নিজ ক্যাম্পাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কেন অবহেলিত


Published: 2018-12-15 14:12:40 BdST, Updated: 2019-03-22 00:37:34 BdST

রাশেদ রাজন: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাস। বাংলাদেশ মুক্তির পথে। সারা দেশে মক্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই মূহূর্তে দেশব্যাপী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা এদেশের যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নীল নকশা রচনা করে এই দেশকে মেধা শূন্য করতে।

সে অনুযায়ী তালিকা প্রনয়ন করে হানাদার বাহিনী। সেই তালিকায় চলে আসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন শিক্ষক। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের তুলে নিয়ে হত্যা যজ্ঞে মেতে উঠেন পাক হানাদার বাহিনী।

কিন্তু জীবনকে তুচ্ছ করে জাতির জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিতে কখনো পিছ পা হননি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তিন শিক্ষক। জীবনের মায়া ত্যাগ করেই মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে করেছেন সহায়তা। ত্যাগী এই তিন শিক্ষক হলেন- শহীদ বুদ্ধিজীবী সুখরঞ্জন সমাদ্দার, শহীদ হবিবুর রহমান এবং শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম।

দেশকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনে উৎসর্গ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও অনেকে জানেনা তাদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাসের কথা। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মেধাবী’ অনেক শিক্ষার্থীই জানেন না তাদের অবদান সম্পর্কে। নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে অপরিচিত তাঁদের ইতিহাস। এমনকি বুদ্ধিজীবী দিবসে ওই বিভাগগুলোতে হয়নি কোনো কর্মসূচি কিংবা কোনো দোয়া মাহফিল। যার ফলে নিজ বাড়িতে অচেনা হয়ে আছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে হবিবুর রহমান ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ১৯৫৪ সালে গণিত বিভাগে যোগ দেন। জানা যায়, যুদ্ধের সময় ইপিআর বাহিনীর (মুক্তি বাহিনী) একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলো প্রতিরক্ষা শক্তি হিসেবে।

তাদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করতেন শহীদ হবিবুর রহমান। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতার কারণে ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। এরপর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর। ধারণা করা হয় সেদিনই তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত জানা যায়নি তাকে কোথায় হত্যা কিংবা কবর দিয়েছে হানাদার বাহিনী। বাংলাদেশ সরকার তার অবদানকে স্বীকৃতি দিতে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেছে।

কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে গনিত বিভাগ কোনো কর্মসূচির আয়োজন করেনি। শুধুমাত্র সকালে র‌্যালি বের করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পন করে বিভাগটি। এবিষয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা শুধু জানেন হবিবুর রহমান স্যার তাদের বিভাগের শিক্ষক ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হয়েছেন।

তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত ইতিহাস জানেন না। এমনকি স্যারের স্মরণে বিভাগে আলোচনা সভা, অনুষ্ঠান কিংবা কোনো দোয়া মাহফিল করতে দেখেনি তারা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ হবিবুর রহমান নামে একটি আবাসিক হল থাকলেও তাকে নিয়ে কোন আলোচনা সভা কিংবা স্মারক বক্তৃতা হয়নি। হলের সামনে হবিবুর রহমানের আবক্ষ মূর্তিসহ ‘বিদ্যার্ঘ’ নামে একটি ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যটি কার স্মরণে বানানো হয়েছে জানলেও আবাসিক শিক্ষার্থীরা এই ভাস্কর্যের মর্মার্থ জানেন না।

এবিষয়ে বিভাগের গনিত বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. জুলফিকার আলী বলেন, আমাদের বিভাগ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হবিবুর রহমান স্যারের স্মরণে আলাদা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। আমি নব্বই সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পর থেকে দেখিনি। স্যারের নামে শহীদ হবিবুর রহমান হল আছে সেখানে করা হয়। তবে প্রতিবছর বিভাগ থেকে র‌্যালির আয়োজন করা হয়। এর বাইরে আর কিছু হয়না।

শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগেরই ছাত্র ছিলেন। এরপর ১৯৬৬ সালে মনোবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা তাকে কৌশলে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর অপরাধ ছিলো তিনি মুক্তিবাহিনীকে সহযোগীতা করছিলেন।

