যৌন নিপীড়িত ছাত্রীকে গায়েব করতে চেয়েছিলেন রাবি শিক্ষকরা!


Published: 2019-04-14 01:44:05 BdST, Updated: 2019-08-18 03:28:07 BdST

আল মামুন শেখ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মামুন বিল্লাহ ধর্ষকের আগুনে নিহত নুসরাতকে নিয়ে চরম অবমাননাকর মন্তব্য করেছে। আমাদের মামুন বিল্লাহ এজন্য বলছি যে আমিও একই বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। মামুন বিল্লাহর ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচারে যার ছবি বড় আকারে দেখা যাচ্ছে, তিনি একই বিভাগের শিক্ষক (নাম প্রকাশ করা হলো না)। এটা সরল যুক্তি যে, কোন ছাত্র এমন শিক্ষকের ছবি তার ফেইসবুকের প্রোফাইল ছবি করবেন, যিনি ওই ছাত্রের আদর্শ স্বরূপ। আমি কাউকে এই সরল যুক্তি গ্রহণ করতে বলছি না। বলা বাহুল্য তিনি আমারও শিক্ষক। খোঁজ নিয়ে জানলাম মামুন বিল্লাহর বাবাও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। এসব বিচার করবে বুদ্ধিমান জনতা। আমি শুধু মামুন বিল্লাহ ও তার শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের আন্তঃরসায়ন বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

২০১২ সালের জুন মাসের দিকে হবে, সকাল ৯ টার দিকে সিনেট ভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, সাথে আমার বন্ধু সোবাহান। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী তামান্না (ছদ্মনাম) প্রশাসন ভবনের দিকে যাচ্ছে। আমরা তাকে ডাকলাম ও ঘটনাপ্রবাহ জানার চেষ্টা করলাম। দুদিন আগে সে পরীক্ষার হলে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে আর পরীক্ষা দিতে আসেনি। লোকেমুখে প্রচার যে, সুমন স্যার পরিসংখ্যান শেখাতে গভীর রাতে তার বাসায় যেত। স্যার তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েছিল, যদিও ওই ছাত্রী প্রকাশ্যে বলতো সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিয়ে করবে। কিন্তু হঠাৎ সুমন স্যার ঢাকায় এসে গোপনে বিয়ে করে ফেলেন। তামান্না প্রতারিত হয় এবং এই ঘটনায় তার পরীক্ষা, লেখাপড়া বাদ হয়ে যায়। তামান্না তাই কারো পরামর্শে প্রতিকার পেতে ভিসি অফিসে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করতে যাচ্ছে। আমি আর সোবাহান সব ঘটনা শুনলাম তারপর তাকে সবকিছু ভেবে কাজ করার পরামর্শ দিলাম। কারো কথায় প্ররোচিত না হয়ে কাজ করতে বললাম। কারণ সে বললো, ওমুক স্যার ডেকে তার কাছ থেকে নাকি সাদা কাগজে সাক্ষর করিয়ে রেখেছে। পরীক্ষায় ভালো মার্কস দেবে বলে অভিযোগ করতে বলেছে, তারা সকল রকম সহায়তা দেবে বলেছে। ওমুক স্যারদের সাথে ঢাকা গ্রুপ সুমন স্যারদের দ্বন্দ্ব ছিলো। সে দ্বন্দ্ব এখন চাকরি খাওয়ার ষড়যন্ত্রে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি চরম হয়ে উঠলো। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি মেয়েটাকে বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম। ওই স্যার মেয়েটাকে বললেন, তুমি যা বলবা সত্যটা বলবা, সত্য বললে তুমি অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে। মেয়েটা স্যারকে সব বললো। সে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সুমন স্যার তার ক্ষতি করেছে। বিভাগের অতি নারীবাদী শিক্ষক হয়রানির শিকার নরীটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সুমন স্যার তার ছোট ভাই, সে এমন কাজ করতেই পারেনা। তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ায় সবকিছু গোপনে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও করলেন।

