তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং তরুণ প্রজন্ম!


Published: 2019-01-07 19:03:41 BdST, Updated: 2019-06-18 17:35:15 BdST

হাসান আল মামুন : কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে এদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ রাস্তায় নেমে আসেন। দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তারা। উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের প্রত্যাশা ছিল বর্তমান কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার হবে, যা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র প্রথমেই সেখানে বৈরী আচরণ করে, ১৪ই মার্চ প্রথমে হাইকোর্ট মোড়ে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী। ৬৩ জন শিক্ষার্থীকে রমনা থানায় আটক রাখা হয় রাত আটটা পর্যন্ত। পরে আন্দোলনের মুখে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে রাষ্ট্রের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেন। দেশের কোথাও কোন সহিংসতা বা কোন গাড়ির গ্লাস পর্যন্ত ভাঙেননি ওই তরুণরা। ৮ই এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হয়।

ছাত্ররা শুধু চেয়েছিলেন সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস, যেন কোটা সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। সেই আশ্বাসটুকুও পাননি তারা। তারপর শুরু হলো আমাদের উপর পুলিশের রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ। অমানবিক নির্যাতন চলে ছাত্রদের উপর, গুলিবিদ্ধ হন ছাত্র। আহত হন প্রায় দুই শতাধিক। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও পুলিশ হামলা চালায়।

এমন ঘটনায় কয়জন পুলিশ আহত হয়েছিল কেউ বলতে পারবেন? শাহবাগে পুলিশ বক্সে আটকা পড়ে এক শিক্ষার্থী, তার উপর পুলিশ যে নির্যাতন চালিয়েছে তা দেখে, কোন সচেতন মানুষ এটাকে সমর্থন দিতে পারেনা। রাতে ছাত্রদের উপর পুলিশ-ছাত্রলীগ দফায় দফায় হামলা চালায়। ভিসি স্যারের বাসা ভাংচুর হয়, যা আমরা জানিনা। আমাদের কেউ সেখানে ছিলনা। পুলিশ তদন্ত করে আমাদের কোন সংশ্লিষ্টতাও পায়নি।

৯ই এপ্রিল আমরা সচিবালয়ে বসে একমাস সময় দিলাম, সময় নেওয়াটা ছিল সরকারের পক্ষ থেকে আইওয়াশ। যা আমরা পরে বুঝতে পারি। সংসদে বক্তব্য আসলো "রাজাকারের বাচ্চাদের জন্য কোটা সংকোচিত করতে হবে"। আমার প্রশ্ন এদেশের লক্ষ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা কি রাজাকারের বাচ্চা?

বিভিন্ন বক্তব্য আসতে থাকলো মহান সংসদ থেকে, তখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি। সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার আগে আমরা বারবার বলেছি সংস্কার করতে, কারণ আমরা কখনও বাতিল চাইনি। এরপর আসলো কোটা বাতিলের ঘোষণা, আমাদেরকে বোঝানো হলো আর কোটা থাকবে না।

আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আন্দোলন স্থগিত করলাম, এরপরে শুরু হলো নাটক, চোখ বেঁধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলে নেওয়া হলো আমাদের। মিথ্যা খবর প্রচার করে স্ক্রিনশট বানানো হলো। আমাদেরকে জামায়াত-বিএনপি হিসেবে আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হলো।

তাতেও তারা ব্যর্থ হলো। একপর্যায়ে আমাদের ১২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্লেইম দেয়া হয়। যার একটি টাকারও কোন সত্যতা পুলিশ এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ কেউ পায়নি। আমরা আসলে রাজনীতি করতে এখানে আসিনি, এসেছিলাম চাকরির সুবিধা বাড়াতে, যা সকলের প্রয়োজন।

৩০ জুন লাইব্রেরির সামনে সর্বপ্রথম আমার এবং নুরের উপর হামলা করে ছাত্রলীগ। যারা আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন তারাই আমাকে মারলেন। আমি রীতিমত হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, শহীদ মিনারেও ফারুকের উপর চলে অমানবিক নির্যাতন। দেওয়া হয় মামলা, রাশেদসহ অনেককেই রিমান্ডে নেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তরিকুলকে হাতুড়িপেটা করা হয়। আমাদের অপরাধ ছিল প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করা। আজ আমরা হল ছাড়া, যে চাকরির জন্য আন্দোলন করলাম, সে আশাই আজ মরিচিকা। মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হলোনা।

এবার আসি মূল কথায়, প্রথমে বলে নিচ্ছি আমরা ছাত্র, ভুলত্রুটি আমাদের আছে। অসচেতনতাবশত হয়তো গ্রুপে বাজে মন্তব্য বা পোস্ট হয়েছে। এতোগুলো মানুষ নিয়ন্ত্রণ করা কতোটা কঠিন তা শুধু আমরাই জানি। তার জন্য দু:খ প্রকাশ করছি।

দেশের বুদ্ধিজীবীদের আমরা আইকন ভাবি, সম্মান করি অন্তর থেকে, কিন্তু যখন দেখি তারা মিথ্যাচার করছেন, যৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন। ছাত্রদের উপর রাষ্ট্রের হামলা-মামলাকে সমর্থন দিচ্ছেন তখন কি আমরা বলতে পারিনা, আপনারা বিক্রিত বুদ্ধিজীবী, বিক্রিত সুশীল।

আপনারা বিক্রি হলেও তরুণরা কোন রাজনীতির কাছে বিক্রি হয়নি, এদের কাছে টাকার চেয়ে আদর্শ বড়। এই রাষ্ট্রের আসল চেহারা এখন তরুণদের কাছে পরিষ্কার। রাষ্ট্রের সকল অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্ররা প্রতিবাদ করবেই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে চাই। রাজনীতির বাইরেও আমরা মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। এই আন্দোলন ছিল শিক্ষার্থীদের জীবন জীবিকার আন্দোলন।

লেখক :
হাসান আল মামুন
আহ্বায়ক
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ

 

 

ঢাকা, ০৭ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।