ঢাকা মেডিকেলে বিদেশী ছাত্রীদের পড়াশোনার অন্যরকম অনুভূতি


Published: 2019-02-28 14:45:40 BdST, Updated: 2019-06-19 01:35:23 BdST

চন্দনা প্রিয়া : ডাক্তার হওয়ার জন্য এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হবে কখনো কল্পনাতেও ভাবিনি। দুই বছর আগে মেডিকেলে পড়ার জন্য যখন নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আসি তখনো বুঝিনি একজন মানুষের জীবনে পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, দেশ ও দেশের মানুষ কতটা আপন। মেডিকেলের এত পরীক্ষার চাপে সময় চলে গেলেও মাঝেমাঝে এমন সময় আসে, যখন সত্যিই পরিবারকে মিস করি। পরিবার থেকে দূরে থাকার এই অনুভূতিগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে উৎসবের সময়গুলোতে। আশেপাশে তাকিয়ে যখন দেখি সবাই তাদের মা, বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে আনন্দ করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় স্কাইপি বা মেসেঞ্জারে ভিডিও কল করে।

দেশের বাইরে এবার আমরা দ্বিতীয়বারের মত দূর্গাপূজা উদযাপন করেছি। দেশভেদে পূজার রীতিনীতি কিন্তু একই। ছোটখাট কিছু পার্থক্য অবশ্য দেখা যায়। যেমন-আমার দেশ নেপালে দশ দিনব্যাপী পূজা শুরু হয় 'ঘটস্থাপনা' বা পবিত্র কলসিতে জামারা (এক ধরণের উদ্ভিদ) বীজ বপনের মাধ্যমে। আবার দশমীতে অর্থাৎ পূজার দশম দিনে বড়রা ছোটদের কপালে টিকা পড়িয়ে দেয়। এদিনে আমরা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াই এবং বড়রা ছোটদের কপালে টিকা পড়িয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদ করেন। আবার, আমার বান্ধবী প্রিয়ারা দক্ষিণ ভারতে দূর্গাপূজার সময় ঘরে ঘরে 'বোম্মালা কলুভু' (সকল দেবতার প্রতিমূর্তি প্রদর্শন) আয়োজন করে। প্রতিমূর্তিগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যেন সেগুলো কোন পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরে।

আশেপাশের সবার আনন্দ দেখে প্রতিমুহুর্তেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলো চোখে ভেসে ওঠে। মায়ের হাতের নাড়ু, বাবার সাথে মেলায় যাওয়া কিংবা নতুন জামা পড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি কি ভোলার মত? এত না পাওয়ার মাঝেও বাংলাদেশে এসে আমরা অনেককিছুই পেয়েছি। গতবারের দূর্গাপূজার সময় 'ফরেনার' সিনিয়ররা যখন আমাদের টিকা পড়িয়ে দিয়েছিলেন মনে হয়েছিল আমার বড় বোনই যেন আমাকে টিকা পড়িয়ে আশীর্বাদ করছেন। এখানে ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভূটান বলে আলাদা কিছু নেই। সব 'ফরেনার' মিলে যেন এক বড় পরিবার। স্থানীয় বন্ধুরা যখন উৎসবের দিনগুলোতে নিজ পরিবারের কাছে যায়, আমরাও আমাদের নতুন পরিবারের সাথে ঘুরতে বের হই। আমাদের কাছে ঈদ, পূজা, বড়দিন বলে আলাদা কিছু নেই। একে অপরের উৎসবের দিনগুলোকে রাঙিয়ে তুলতে চেষ্টা করি। বাংলাদেশী বন্ধু-বান্ধবীরাও এসময় আমাদের নানারকম শুভেচ্ছাবার্তা পাঠায়। এদেশের মানুষ এতটা অতিথিপরায়ণ না হলে হয়তো আমাদের মানিয়ে নিতে আরও কষ্ট হত। আমাদের দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ওদের জানার আগ্রহ বেশ ভালোই লাগে।

আসলে দিনশেষে আমরা সবাই এক স্রষ্টারই সৃষ্টি। হয়ত তাকে স্মরণ করার ধরণ একেকজনের একেক রকম। মানবজাতির সৌন্দর্যটাই বোধ হয় এখানে যে আকার, আকৃতি, গায়ের রঙ কিংবা দেশ, কাল, সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও আমরা জানি নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে কিভাবে অপরকে শ্রদ্ধা করতে হয়, সুখ-দুঃখগুলো কিভাবে ভাগাভাগি করতে হয়, কিভাবে একে অপরকে আপন করে নিতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমরাই পারি রক্তের সম্পর্ক যেখানে অনুপস্থিত সেখানে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

চন্দনা প্রিয়া
পড়াশোনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।