আফা ডাকুম, ম্যাডাম ডাকুম? নাকি খালাম্মা?


Published: 2019-07-31 21:28:47 BdST, Updated: 2019-08-23 03:15:46 BdST

নিলুফার লাকীঃ সকলে আমার মতো অভাগা মাইয়াডার সালাম নিবেন। আমি একজন অসহায় অবলা নারী। কিছু কথা কইতে চাই। হুনবেন আপনারা?

আমি ঢাকা শহরে আইছি দুমাস হইলো। আমার দূর সম্পর্কে চাচাতো বোন একদিন কইলো, গ্রামের মাটি কামরাই পইড়া রইছো কেন? তোমার কে আছে বুড়া হইলে কে দেখবো? বইনের কথাডা মনে ধরলো। হেসাই তো আমার মা মইরা গেলে আমার আর কে থাকলো? স্বামী নাই, স্বামীর বাড়ির দখলদার এখন সতীনের পোলারা, স্বামী মইরা যাওয়ার তিন দিন পর দূরদূর কইরা খেদাইয়া দিছে, মা ভাইয়ের সংসারে খায়, আমারে দেইক্ষা ভাই স্পষ্ট কইরা কইয়া দিছে আমার বাড়িত তোর জায়গা হইবো না ।

আমি গলা উঁচাইয়া কইলাম আমার বাপের অংশের ভাগ বুঝাইয়া দাও তাইলে, আমি মারে লইয়া আলাদা খামু। চাচাতো ভাইটা ভাইয়ের দায়ের কোপ থাইক্যা আমারে বাঁচাইলো, মা কাঁদতে থাকলো জোরে জোরে। চাচাতো ভাইয়ের হাত ধইরা বাপ-ভাইয়ের বাড়ি ছাড়লাম।

চাচাতো বইনডারে কইলাম 'আমি তো লেখাপড়া জানিনা আমারে কে কাম দিবো'? বইন সাহানা ঠোঁটের আগাত হাসি তুইলা কইলো ' তুমি জানোনা বুজি চারিদিকে কামের ছড়াছড়ি, আমার লগে চলো আমি তোমারে একটা বাসা বাড়িত কাম জোগার কইরা দিমু, খাইবা-দাইবা; হাজার হাজার টেকা বেতন পাইবা, একবছর থাকতে পারলে বহুত টেকার মালিক হইয়া বাড়ি ফিরতে পারবা; তখন ভাই কও আর সতীনের পুতদের কথা কও সবাই তোমারে মাথাত তুইলা রাখবো, টেকা ; বুঝলা টেকা হইল যাদুর কাঠি, ছোয়াইবা কিস্তি মাত।

গারমেন্টসের বদৌলতে এখন বাসা বাড়িত কাম কইরা মেলা টেকা বেতন পাওয়া যায় বুজি। কোনো কিছু না ভাইব্বা খালাতো বইন সাহানার লগে চইলা আইলাম ঢাকা। সাহানা পরদিন একটা বাড়িত লইয়া আইলো, দরজায় একটা বোতামে টিপ দিতেই একটা মাইয়া মানুষ সার্ট-গেঞ্জি পইড়া আছে, আইসা দরজা খুইলা দিলো, সাহানারে দেইক্ষা মনে হয় খুশীই হইল।

সাহানা আমারে দেখাইয়া কইলো,' খালাম্মা ওরে লইয়া আইছি। সব কাম করতে পারবো, ঘর মোছা,কাপড় ধোয়া, রান্নাঘরের সবকিছু করবো। আমার বইন লাগে, বিশ্বাসী হইবো, এইডা হলপ কইরা কইতেছি।' বেটাগো মতো পোষাক পরা মাইয়াডারে খালাম্মা কইতে আমার একটু বাধা বাধা ঠেকতেছিলো। মনরে বুঝ দিলাম যেইডা নিয়ম সেইডা তো মানতেই হইবো।