স্যার আমাকে ডাকলেন, বললেন সবকিছু ভ্যানিশ করে দিতে হবে। আমাকে সন্ধ্যায় আবার ডেকে নেয়া হলো জুবেরী ভবনের সুমন স্যারের বাসায়। ওই স্যার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেক স্যার আছেন সেখানে। তারা বললেন, ছাত্রলীগ দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিতে হবে, আমাকে তারা কয়েজন ছাত্রলীগের ক্যাডার টাইপের নেতা যোগাড় করে দিতে বললেন। আমি বললাম তাদের কাজ কি হবে? তারা বললেন ঘটনা চাপা দিতে হবে যা টাকা লাগে লাগুক, আমি অতি উৎসাহী হয়ে বললাম, যদি না থামে তাহলে কি মেয়েটাকে গায়েব করে ফেলবে? স্যার বললেন প্রয়োজনে সব করতে হবে।

আমি বের হয়ে এলাম। মাথা আমার ঘুরতে লাগলো। শিক্ষকরা পরিকল্পনা করছে ছাত্রীকে গায়েব করার! এখানে যৌন হয়রানির বিচার মেয়েটা পাবে না ধরে নিয়েই আমরা ছাত্ররা তার পাশে দাড়ালাম। তিনি আমাদের সাহসে ভিসি অফিসে অভিযোগ করলেন। সুমন স্যারেরা আমার ছাত্রলীগের কয়েক বন্ধুকে ডেকে নিয়ে ২০০০০ টাকা দিয়ে ঘটনা চাপা দিতে বললেন। আমার কাছে খবরটা আসার পর আমি তাদের বললাম, টাকা নিয়েছো ভালো কথা, ধর্ষকের যা ক্ষতি করতে পারা যায় তাই লাভ, তবে মেয়েটার ন্যায় বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়োনা। তারা আমার কথা শুনলো, কাজলা গেটে গিয়ে টাকাটা ৩ হাজার করে ভাগ করে নিয়ে যে যার মতো (...) কাটাখালীর দিকে চলে গেল। (?) ভাই সিনিয়র নেতা বলে ২০০০ টাকা বেশি নিলেন। তারা কাজ করলেন না, আরো বললেন, ওই শিক্ষক ধর্ষক, ও যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে ওদেরকে মেরে আমরা পুলিশে দেবো। সুমন স্যারের সব পরিকল্পনা ধূলোয় উড়ে গেলো। সুমন স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হল, তাকে চাকরিচ্যুত করা হল। কিন্তু (এস অদ্যক্ষর) স্যার? তিনি কিন্তু ধর্ষকের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাকে সেইভ করতে চেয়েছিলেন, প্রয়োজনে ভিকটিমকে মেরে গায়েব করার সিদ্ধান্তও তারা নিয়েছিলেন।

আমি রসায়নটা এখানে দেখতে পাচ্ছি। যে স্যার ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েকে গায়েব করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, আজ নুসরাতকে নিয়ে যৌনকটুক্তিমূলক মন্তব্য করা ছেলে মামুন বিল্লাহর আইডিতে সেই স্যারকে প্রাইম পিকচার হিসেবে দেখে আমার অবাক লাগেনি। বিভাগের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীরা হয়তো অবাক হয়েছে, কারণ তারা অতীত জানেনা। আমার এখন মনে হয়, সেদিনের ছাত্রলীগের ছেলেরা যদি বিবেক বিক্রি করে দিত, তাহলে সেদিনও তামান্না নামে আরেজন নুসরাতকে চলে যেতে হতো। আর সেই ঘটনার পেছনের চরিত্ররা হতো সুমন স্যার।

[অনেকে বলেন ছাত্রলীগ টাকা খেয়ে কাজ করেনা, কিছু কিছু কাজ টাকা খেয়ে না করাটাই হলো ভালোকাজ।

আল মামুন শেখ
সাবেক শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বি: দ্র: গোপনীয়তার স্বার্থে প্রতিবেদনে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।

ঢাকা, ১৪ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।