আমার শিক্ষকেরা


Published: 2018-10-06 22:19:51 BdST, Updated: 2019-06-25 00:17:12 BdST

শেখ মো: ফায়েকুজ্জামান টিটো: “শিক্ষক প্রদীপের মত নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যকে আলো দান করেন, অর্থাৎ শিক্ষক অমর, তিনি বেঁচে থাকেন ছাত্রের আদর্শের মাধ্যমে" ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ ইউনেস্কো এবারের শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে “শিক্ষার অধিকার মানে হচ্ছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়ার অধিকার”।

শিক্ষক কথাটা শুনলেই সম্মান আর শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়। পিতা-মাতার পরেই মূলত শিক্ষকদের অবস্থান।শিক্ষকতা পেশা নয় মহান ব্রত। এ ব্রত পালনে শিক্ষককে হতে হয় নৈতিক আদর্শে উজ্জ্বল। যিনি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে জ্ঞান তৃষ্ণা জাগিয়ে, মনের সুকুমার বৃত্তিগুলোর পরিচর্যা করে শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানুষে পরিণত করেন তিনিই শিক্ষক।

আমাদের দেশে আদর্শ শিক্ষকের বড় অভাব। সততা, নৈতিকতা, উদারতা, আধুনিকতা, ব্যক্তিত্ব তথা সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষকই আদর্শ শিক্ষক। কেবল শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করাই শিক্ষকের দায়িত্ব নয়। তিনি শিক্ষায় নীতি-নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও আদর্শ মূল্যবোধ শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দিবেন।

একজন প্রকৃত শিক্ষকই ধারাবাহিকভাবে একজন ছাত্রকে সহজ থেকে কঠিনের দিকে, জানা থেকে অজানার দিকে, জ্ঞানের বিন্দু থেকে নিয়ে যান জ্ঞানসমুদ্রের দিকে। প্রত্যেক শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর শিক্ষার প্রতি অনুরাগ জাগ্রত করা। শিক্ষার্থীদের অন্ধকার হতে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া এবং বাস্তব ও সত্য অনুসন্ধানে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা।

শিক্ষকদের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা। আর এই দায়িত্ব পালন করতে হলে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। তাঁকে মনে রাখতে হবে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন সর্বোচ্চ বিচারক। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের যথার্থ মূল্যায়নে ব্যর্থ হলে বা ভুল করলে ধ্বংস হয়ে যাবে একটি প্রজন্ম, একটি জাতি তথা একটি দেশ।

প্রয়োগ আর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমাজ-শিক্ষা আর প্রগতি মিলে একাকার হয়ে গেছে। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মেধাবিকাশ, উৎকর্ষতা ও জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমি বলা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে। শিক্ষা শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার আছে যা ভিন্নভিন্ন অনুষঙ্গে কাজে লাগানো হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা কে অনেক সম্মানের একটা পেশা মনে করা হয়। উন্নত বিশ্ব শিক্ষা আর শিক্ষকের কদর জানে বলেই তারা আজ উন্নতির শিখরে।

একটা ঘটনা বলি সেটা ২০১১ সালের দিকে সেবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র পাঠক ফোরাম নামক একটা সংগঠনের আমন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন দেশ বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মো: জাফর ইকবাল স্যার। স্যার তাঁর দেশে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় আসার গল্প শুনিয়েছিলেন।

মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় স্যারের কথা শুনছিলাম। আমেরিকা থাকতে স্যারের ঘাড়ে ব্যাথা হয়েছিল অনেক নামকরা ডাক্টার দেখিয়েছিলেন কিন্তু তেমন কোন ফল হলনা। শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করার পরে স্যরের ঘাড়ের এতবেশি ব্যায়াম হয়েছিল যে সেই ব্যাথা আর ছিলনা। স্যারের ভাষ্যমতে প্রতিদিন যখন ক্লাস নিতে যেতাম অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীরা সালাম দিত আমি উত্তর দিতে ঘাড় নাড়াতাম, ওরা জিজ্ঞাসা করত স্যার কেমন আছেন আমি ঘাড় বাম দিকে ঘুরিয়ে বলতাম আমি ভাল আছি আবার ঘাড় ডানদিকে ঘুরিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করতাম তোমরা কেমন আছ? আর প্রতিদিন এভাবে কতশত বার যে ঘাড়ের ব্যায়াম হত যে ব্যাথা কোথায় যে উদাও হয়ে গেল।

আমার শিক্ষকতা জীবনের হাতেখড়ি হয় নিজের পরিবারেই সেই হিসেবে আমার মা-বাবা আর ভাই-বোনেরাই আমার প্রথম শিক্ষক (অবশ্য শিক্ষক বলতে আমি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানকারীদের বোঝাইনা)। সেই বাল্যকালের কথা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই আরবী পড়াশুনা শুরু করি মক্তবে(গ্রামে তখন একে ছিপারা পড়া বলতাম)।

মরহুম মোতালেব মুন্সি (আমাদের মসজিদের ইমাম ছিলেন) কি যত্ন করেই না আমাদের পড়াতেন। আমার নানা বাড়ী এলাকার এক হুজুর ছিলেন (নাম মনে করতে পারছিনা) কি সুন্দর করে যে পড়াতেন তাতে আমার মত বাউণ্ডেলে ছেলের পড়ার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যেত।

যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পা রাখলাম তখন সব দৃশ্য পাল্টে গেল মক্তবের মত সেই সুর করে পড়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। মোট ৩ টা বই ধরিয়ে দেওয়া হল পড়ার জন্য ওরে বাবা সে যে কি যন্ত্রনা।

