যেখানে স্বপ্নের ডানা মেলে উড়াল দেয়া যায়


Published: 2018-10-25 21:21:57 BdST, Updated: 2018-11-14 11:19:19 BdST

এবায়দুল হক রাফিন: আমি নিম্নমধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে । আমিই সবার ছোট। খুব ছোটবেলা আমার জন্মের ৩ মাসের মাথায় আমার আব্বু মারা যান। ছোট থাকতে তেমন বুঝতাম না। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার পর মন খারাপ থাকত। আল্লাহ কেন এমন করলেন!! তখন থেকে একটাই সান্ত্বনা আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন...এটার চেয়ে আর ভালো সান্ত্বনা কি ই বা হতে পারে!!!

আমাদের পরিবারটা যৌথ পরিবার । আমাদের আর চাচাদের পরিবার নিয়ে। আমরা দুই ভাই আর ওরা দুই ভাই বোন কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা এতই ভালো যে বাইরের কেউ তা বুঝবেই না কারণ আমাদের মাঝে ভালবাসার বিন্দু মাত্রও অভাব নাই । তাই ছোট থেকে একসাথে থাকতে থাকতে ভাইয়া আর আপুর মত করে আমিও বাবা ডাকি চাচাকে । বাবা আমাকে ভাইয়া আর আপুর থেকেও বেশি আদর করেন, কখনো আব্বুর অভাব বুঝতে দেন নি । বাসায় এসে প্রথমেই আমার খবর নেন এখনও....

আর লাইফ এ সব শিখা ভাইয়ার কাছ থেকে । ও আমার থেকে ২ বছরের বড় তাও ও আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু । খুব ই মেধাবী তাই আমি খালি ওকে ফলো করতাম ও যা করত আমিও তাই করতাম। দুই জন ই ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়তাম, স্কুলের গন্ডিটাও এভাবেই চলত..

ক্লাশ নাইনে উঠে আমি ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়টি নেই । আমার খেলার প্রতি খুব নেশা ছিল । প্রাকটিস করতাম। বয়স ভিত্তক খেলতাম তাই সাইন্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল না। বাসার মানুষ গুলো কিচ্ছু বলে নি শুধু বলেছিল যে তুমি যা ভাল বুঝ কর। আর আত্মীয় সমাজের কাছে আমি তখন কোনো ছাত্র ই না কারন আমার সমবয়সী ভাইগ্না আর ভাইগ্নী সাইন্স নিয়েছিল,আর আমি ব্যবসায় শিক্ষা!!

চলতে থাকল সবকিছু। দেখতে দেখতে এস এস সি পরীক্ষা হল আর রেজাল্ট ও দিল । আমি পেলাম ৪.৭৮ আর ওরা গোল্ডেন । খুব খারাপ লাগছিল ওইদিন বুঝি নি এমন হবে!! আবার ও আমি খারাপ ছাত্র, কি সান্ত্বনা দিল সবাই -'তুমি তো কমার্স, খুব ভাল হইসে রেজাল্ট কিন্তু শুধু আমি ই বুঝতেছিলাম কষ্টটা '। ভাইয়া বলেছিল যা হবার তা তো হইছেই ব্যাপার না এএইচ এস সি টা দেখ কি হয়...

শুরু হল কলেজ । কলেজটা ও ময়মনসিংহতেই । শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ । মধ্যমানের ছাত্র কখনোই খুব একটা নাম ছিল না । এভাবে প্রথম বর্ষটা শেষ হল । ভাইয়া যখন ভার্সিটি পরীক্ষা দিল তখন বুঝলাম কি পরীক্ষা এটা!! এত্ত কম্পিটিশন!!

সবসময় স্বপ্ন দেখতাম বাইরে পড়তে যাব,এমনকি আমার কোথাও পরীক্ষা ও দেয়ার ইচ্ছা ছিল না । ২য় বর্ষে উঠার পর DREAM TO DU গ্রুপটা থেকে দেখতে লাগলাম DU কি!! এটা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড!! তখন জিদ হল যে এটাতে আগে টিকব তারপর যদি হয় ও তাও বাইরে পড়তে যাব। তাই তখন থেকে DU এর স্বপ্ন দেখতাম ।

টেস্টে মোটামুটি পয়েন্ট পেলাম। টেস্টের পর আম্মু অনেক অসুস্থ হয়ে গেল অনেক। আবার ও হতাশ হয়ে পড়লাম অনেক । কলেজের কোচিং এ পরীক্ষাতে শুধু এটেন্ট করে এসে পড়তাম । আম্মু ঘুমাত আমি এর মাঝেই পরীক্ষা দিয়ে এসে পড়তাম ।

শুধু যেতাম আর আসতাম, আমু আমায় না দেখে আবার চিন্তা করবে। কিছুদিন এভাবে চলার পর ম্যাডাম জিজ্ঞেস করল -"সমস্যা কি তোমার!! কিছুই পার না? শুধু আস আর যাও! না পেরে ম্যাডামকে বললাম সব । ম্যাডাম বলল ঠিকাছে তোমার যেভাবে সুবিধা হয় তুমি তাই কর । আমাকে আগে জানালে পারতা বোকা!

