বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম এভাবেই চলছে!


Published: 2018-10-22 08:30:15 BdST, Updated: 2018-11-14 15:38:03 BdST

শফিকুল ইসলাম : বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সাধারণত এমন এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় যেখানে চর্চা হয় বিশ্বমানের জ্ঞান, বিশ্বজ্ঞান। দক্ষিণবঙ্গের বাতিঘর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সাত বছর পরেও নানা কারণে থমকে আছে শিক্ষা কার্যক্রম।

লাইব্রেরি, রিডিংরুম, ল্যাবের প্রয়োজনীয় উপকরণ, ডরমেটরি, কনফারেন্স রুম, সুন্দর খেলার মাঠ, সুইমিংপুল, জিমনেশিয়াম, মসজিদ, টিএসসি, বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, কম্পিউটার ল্যাবে ইন্টারনেট সংযোগ, ই-জার্নাল ও ই-লাইব্রেরি ব্যবহার, প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা, সরকারি খরচে হলে ইন্টারনেট সংযোগ, হলের রিডিংরুম, গেস্টরুম, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এসব কিছুই পূর্ণাঙ্গ নেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা লেগেই আছে। লোকপ্রশাসন, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং, হিসাব বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে ৬/৭ টি ব্যাচের জন্য ক্লাসরুম মাত্র একটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনটি ক্লাসরুম দুই বিভাগ ভাগাভাগি করে ক্লাস পরিচালনা করে থাকে। বিকল্প হিসেবে ক্যাফেটেরিয়া ও নির্মানাধীন লাইব্রেরী ভবনেও ক্লাস নেয়া হয়। যার ফলে প্রতিদিন ক্লাস নেয়াও সম্ভব না।

সব সমস্যাকে ছাপিয়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে সেশন জট। অর্থনীতি বিভাগের ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ সেশনে জট আছে প্রায় দেড় বছর। ২০১৩-১৪ সেশনে গণিত, লোকপ্রশাসন, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান, বাংলা বিভাগসহ অধিকাংশ বিভাগের ৮/১০ মাস এবং ২০১৪-১৫ সেশনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট, ফিজিক্স, ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান সহ বেশীর ভাগ ডিপার্টমেন্টই ৬/৭ মাস সেশনজট রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিকাশ, স্বপ্নের সম্পূর্ণতা,আলোকস্নাত মুক্তি এবং জ্ঞান আহরণের প্রানকেন্দ্র হল লাইব্রেরি। পর্যাপ্ত বই থাকবে সেখানে, কিন্তুু লাইব্ররিতে বা সেমিনারে প্রয়োজনীয় বই নেই। লাইব্রেরিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বইয়ের সংখ্যা মোট ১৮৬ টি। যার মধ্যে এক বই পাঁচ /দশ কপিও আছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বায়োকেমেস্ট্রি ও বায়োটেকনোলজি, কোস্টাল স্টাডিজ এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এবং দর্শন বিভাগে সংখ্যার হিসেবে দশ পনেরটির বেশী বই নেই।কোর্স ভিত্তিক বইয়ের সংখ্যাও কম।শিক্ষার্থীরা এমন অনেক কোর্সও সম্পন্ন করেছে যে কোর্সের কোন বই লাইব্রেরিতে ছিল না, এখনও নেই। ইন্টারনেটের বিভিন্ন আর্টিকেলই ছিল একমাত্র রিসোর্স। সব বিভাগেই কোর্স ভিত্তিক বই পাওয়া দুষ্কর। কেন্দ্রীয় লাইব্ররিতে একত্রিশ হাজার চারশতো ই-জার্নাল ও একলক্ষ বারো হাজার ই- বুক রয়েছে কিন্তু কম্পিউটার ল্যাবে ইন্টারনেটের পরিপূর্ণ ব্যবহার না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞান অনুষদের ল্যাবেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্র। পড়ানো হচ্ছে মাইক্রোবায়োলজি অথচ ল্যাবে নেই মাইক্রোস্কোপ। শিক্ষার্থীরা জানেনা কিভাবে মাইক্রোস্কোপ ধরতে হয়। আছে ডিস্টিলেশন প্রোসেস (Distillation Process) যন্ত্র কিন্তু তাও ঠিকভাবে রান হয় না। কয়েকটি বিভাগে ল্যাবে প্রয়োজনীয় যন্ত্র থাকলেও অধিকাংশ বিভাগই ধারদেনা করে ল্যাবের কাজ সম্পন্ন করে। এভাবেই দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পাশাপাশি সর্বাগ্রে দরকার দক্ষ, যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ, আদর্শবান শিক্ষক।বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র -শিক্ষকের অনুপাতে শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। ৪৪ জন প্রফেসর পোস্টের ৪৩টি, ৬৬ জন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পোস্টের ৬৫ টি পোস্ট খালি। ২৪১ জন লেকচারার থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৭৩ জন। অর্থাৎ ৪৯% পোস্ট খালি। তারপরেও গতদুই বছর ধরে প্রতিবছর দুটি করে বিভাগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। একজন শিক্ষককে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্লাস নিতে হচ্ছে। একজন শিক্ষক ৭/৮ টি করে কোর্স নেন সাথে আরো অনেক ল্যাব পরিচালনা করেন। অনেক বিভাগেরই ব্যাচের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কম অর্থাৎ ৩/৪ জন শিক্ষক দ্বারা ৫/৬টি ব্যাচ পরিচালিত হয়।

একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগে ৩ জন শিক্ষক ৬টি ব্যাচ পরিচালনা করছেন। শিক্ষক স্বল্পতা পড়ালেখায় কতটা প্রভাব ফেলছে তা অনুধাবন করা খুবই সহজ।
তরুণ শিক্ষকরা পাঠদানের পূর্ব প্রস্তুতিরও সময় পাচ্ছে না। এটা গুনগত পাঠদান ও সঠিক শিক্ষা গ্রহনের অন্তরায়। শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক অযোগ্য হয়ে গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা অথচ তাদের সামর্থের বাইরে আদায় করা হচ্ছে ভর্তি ফি, সেমিস্টার ভর্তি ফি, মান উন্নয়ন ফি, পরিবহন ফি,বিভাগ উন্নয়ন ফি, চিকিৎসা ফি সহ নানান ধরনের ফি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা দিয়ে পড়ালেখা করলেও শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ পাচ্ছে না।

এই যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এর নমুনা তাহলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষালাভের অধিকার রাষ্ট্র কিভাবে নিশ্চিত করবে? দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ধার-দেনা করে কিংবা জমিজমা বিক্রি করে ভর্তি ফি-এর ধাক্কাটা হয়তো সামলে নেয়। তারপরও তার সামনে দীর্ঘ পথ বাকি থাকে। প্রতিবার সেমিস্টার ফি, পরীক্ষার ফি, বিভাগ উন্নয়ন ফি, পরিবহন ফি, চিকিৎসা ফি কীভাবে জোগাড় হবে তা অধিকাংশ ছাত্রদেরই তাড়িয়ে বেড়ায়। অাবাসন সংকটের কারনে হলেও স্থান পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

পড়ালেখা শেষে হয়তো একটি সনদ পাওয়া যাবে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা যেভাবে অযোগ্য হয়ে গড়ে উঠছে তা কি দেশের উপকারে আসবে একজন দিনমজুর রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, কৃষক, জেলে থেকে শুরু করে একজন ভিক্ষুক পর্যন্ত সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর টাকায় চলে বিশ্ববিদ্যালয়। একজন ভিক্ষুক যখন দশটাকার কেরোসিন ক্রয় করে সেখানেও সে সরকারকে ভ্যাট দেয়। তাই বলতে গেলে শিক্ষার্থীরা একজন ভিক্ষুকের কাছেও দায়বদ্ধ। সুতরাং জনগণের টাকা দিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে প্রতারণাই করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাত বছর পরেও শিক্ষা অর্জনে সহায়ক মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষা উপকরনের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত হাজার শিক্ষার্থী অযোগ্য হয়ে গড়ে উঠছে। এ দায় কে নিবে?

শিক্ষা আমাদের অধিকার। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিংহভাগ শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় অদূর ভবিষ্যতে একটি নাম সর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে। আশা করি, তেমন কিছু হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সজাগ দৃষ্টি দেবে।

শফিকুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২২ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।