ছাত্র রাজনীতির পূর্বাপরঃ প্রেক্ষিত ডাকসু নির্বাচন


Published: 2019-01-31 22:09:42 BdST, Updated: 2019-04-23 08:42:27 BdST

মেহেদী কাউসার ফরাজীঃ পূর্বে রাজ্যের পরিচালনানীতি নির্ধারণের একচ্ছত্র অধিকার ছিলো রাজার হাতে। প্রজাদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়া মালিক ছিলেন রাজা। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের রাজনীতি শুধুমাত্র আর রাজার হাতে নেই। আধুনিক বিশ্বে বিভিন্ন রেঁনেসার মাধ্যমে প্রজারা নাগরিকের সম্মান পেয়েছে এবং নগর তথা রাষ্ট্রের পরিচালননীতিতে নিজের মত প্রকাশ ও বাস্তবায়নের অধিকার পেয়েছে।

জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায় এখন নাগরিকদের হাতে সমর্পিত। সাম্যবাদী বিশ্বের প্রতিটি দেশে এখন সকলেই রাজা। ক্ষেত্র বিশেষে বাস্তব প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও কাগজে-কলমে গণতন্ত্রের সামগ্রিক সংজ্ঞা এটি। যে দেশে এই নিয়ম যত বেশী মান্য হয়, সে দেশ ততবেশী প্রগতিশীল।

রাজনীতিতে নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির সাথে সাথে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার নাগরিকরা ভূমিকা রেখে চলেছেন। নিঃসন্দেহে সমাজের প্রতিটি স্তরের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সাম্যবাদী গণতান্ত্ৰিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো জনগণের কল্যাণার্থে অভাবনীয় প্রগতি অর্জন করেছে।

কিন্তু, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ফলশ্রুতিতে বৃহত্তর মানবসমাজের গোত্রে গোত্রে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভব এবং স্বাধীন জাতির প্রগতির পথকে মসৃণ রাখার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট জাতির ছাত্রসমাজ ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে আধুনিক পৃথিবীর গাঁথুনি মজবুতই করেনি শুধু, বৃহত্তর মানবসমাজের ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ করে চলেছে।

রাজনীতিতে ছাত্রদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ যেকোনো গণতান্ত্রিক জাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কেননা, কেবলমাত্র ছাত্ররাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বীয় জাতির সমৃদ্ধ ও আলোকিত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে মূল ভূমিকা রাখতে পারে। একথা অনস্বীকার্য যে, ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে একটি জাতি তখনই উপকৃত হয়, যখন ছাত্ররা স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে পারে। ছাত্ররাজনীতিতে বহিঃশক্তির খবরদারি বজায় থাকলে তা জাতির জন্য অভিশাপে পরিণত হয়। বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই বক্তব্যের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

বর্তমান বিশ্বের অসংখ্য স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে সেদেশের ছাত্রসমাজের অগ্রগামী নেতৃত্বই তাদেরকে আলোর পথ দেখিয়েছে। পলাশীর প্রান্তরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর যতগুলো আন্দোলন, সংগ্রাম ও সংঘাত ঘটেছে, তার অধিকাংশ ঘটেছে ছাত্রদের নেতৃত্বে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব বিপ্লবী তরুণ মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, তাদের অধিকাংশ ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছে।

কলকাতার বিভিন্ন কলেজপড়ুয়া ছাত্ররা ইংরেজ সমরনায়কদের বিরুদ্ধে যেভাবে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছে, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে দেশব্যাপী গণজাগরণ ঘটিয়েছে, তা বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতারাও করতে পারেননি। ছাত্রনেতা থেকে দেশনায়ক হয়ে উঠা কলকাতা পৌরসভার কনিষ্ঠ মেয়র সুভাষচন্দ্র বসু যে অগ্রগামী চিন্তার মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্রমেই সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তৎকালীন জাতীয় নেতারা সেই চিন্তাধারার ধারেকাছেও ছিলেন না!

