প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৯-২০: শিক্ষাখাতের প্রতি দৃষ্টিপাত


Published: 2019-06-23 21:56:28 BdST, Updated: 2019-09-21 22:02:28 BdST

শেখ আব্দুল্লাহ-আল-নকী : একটি দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীকে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার  প্রধান মাধ্যম হল শিক্ষা। মানবসক্ষমতা বিনির্মানের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প কিছু নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হয় সে দেশের সরকারকে। তাই এসকল দেশে শিক্ষার পেছনে সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা যখন কমে যায় তখন শিক্ষার মান ক্রমশই সংকুচিত হয়।  বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছর ধরে এমন একটি অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

 

 ২০১৯-’২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা যা মোট বাজেট বরাদ্দের ১৬.৭৫ শতাংশ এবং জিডিপি’র ৩.০৪ শতাংশ। তবে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের যে সংখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে কিঞ্চিত শুভংকরের ফাঁকি ও  যৎসামান্য ধোঁয়াশা। কেননা এই প্রাক্কলিত বাজেটের পুরো বরাদ্দ ব্যয় হবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ ২৮ টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে।  কিন্তু প্রকৃত অর্থে শিক্ষা খাতের প্রধান কার্যকরী ভূমিকায় থাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুইটি মন্ত্রণালয় মিলিয়ে সাধারণত শিক্ষা খাতকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আর এই দুইটি মন্ত্রণালয়ের জন্য এবারের  বাজেটে  ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে । অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অনুকূলে পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে ২৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।  শিক্ষা খাতের সাথে সংযুক্ত প্রযুক্তি খাতসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষনকে বাদ দিলে এই দুইটি মন্ত্রনালয়ের যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ দাঁড়ায় মোট বাজেটের ১১.৬৮ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ২.১ শতাংশ। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১১.৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায়  এ বছর বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ০.০৯ শতাংশ।

 আমাদের দেশে যে শিক্ষানীতি রয়েছে  তাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে দেশের মোট জিডিপির ন্যূনতম ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে  ইউনেস্কোর নির্দেশিকা অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপি’র নূন্যতম ৬ শতাংশ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হতাশার দিক হচ্ছে প্রতিবছর বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য যা বরাদ্দ দেয়া হয় তা খুবই অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। তাই বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা আমাদের নিজেদের প্রণয়নকৃত শিক্ষানীতি অনুসরণ করছি না, আবার ইউনেস্কোর সদস্য দেশ হিসেবে ইউনেস্কোর নির্দেশিকা অনুসরণ করছি না। 

একটি তুলনামূলক পর্যালোচনায় লক্ষ করা গেছে,গত এক দশকের মধ্যে শুধু একটি অর্থবছর বাদে অন্য সকল অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশের চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। শুধুমাত্র ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বিশ্বে যে সকল রাষ্ট্র বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বাজেটে কম বরাদ্দ রাখে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। আবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)২০১৬-১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারত ৩.০৮ শতাংশ, পাকিস্তান ২.৭৬ শতাংশ, আফগানিস্তান ৩.৯৩ শতাংশ, মালদ্বীপ ৪.২৫ শতাংশ, নেপাল ৫.১০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ২.৮১ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছিল। অর্থাৎ তিন বছর আগে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো শিক্ষাখাতে মোট জিডিপির অনুপাতে যে অর্থ বরাদ্দ রেখেছিল আমরা তিন বছর পরেও তার কাছাকাছি যেতে পারিনি।

 

আবার শিক্ষা খাতের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তার একটি বৃহৎ অংশই চলে যায় অনুন্নয়ন খাতে। শিক্ষার উন্নয়নে যা বরাদ্দ থাকে সেটা খুব কম। তাই শিক্ষা বাজেটে যা বরাদ্দ রাখা হয় সেটা যেন সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে ব্যয় করা হয় সেটাও নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। মনে রাখা উচিত শিক্ষা খাতে দুর্নীতি উপস্থিতি প্রবল আকারে বিদ্যমান।  তাই দুর্নীতির কারণে শিক্ষা বাজেটের বরাদ্দ যেন নর্দমায় না পড়ে সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে উত্তরণের পথে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলাকে এবার জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। টাকার অংকে প্রতিবছর শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়লেও শতাংশের হিসেবে তেমন বাড়ে না। আবার কোন কোন অর্থবছরে টাকার অংকে বরাদ্দ বাড়লেও মোট বাজেটের শতাংশের হিসেবে বিগত বছরের তুলনায় কম লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া বাজেটে শিক্ষাখাতে যে বরাদ্দ সেটা দিয়ে গতানুগতিক খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উত্তরণে স্বপ্ন দেখা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই না।

 

এবারের বাজেট বক্তৃতায় বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিদেশ থেকে শিক্ষক নিয়ে আসলেই যে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হবে সেটা বলা যায় না। বর্তমানে বাংলাদেশে যত নিয়োগ প্রক্রিয়া হয়ে থাকে তার মধ্যে সবচেয়ে  অস্বচ্ছ  ও  নিকৃষ্ট প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও সুউচ্চ পর্যায়ের লবিংকে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সকল লোকজন শিক্ষকতায় যোগদান করে থাকে তাদের অধিকাংশই ভাল মানের অথর্ব হয়ে থাকে এবং তারা ক্লাসে ভাল মানের পাঠদান নিশ্চিত  করতে পারে না। তাই দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবীরা এই পেশায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আবার শিক্ষকদের মধ্যে যতক্ষণ না পর্যন্ত লেজুরবৃত্তিক দলীয় রাজনীতি  ও  অন্ধ দলীয় আনুগত্যের প্রবণতা দূর না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না।

তাছাড়া সামগ্রিকভাবে বাজেটে গবেষণার জন্য ৫০ কোটি বরাদ্দ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য কত বরাদ্দ রয়েছে সে বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে  মানের দিক থেকে পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে গবেষণায় পিছিয়ে থাকা। তাই বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে তাল মেলাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য প্রচুর অর্থ ঢালতে হবে।

 

সর্বোপরি,জনসংখ্যাতাত্তিক বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন  ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্থাৎ  জনমিতিক লভ্যাংশের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। সাধারনত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটা দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পেয়ে থাকে।  এই সুবিধা যদি একটি রাষ্ট্র সঠিকভাবে  কাজে লাগাতে না পারে তাহলে সেই দেশের জনগোষ্ঠী একটা পর্যায়ের পর অভিশাপে পরিণত হয়।  আর এই সময়ের মধ্যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আশীর্বাদরুপে পরিণত করার মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। তাই শিক্ষার সাথে বাজার চাহিদার সংযোগ স্থাপন করে দক্ষ মানবসম্পদ বিনির্মানের লক্ষ্যে শিক্ষাখাতে দরকার পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ।

 

শেখ আব্দুল্লাহ আল-নকী: ফ্রিল্যান্স কন্ট্রিবিউটর

 

ঢাকা, ২৩ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এসএন

 

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।