ভুল থেকে হোক শিক্ষা, আর নয় আত্মহত্যা


Published: 2018-12-11 20:33:23 BdST, Updated: 2019-01-19 19:17:56 BdST

রেজাউল হক নাঈম: খায়ের স্যার! হাই স্কুলে আমাদের এক স্যারের নাম। শিক্ষার্থীদের নিকট নামটি একটি ভয়, একটি আতঙ্কের কারণ। ক্লাশে ইংরেজী পড়াতেন। স্যারের মেজাজ এতটাই রুক্ষ। স্যারের ক্লাসে খুবই মনোযোগ সহকারে থাকতে হতো।

যদি কোন কারণে কারো চোখ হঠাৎ ক্লাসের বাহিরে চলে যায় বা হালকা ঘুম ঘুম লাগলে বা কে হাই তুললে, বেশী নড়াচড়া করলে স্যার শুধু বকতেনই না, গালাগালি, বেদম বেতানি ছাড়াও হাতের কাছে বেত না থাকলে চক-ডাস্টার মেরে বসতেন।

কোন ছাত্রকে পাড়ার “সমতা” নামক সিনেমা হলের গেইটের মধ্যে দেখলে তার যে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার হবে সেটা অনেকটা নিশ্চিৎ হয়ে যেতো। আর যদি কোন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় নকল করতে ধরা খেতো, তার শাস্তি কোন লেভেলের হতে পারে তা অকল্পনীয়।

এখনো ভাবতে অবাক লাগে যে স্যার এতোটা বাড়াবাড়ি কেন করতেন? তারপরও স্যার অনেকের শ্রদ্ধার পাত্র। কারণ স্যারের এমন ব্যবহারের মধ্যে হয়তো কোন আশীর্বাদ আছে, এই ভেবে কেউ কখনো প্রতিবাদ করার ও সাহস পায় নাই। অনেক অভিভাবক তার ছেলের আরো যত্ন নেবার জন্য স্যারকে অনুরোধ করতেন, এর পর থেকে ঐ ছেলেকে নাম ধরে পিটাতেন।

আমার পরিবারের কয়েকজন সহ আমিও উনার আশীর্বাদপুষ্ট এক ছাত্র। ৫-৬ বছর আগে স্যারের সাথে দেখা হলে কথার প্রসঙ্গে স্যার বলেন, আগের মতো আর শিক্ষকতায় মজা নাই, কারণ বেত নিষেধ, গায়ে হাত নিষেধ, গালাগালি নিষেধ।

আজকাল এমন হলে নিশ্চিত স্যারের জেল হতো। যাই হোক ভিকারুন্নিসার ক্লাস নাইনের ছাত্রীর আত্মহত্য প্রসঙ্গে স্যারের কথা গুলো মনে করলাম। পরিস্থিতি এমনভাবে বদলেছে যে, বর্তমান সময়ে বাচ্চাদের বকাঝকা করা বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে দুই একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে:

১) ধরেন, বাবা অফিস যাবার সময় দেখলেন তার আদরের বাচ্চাটা ক্লাসে না গিয়ে ডানমন্ডি লেকের পাড়ে ছেলেবন্ধুর সাথে ডেটিং করছে। কয়েকদিন একই ছেলের সাথে দেখার পর বাবা চোখ গরম করে বই পুস্তক বেঁধে বললেন আর পড়া লেখার কোন দরকার নাই কাল থেকে তোমার স্কুল যাওয়া বন্ধ। মেয়ে বাপের উপর জেদ করে আত্মহত্যা।

২) বার্ষিক বা বোর্ড পরীক্ষায় জিপিএ কম বা ফেল করলে যদি বাপ-মা বকাবকি করতে করতে বলেন, তোর পিছে এতো টাকা খরচ করি অথচ রেজাল্ট এতো খারাপ। তোর আর পড়া লেখার দরকার নাই। আশে পাশের সবার কাছে মুখ রক্ষার্থে বেছে নেয় আত্মহত্যা।

আমাদের সময় এমন বকাঝকা করলে মন খারাপ হতো ঠিকই কিন্তু কদিন পরেই আবার সব নরমাল হয়ে যেতো, সংশোধিত হয়ে সাধারন অবস্থায় ফিরে আসাটা ছিলো খুব কমন।
কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌছেছে এখন আসলে বকাঝকা করে কোন ভাবেই বাচ্চাদের সংশোধন সম্ভব না।

যুগপৎ মাইর ও বকাঝকার পরিবর্তে ভালোবাসা আবেগ দিয়ে বুঝালে বাচ্চাদের বোধোদয় খুব ভালো হয়। ধরেন, বাপের মোবাইল নাম্বার দিয়ে ক্লাস সেভেনের ছেলে ফেসবুক চালাচ্ছে। বাবা দিলো একটা বেদম মাইর। মাইর খাওয়ার পরদিন সে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ঠিকই ফেসবুক চালাবে। কিন্তু বাবা যদি ঠিক করে বুঝাতেন ছেলেটি হয়তো ক্যাফেতে যাবার চিন্তা ও করতো না।

এইট নাইনের একটা বাচ্চা ক্লাসে সেল ফোন ব্যবহার করে নকল করলে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিদ্যাপিঠে শাস্তি কেমন হতে পারে তা সবার নিশ্চয়ই বোধগম্য। ইহা শাস্তি যোগ্য অপরাধ ও বটে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষপটে আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠিকে টিকিয়ে রাখতে আরো মানবিক আচরণ প্রয়োজন। কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে অন্যায়কে অন্যায় বলা ও দূরে থাকার পাশাপাশি অন্যায়ের শাস্তি ও মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নতুন উদ্যমে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার মানসিক শক্তি ও তার মধ্যে তৈরি করতে হবে।

আত্মহত্যা অবশ্যই এক ধরণের ব্যধি। বন্যার সময় ডায়রিয়া আমাশয় মহামারী আকার যেন ধারণ করতে না পারে তার জন্য সরকার যেমন ওরস্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরন করে, বিপুল দক্ষ তরুন জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে, আত্মহত্যা নামক ব্যাধি মহামারী আকার ধারণ করার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আর কতদিন লাগবে?

যে সব মন্ত্রী, আমলা, ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার জনগণের চোখে সামনে নানান অপকর্মে তিরস্কৃত, অনুশোচনা করার ও কোন মানসিকতা নাই, লোকলজ্জার ভয়ে তাদের তো কখনো আত্মহত্য করতে দেখিনা, অথচ আজকের শিশু যাদের সামনে সংশোধিত হয়ে সৎ ভাবে বেঁচে থাকার অফুরন্ত সম্ভাবনা তারা আজ হুমকির মুখে। একটি ভুল মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়, এই শিক্ষাটা সবার আগে প্রয়োজন।

লেখক,
Rejaul Hoq Nayem
Teaching assistant at Purdue University
Studies Organic chemistry at Purdue University


ঢাকা, ১১ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।