প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল শিক্ষা জীবনের আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা যা শুরু হয়েছিল বিভূতি স্যারের হাত ধরে। বিভূতি স্যার আমাদের পরিবারে আলোর যে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন তা হয়ত আরো শত থেকে হাজার বছর জ্বলবে।পরীক্ষার হলে নারায়ণ স্যার মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে পড়তেন আর উঠেই স্যারের সেই ডায়লগ ‘ঘুঘু দেখেছো কিন্তু ফাঁদ দেখনি’।

গোপাল স্যারের কথা মনে উঠলে এখনো ভয়ে আঁতকে উঠি হাতের দিকে তাকাই স্যারের বেতের দাগ এখনো হাতে আছে কিনা। প্রধান শিক্ষক ছিলেন ওহাব স্যার কি অমায়িক আর ভাল মানুষ ছিলেন তা বলে বোঝানো যাবেনা। আর একজনের কথা বলি যিনি আদব-কায়দা আর শৃঙ্খলা শিখিয়েছেন সাথে নামাজী হতে উৎসাহিত করেছেন মরহুম মাওলানা খলিলুর রহমান সাহেব।

উচ্চ-বিদ্যালয় ছিল আমার বাড়ির পাশেই তাই শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহুর্তগুলোর সাক্ষী আমার এমকেবিএইচ উচ্চ বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক সামসুদ্দিন স্যারের অনর্গল ইংরেজি বলা আর দক্ষ ব্যবস্থাপনা। মুন্সি সাইদুর রহমান স্যরের গ্রামার আর ইংরেজি পড়ানোর সেই স্টাইল এখনো কাজে লাগে।

অমৃত স্যারের এক্সট্রা জ্যামিতি করানোর কৌশল আর পড়তে না চাইলেও জোর করে পড়ানো। সুদর্শন সচীন স্যারকে দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যেত। বিজয় স্যারের জাবেদা-রেওয়ামিল আর চূড়ান্ত হিসাব শেখানোর কৌশল এখনো চালিয়ে যাচ্ছি। আশিষ স্যরের সাধারণ বিজ্ঞান পড়ানো দেখলে মনে হত ইস কেন যে সাইন্স নিলাম না।

গিয়াস হুজুরের ইসলাম শিক্ষা থেকে তো আমি রীতিমত ছোট-খাট ওয়াজ চালিয়ে দেই এখনো। নিত্যনন্দ স্যারের স্মার্টনেস আর সমর স্যারের গুরুগাম্ভীর্য সাথে সত্যেন স্যরের সময়ানুবর্তিতা আর আমাদের বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা আর প্রশান্ত স্যারের সেই হাজার বছর ধরে উপন্যাসের রোমান্টিক সেই ডায়লগ বলার ধরন এখনো মনে পড়ে।

কলেজ জীবনে সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মরহুম আনোয়ার হোসেন স্যার। স্যারের কথা বলার ভঙ্গিমা ব্যবস্থাপনা আমাকে ভাল ভাবেই শিখিয়েছে। সত্যেন স্যারের হিসাববিজ্ঞান পড়ানো আর নিজের সাথে লড়াই করতে থাকা হুমায়ুন স্যরের পড়ানো।

বাংলার বিকাশ স্যার আর উৎপল স্যারের রসে ভরা সাহিত্য। সোহরাব স্যারের লন্ডনী স্টাইলে ইংরেজি বলা আর তরুণ স্যরের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করার ধরণ। প্রণয় স্যরের কৃষিবিজ্ঞান পড়ে রীতিমত খুশিতেই থাকতাম। মনোজ স্যারের সেই শর্ঠহ্যান্ড পড়ে তো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।

স্বপ্নের জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়েছি পরিশ্রমী সাইদুজ্জামান স্যার, জাদরেল সুবাস স্যার, সদা হাস্যোজ্জ্বল রোকসানা ম্যাম, ভয় পেতাম প্রামাণিক স্যার আর আনোয়ার স্যারকে। বন্ধুর মত মনে হত মজিদ স্যার, তাজুল স্যার আর আহসান হাবীব স্যারকে।

আব্দুল্লাহ আল হারুন স্যর, ফাহিমা ম্যাম,নজরুল স্যার,দেলোয়ারা ম্যাম, সালমা বানু ম্যাম সহ আরো অসংখ্য শিক্ষক যারা আমাকে শুধু শিক্ষা নয় একজন ভাল মানুষ হওয়ার জন্য সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কেউ যদি বলে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক কে? এর সহজ উত্তর আমারই অগ্রজ সহোদর প্রিয় রোকুনুজ্জামান ভাই যাকে আমরা দাদু বলে ডাকি।

তিনিই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক, অভিভাবক আর ভাই যার অনেকটা একক প্রচেষ্টায়ই গ্রামের সেই টিটোর ফায়েকুজ্জামান হয়ে উঠা ও আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পরম শ্রদ্ধা আর সম্মানের সাথে স্মরণ করছি সেই সব গুরুজনদের প্রতি যারা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন,শিখিয়েছেন এবং এখনো শেখাচ্ছেন। আমি আমার সকল শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ কারন তাদের শিক্ষার ফলেই আজ আমিও একজন শিক্ষক হতে পেরেছি। শিক্ষকদের শির উন্নত হোক, ভাল থাকুক সকল শিক্ষকেরা।

শেখ মো: ফায়েকুজ্জামান টিটো
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর
হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
ইমেইল: fzaman.ru@gmail.com

 

 

 

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।