। তাই ভ্যাকসিন দেয়ার পর ঐ নির্দিষ্ট রোগের জীবানুর বিরুদ্ধে আমাদের শরীরে এক ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠে এবং পরপর্তিতে ঐ রোগের জীবানু আমাদের শরীরে প্রবেশ করা মাত্র আগে থেকে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা সে গুলোকে মেরে ফেলে।

এর ফলে সেই ব্যক্তি আর ঐ জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়না। অপর দিকে ড্রাগ এমন একটি রাসায়নিক, ভেষজ বা জৈবিক বস্তু যা রোগ নির্ণয়, নিরাময়, চিকিত্সা, বা প্রতিরোধ করার জন্যে ব্যবহার করা হয়। ড্রাগ অবশ্যাই কোন সুনির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত বা অসুস্থ্ ব্যক্তির উপর প্রয়োগ করা হয়।

ভ্যাকসিন (টিকা)

 

তাই কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন যদি কোন করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করানো হয় তিনি সুস্থ হবেন না। তার জন্যে প্রয়োজন কভিড-১৯ এর ড্রাগ। আবার করোনায় আক্রান্ত নয় এমন কেউ যদি আগে থেকেই কভিড-১৯ এর ড্রাগ ব্যবহার করেন এই ভেবে যে করোনা তাকে আর আক্রান্ত করতে পারবেনা, তাহলে তিনি ভুল করবেন। এতে বরং ক্ষতি হওয়ার সম্ভ্যবনা বেশি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন।

বর্তমান বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন এবং ড্রাগ এই দুইটি দিক মাথায় রেখেই কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উভয় ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কারন কোন একটি রোগের ভ্যাকসিন বা ড্রাগ আবিস্কার করে সেগুলোকে সরাসরি বাজারে ছাড়া যায়না। নতুন কোন ড্রাগ বাজারে যাবার আগে তাকে কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (Clinical trials) পার করে যেতে হয়। যেমনঃ

১) ফেইজ-০ (Phase 0): এটি এমন একটি ধাপ যেখানে মনব দেহে প্রথম নতুন কোন ড্রাগ প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রায় ১০-১৫ জন মানুষের উপর অল্প মাত্রায় ড্রাগ প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের পার্শ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ধাপের সফলতার হার প্রায় ১৩% (success rate 13%)। অর্থাৎ এই ধাপে ১০০ টা ড্রাগ মধ্যে মাত্র ১৩ টা ড্রাগ পরের ধাপ অর্থাৎ ফেইজ-১ এ যায়।

২) ফেইজ-১ (Phase I): এই ধাপে প্রায় ২০-৮০ জন মানুষের উপর ড্রাগ প্রয়োগ করা হয় এবং কয়েক মাস পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এই ধাপের সফলতার হার প্রায় ৭০%।

ড্রাগ (ঔষধ)

৩) ফেইজ-২ (Phase II): এই ধাপে ১০০-৩০০ মানুষের উপর ড্রাগ প্রয়োগ করে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ধাপের সফলতার হার প্রায় ৩৩%।

৪) ফেইজ-৩ (Phase III): এই ধাপে প্রায় ৩০০০ মানুষ অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এটি কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই ধাপের প্রধান একটি উদ্দেশ্য হল বর্তমানে আছে এমন কিছু ড্রাগের সাথে এই নির্দিষ্ট ড্রাগের কার্যকারিতা পরিক্ষা করা। এই ধাপের সফলতার হার প্রায় ২৫-৩০%।

সাধারনত কোন নতুন ড্রাগক Food and Drug Administration (FDA) কর্তৃক অনুমোদন পাওয়ার জন্যে ফেইজ-৩ এ উত্তীর্ণ হতে হয়। তারপর ঐ ড্রাগ ফেজ-৪ এ চলে যায়।

৫) ফেইজ-৪ (Phase IV): এই ধাপে কয়েক হাজার মানুশ অংশগ্রহন করে এবং এটি কয়েক বছর ধরে চলে। এখানে প্রধানত নির্দিষ্ট ড্রাগের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এবার আসি বহুল আলোচিত জাপানিজ ড্রাগ “অ্যাভিগান ট্যাবলেটের (Avigan Tablet)” কথায়। এই ঔষধের সত্ত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান ফুজিফিল্ম কর্পোরেশন (FUJIFILM Corporation) গত ৩১ মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করে যে তারা কভিড-১৯ রোগিদের উপরে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে।

উপরে ফেজ-৩ এর সফলাতার দিকে তাকালে আমরা দেখবো, “অ্যাভিগান” এই ধাপে সফল হওয়ার হার ২৫-৩০% এবং এতে প্রায় কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। অতএব আমাদের এখনই “অ্যাভিগান” নিয়ে হৈচৈ করার উচিৎ নয়।

তবে বর্তমান অবস্থার ঊন্নতির জন্যে অর্থাৎ কভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার জন্যে আমাদের দরকার কার্যকরি কোন ড্রাগ। সে ক্ষেত্রে “অ্যাভিগান” দেখাতে পারে আশার আলো। যদি যক্ষ্মা বা গুটিবসন্তের মতো কভিড-১৯ পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করতে চাই, তাহলে আমাদের দরকার কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন যা এই মুহূর্তে বহুদূর।

লেখক: মোঃ শফিকুল ইসলাম
পিএইচডি গবেষক, পদার্থবিদ্যা
তোহোকু ইনিভার্সিটি, জাপান।
ইমেইল: [email protected]

ঢাকা, ১৩ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।