সেদিন রাতেই রাজশাহীর ১৪ জনকে একসাথে তুলে নিয়ে গিয়ে পদ্মার নদীর তীরে বালুর চরে (বোয়ালিয়া অফিসার্স ক্লাবের নিকটে) শ্রীরামপুর নামের একটা জায়গায় তাদের ১৪ জনকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। তার মধ্যে শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম কাইয়ুম ছিলেন। পরে তাকে কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, শহীদ ড. শামসুজ্জোহার সাথে গণঅভ্যুত্থানেও অংশগ্রহন করেছিলেন। বর্তমানে ওই বিভাগেরই অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়া শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুমের কন্যা।

তবে বুদ্ধিজীবী দিবসটি উপলক্ষে ওই বিভাগে একই চিত্র দেখা যায়। কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানায় বিভাগের এক অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক মারা যাবার কারণে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতবছর বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করার জন্য প্রশাসন থেকে বিভাগে চিঠি দেয়া হলে তারা একটি কর্মসূচির আয়োজন করে।

সেই কর্মসূচিতে শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম স্ত্রী মাসতুরা খানমকে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আনা হয়েছিল। তিনিও ওই বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এখন আবসরে আছেন। কিন্তু এবছর আর কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি।

শিক্ষার্থীরা জানায়, স্যারের নামে বিভাগের সেমিনার গ্রন্থাগারের নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ডরমিটরির নামকরণও করা হয়েছে তাঁর নামে। উনি একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী ছিলেন এটুকু জানেন তারা। কিন্তু তিনি কিভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী উপাধি পেলেন তা অনেক শিক্ষার্থীর জানার বাইরে।

জানতে চাইলে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এনামুল হক বলেন, আমি ২৩ বছর ধরে মনোবিজ্ঞান বিভাগে আছি। কিন্ত আলাদা করে বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করতে আমি দেখেনি। দিবসটি উপলক্ষে কোনো র‌্যালি কিংবা পুষ্পস্তবকও অর্পন করতেও দেখেনি।

আগেও এমন কোনো ঐতিহ্য না থাকায় এখনো করা হয়না। আমি গত ফেব্রুয়ারিতে বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে এসেছি। ব্যক্তিগত ভাবে চিন্তা করেছি আগামী বছর থেকে দিবসটি পালন করার জন্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দু’জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ভবনের নামকরণ করা হলেও শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দারের নামে কিছুই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ‘স্বীকৃতি’ পেতে সময় লেগেছে ৪৩ বছর।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক সাংষ্কৃতিক কেন্দ্রের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দারের নামে। এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। নিজ বিভাগেও আজ পর্যন্ত হয়নি কোনো কোনো স্বীকৃতি।

জানা যায়, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ১৯৫৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগে যোগ দেন। ভাষা বিভাগের অন্তর্ভূক্ত সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার অধিকারী এবং নজরুল ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিলো। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল যুদ্ধে আহত এক ইপিআর সৈন্যকে তার বাড়িতে আশ্রয় দেন।

পরদিন ১৪ এপ্রিল সকালে ইপিআর যোদ্ধা চলে গেলে তার নিজ বাসভবন থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ঘাতকরা সেদিনই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে চলে যায়। পরে তাঁর বাসার গোয়ালা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিচাপা দেয়। যা বিজয়ের পর সেই গোয়ালা স্যারের পরিবারকে জানান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে তার লাশ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্ত্বরে পুনঃসমাহিত করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিভাগ থেকে দেয়া হয় না কোনো ধরণের কর্মসূচি। এমনকি বিভাগের শিক্ষার্থীরা শুধু নামে চিনেন কিন্তু সে সম্পের্কে কোনো ইতিহাস জানেন না। এইবার বিভাগে দিবসটি উপলক্ষে একটি র‌্যালি বের করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ভাষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বিপুল কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা প্রতিবছরই বুদ্ধিজীবী দিবসে তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করি। এবারও আমরা বিভাগ থেকে র‌্যালি বের করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পন করেছি।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিভাগে ছোটো পরিসরে আলোচনা সভা করেছি। তবে আগামী ২৫ মার্চের পর স্যারকে স্মরণ করে বিভাগে একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করছি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের তাঁর সম্পের্কে ধারণা দিতে বিভাগের কিছু ছবি রাখা হয়েছে।

 


ঢাকা, ১৫ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।