গোপালগঞ্জের খোকা কলকাতার জাঁদরেল ছাত্রনেতা মুজিবের মাথায় যখন বাঙালিদের জন্য স্বাধীন ভূখন্ডের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, বাংলার বুড়ো নেতারা তখন পোকায় খাওয়া মানচিত্রের অধিকার নিয়ে দেনদরবারে ব্যস্ত ছিলেন। দেশভাগের পরপরই ঢাকার বুকে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তরুণ মুজিব যখন বাঙালির স্বাধীনতার বীজ বপন করলেন, তখন সিনিয়র নেতারা কি ঘুনাক্ষরেও টের পেয়েছিলেন যে, মাত্র তেঈশ বছরের মধ্যে এই ছেলেটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক হয়ে স্বাদের পাকিস্তান ভেঙ্গে দিবে? ভাবতে পারেননি। তবে, তাজউদ্দীনের মতো ছাত্রনেতারা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।

সামরিক স্বৈরাচার আয়ূব খানবিরোধী আন্দোলনের অগ্রগামী নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতারাই। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনে সফলতার মূল চাবিকাঠি ছিলেন ছাত্রনেতারা। একাত্তরের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের জনসভায় যাওয়ার পূর্বে অগ্রগামী ছাত্রনেতারাই কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে "চাপ" প্রয়োগ করেছিলেন! মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ে দেশ ও জাতির জন্য ছাত্রসমাজের ত্যাগের ইতিহাস এদেশ কখনোই ভুলবে না।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ছাত্রনেতারা পরম স্নেহ ও ভালবাসার পাত্র ছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে। কিন্তু পরবর্তীতে মেরুদন্ডহীন ছাত্ররাজনীতির কারণে বাংলার ছাত্রসমাজ নিজেদের সম্মান যেমন হারিয়েছে, তেমনই নিজেদের সহিংসতার কারণে দেশ ও জাতিকে দিতে হয়েছে অমূল্য ক্ষতিপূরণ!

ছাত্ররাজনীতির এই অধঃপতনের পেছনে হাজারো কারণের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া। ছাত্ররাজনীতির সোনালী যুগের ইতিহাসে দেখা যাবে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সকল ছাত্রের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাস্তবায়িত হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত মেধাবী ও যোগ্য নেতৃবৃন্দ সময়োপযোগী কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি সঙ্কট মোকাবেলায় ভূমিকা রাখতে পারতেন।

কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্রসংসদের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাবার সাথে সাথে সাধারণ ছাত্ররা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ে এবং জন্ম নেয় "আই হেইট পলিটিক্স" প্রজন্ম। আর এই সুযোগে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আজ্ঞাবহ দাসদের ছাত্রনেতা হিসেবে "মনোনীত" করার মাধ্যমে পূর্বেকার অগ্রগামী ছাত্ররাজনীতিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয় এবং নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ মসৃণ রাখার সুযোগ করে নেয়। ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে দেশের প্রগতিও ব্যাকফুটে চলে যায়, পক্ষান্তরে রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের নিজস্ব প্রগতি গতি ফিরে পায়!

যাহোক, দেশের ছাত্রসমাজের জন্য আনন্দের ও জাতির জন্য সুখবর এই যে, দেরীতে হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাত্রসংসদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন এবং ছাত্ররাজনীতির আঁতুড়ঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সাথে সাথে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের মধ্যে যে চাঙা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক।

ডাকসু নির্বাচনের প্রেক্ষিতে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর এর কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন যেন যথাসম্ভব ইতিবাচক সুফল বয়ে আনতে পারে, এদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদের দফায় দফায় বৈঠকে অংশ নিয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করেছে এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির যে স্থিরচিত্র আমরা দেখেছি, তা অবশ্যই আমাদের জন্য আশা জাগানিয়া ব্যপার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা ও প্রত্যেক ছাত্রের সমঅধিকার নিশ্চিতে ডাকসু ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।

ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে সবচেয়ে বেশী তৎপর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ইতোমধ্যে বেশকিছু এজেন্ডা সম্বলিত স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছে ঢাবি ছাত্রলীগের নেতারা। বিভিন্ন হলভিত্তিক কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রেক্ষিতে তাদের প্রাণের দাবি সম্বলিত এই প্রাক-ইশতেহার ইতোমধ্যেই সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে ঐতিহ্যগতভাবে মেধাবী ও চিন্তাশীল ছাত্রনেতাদের নিজেদের প্রার্থী করে ছাত্রলীগ সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে। এছাড়াও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ইচ্ছুকদেরও বেশ তৎপরতা লক্ষণীয়।

ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে অচিরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি সত্যিকারের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। সেইসঙ্গে লেজুরবৃত্তি ছেড়ে আবারও ছাত্ররাজনীতি দেশের অগ্রগামী নেতৃত্ব হাতে তুলে নেবে বলে আশা রাখি।

মেহেদী কাউসার ফরাজী
শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল : mahedikawser.bd@gmail.com

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।