এদিকে পড়ালেখা সব আকাশে উঠল ভাবতে লাগলাম আমি কি করব??আর আফসোস করতাম কি হবে! দাদা(আমার আপন ভাইয়া) বলত তুই যদি ফেইল ও করস তাও তোরে কেউ কিচ্ছু বলবে না.. তুই যা পাবি তাই ই কোনো অসুবিধা নাই ।

যখন ই খুব খারাপ লাগত তখন গ্রুপে এসে পোস্ট দেখতাম। অনিক দাদার মোটিভেশন, রিফাত ভাইয়ার তথ্যমুলক পোস্ট,সজীব দাদার বাংলা,নাইম ভাইয়ার ভোকাবুলারি, রানা ভাইয়ার একান্টিং, অনিক(ওয়াজেদুর)ভাইয়ার টিউটোরিয়াল ভিডিও,কল্প ভাইয়া, মৃধা ভাইয়ার পোস্ট গুলো হয়ত এখন ও সেভ আইটেমস এই আছে...সুপ্ত ভাইয়ার একটা গান ও আছে সেখানে ৷

এইচএসসি দিলাম মোটামুটি । রিভিশন দিতে বসতাম এক্সামের আগের রাত ১২টায় । এক্সাম দিয়ে এসে একবারে ঘুমাতাম । একটা একটা পরীক্ষা দিতাম আর প্লাস পাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হত । পরীক্ষা শেষ হল আর রেজাল্ট ও দেয়ার দিন এসে পড়ল ।

আগের রাত ঘুম নেই সকাল থেকেই কারো সাথে কথা বলি না । রেজাল্ট দিবে ১টায় এর আগে দাদা ফোন দিয়ে আবার সান্ত্বনা -"যাই হোক চিন্তা করিস না। আল্লাহ যা করবেন সব ভালোর জন্য ই হবে "। আমি হুম হুম করতেছিলাম আর চোখ দিয়ে পানি পড়তেছিল যে প্লাস না পেলে!! নামাযে ফোন ভায়োব্রেট হচ্ছিল বের হয়ে কল ব্যাক করলাম সমবয়সী কাজিন বলল তুমি প্লাস পাইছো, আমার চেয়ে ওকেই বেশি খুশি শোনা যাচ্ছিল একমাত্র বাইরের মানুষ ই জানত যে আমি কি পরিস্থিতি দিয়ে গেছি!! আল্লাহর অশেষ রহমত আর আম্মুর দুয়ায় A+ পেয়েছিলাম নাহলে রেজাল্ট খুব ই ভয়াবহ হত...

সবচেয়ে ভাল দিক আমার পাগলামি গুলো বাসায় সাপোর্ট করে আর আমার যখন যা ইচ্ছা তাই করি । এইচএসসি শেষে প্রথম Du ঘুরতে আসি তখন আরো ইচ্ছা জাগে এটা লাগবেই । আমি দেয়ালে পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে আমার সব গোল গুলো লিখি ভেবেছিলাম বকা খাব কিন্তু কেউ কিচ্ছু বলে নি (এখনো এমন ই আছে) । পরীক্ষা দিতে এসে রাগ করেই আত্মীয়র বাসায় না থেকে হলে থাকলাম তাও মেনে নিল!!

১৪ তারিখ পরীক্ষা দিয়ে খুব হতাশ ছিলাম সবার মত আমার এতটা ভালো হয় নি,সবার খুব ভালো হয়েছে আর আমার পারা জিনিস ও ভুল হল!! বাসা থেকে সবাই কল দিচ্ছিল কারো কল ধরি নি। বিকালে বাবাকে ফোন দিয়ে বললাম সব আর বললাম DU হবে না। বাবা খুব ই আগ্রহী ছিল । আমি রোল কাউকে জানাইনি যাতে আমি না বললে কেউ না জানতে পারে কিন্তু বাবা খুব বুদ্ধি করতেছিল যদি জানা যায় রোল!!

১৭ তারিখ ১১টায় রেজাল্ট এর আগেই বাসা থেকে বের হয়ে যাই। রেজাল্ট দেখে বাসায় এসে বলার পর সবার খুশি দেখে মনে হয়েছিল সত্যি তাদের কিছু দিতে পেরেছি!! কত্ত খুশি সবাই!! হ্যাঁ আমি ই ওদের খুশির কারণ।

আর সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমি যাদের কাছে কোনো ছাত্র ই ছিলাম না রেজাল্ট শোনার পর তারাই আমার জন্য বাসায় এসে বসেছিল (একদিন ওরাই ভাবত আমাকে দিয়ে কি হবে! কি ই বা করবে!)। এখন তো তাদের কাছে আমি ই বেস্ট। খুব হাসি লাগে তাদের দেখলে আর সেদিনের কথাগুলো কানে বাঝে আর ঐ মানুষগুলোর কথা মনে হয় যারা সবচেয়ে বাজে সময়গুলোতে আমার পাশে ছিল ।

পরিশেষে - ২০১৯ সালের সবাইকে বলব এখনও অনেক সময় আছে আমিও টেস্টের পর পড়ালেখা শুরু করেছিলাম ভালমত । এমনকি কলেজ লাইফের একমাত্র ফেল প্রী-টেস্টেই এসেছিল । আমার মত এত বাজে ছাত্র পারলে তোমরা কেন পারবা না!!

আর ২০২০ এ যারা এক্সাম দিবা তোমাদের অনেক সময় । প্রতিদিন অল্প অল্প পড়লেই হয় । ভাইয়া আপু রা গ্রুপে যা পোস্ট করবে ফলো করবা নিয়মিত । আমি খুব একটা ভালো পজিশন করতে পারি নি কিন্তু যারা আন্টি সমাজের কথায় জড়জড়িত তোমাদের জন্য এ লিখাটা । হুম তোমরাও পারবে, তোমরা আরো ভাল কিছু করবা ইনশাল্লাহ। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ আর তোমার কাজটা করে যাও। আল্লাহ চাইলে ফলাফল আসবেই...

 

লেখক: এবায়দুল হক রাফিন

শিক্ষার্থী বিবিএ মার্কেটিং

২৫তম ব্যাচ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাকা, ২৫ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।