শেষ তক ঠিক হইল আমি ঐ বাসাত বান্দ্ধা কাম করমু। বেতন চার হাজার টেকা,সাবান দিবো কিন্তু চুলের তেল দিবো না, হেরা কেউ মাথাত তেল দেয় না। সাহানা কইলো চিন্তা কইরো না বুজি আমি তোমার মাথার তেলের ব্যবস্থা কইরা দিমু। শুরু হইয়া গেল আমার ঢাকার জীবন।

আমার নাম কিন্তু কেউ জিগাইলো না, ছোট -বড়,বাড়ির সাহেব সবাই আমারে বুয়া কইয়া ডাক দিতো। পইলাপইলা জবাব দিতে দেরী হইতো, আমার নাম তো বুয়া না, কারে বোলাইতেছে ঠাহর করতে পারতাম না। দুদিন পর বুঝা পারলাম আমিই বুয়া। কাম করতে করতে আমার রাইত-দিন সমান হইয়া উঠলো; এত টেকা বেতন দিয়া আমারে রাখছে সবকাম আমারেই করতে হইবো, এইটা শেষ কথা।

হাতের কামর,পায়ের কামরে শরীরডা কেমন অবস লাগা শুরু হইলো। মালিক, না না, মালিক না ম্যাডাম , আমারে এই নামে ডাকতে কইছে । ম্যাডামের কাছে বেদনার ঔষধ চাইলাম, ম্যাডাম ঔষধ কেনার টেকা চাইলো। আমি তো অবাক, কইলাম টেকা থাকলে কি কাম করতে আইতাম আফা? মাইয়াডা রাগ কইরা ধমক দিলো, আফা? আমি তোমার আপা? ম্যাডাম বলবে, আর যেন ভূল না হয়।

দুইডা পেরাসিটামল টেবলেট হাতে দিয়া কইল 'ঔষধের টাকা বেতন থেকে কেটে নেবো'।
আমি মাথা নাড়াইয়া রাজী হইলাম। কবে টেকা পামু তার ঠিক নাই, আগেতো শরীরডারে আরাম দেই।

কোনমতে দিল গুনতাছি কবে মাস শেষ হইব? টেকা হাতে পাইলে মনে কিছুটা আরাম পাইতাম। বাড়িত থাকতে পান,সুপারি খাইতাম। একদিন ম্যাডামের গাড়ির ড্রাইভারকে বাজারে যাইবার সময় চুপিচুপি কইলাম ভাইজান, আমার লাইগা কয়টা পান, তিনডা সুপারি আনবেন বাজার থাইক্কা।

পান চিবাইতে না পাইরা মুখ,গলা শুকাইয়া কাঠ হইয়া আছে। মাথাটাও ঘুরে, ভাই আমি বেতনের টেকা পাইলে তোমার টেকা শোধ কইরা দিমু। বাজার কইরা আসার পর বাজারের ব্যাগ খুলতে ম্যাডাম হুকুম দিলো, আমি ডালায় সব বাজার মেইল্লা ধরলাম ; মাছ, তরকারি, মেলা সদাই। তরকারির লগে আমার পান সুপারি দেইক্ষা ম্যাডামের মাথায় আগুন জ্বইল্লা উঠলো।

ড্রাইভার ভাইকে জেরার পর জেরা, আমি কোন সাহসে তারে না জানাইয়া পান আনতে কইলাম এই দোষে পারলে আমারে মারতে আসে। হাত উঠাইয়া পরে হাত নামাইয়া নিলো, ম্যাডামের মেজাজ আমারে কাঁন্দাইয়া ছাড়লো। ঠিক করলাম বইনেরে খবর দিয়া চইল্লা যামু। এরা কি আমারে মানুষ মনে করে না? বিশ্বাস করে না? হাতে টেকা পাইলে শোধ তো কইরাই দিতাম।

হায়রে টেকা, যাদের অনেক টেকা আছে তাদের কাছেও টেকার এত দরদ?

চলবে----------

লেখকঃ
নিলুফার লাকী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

ঢাকা, ৩১ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।