ছুটিতেও ক্যাম্পাসে : মায়ের কণ্ঠস্বর ভারী, বোনের অভিমান!


Published: 2018-06-11 13:38:03 BdST, Updated: 2018-10-23 05:47:54 BdST

তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া : বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ছুটি থাকা সত্ত্বেও বাড়ি যেতে পারছে না। হয়ত চাকরির পড়াশোনা, টিউশন, পার্টটাইম জব। ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠস্বর ভারী হয়, বোনের অভিমানের পাল্লা দৃঢ় হয়। 'খুব শীঘ্রই আসব' এই সান্ত্বনা বাণীতে শান্ত করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞতা বা নিতান্তই বিলাসিতার বশে পার্টটাইম জব কিংবা টিউশনি করায় এমন পরিসংখ্যান একেবারেই নগন্য। যে ছেলেদের সকালে, দুপুরে, বিকেলে পারফিউমের ব্র্যান্ড বদল হয় আর যেসব মেয়েরা এসির নিচে বসে দিনে সাতবার মেকাপ চেক করে তারা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আর লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে টিউশনি বা পার্ট টাইম জব করতে গেছে এমনটা আমার চোখে পড়েনি। বসের ঝাড়ি, অভিভাবকদের কটু কথা, তিক্ত অভিজ্ঞতা সব কিছু মেনে নিয়ে আর কখনও কখনও আত্মসম্মানকে পাশ কাটিয়ে প্রয়োজনীয়তাকে বড় করে দেখতে হয়।

একবার এক ফ্রেন্ড মেসেজ দিল, 'একটা টিউশন ম্যানেজ করে দিতে পারবি? খুব দরকার।' আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, 'আচ্ছা দেখি কী করা যায়।' আমি কিছুই করতে পারিনি। ঘুরে ফিরে আমাদের প্রায় সবার কাহিনী এক। এখানে জীবন মানে সাহিত্যের রসালো পার্ট নয়, জীবন মানে কঠিন সংগ্রাম। এখানে জীবন মানে বাবার কষ্টের বোঝা কিছুটা নিজের কাঁধে নিয়ে মানুষটাকে একটু স্বস্তি দেওয়া। এখানে জীবন মানে বোনের নূপুর, ভাইয়ের প্রাইভেট খরচ, মায়ের শাড়ি, বাবার পাঞ্জাবি।

একটা সময় থাকে প্রথম প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে অনেক ছেলে প্রেম করার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকে। চোখের কাজল, এলেমেলো চুল, গিটারের টুংটাং, অগোছালো কবিতায় কেউ একজন থাকে। আবার একটা সময় আসে সেরা সুন্দরী এসেও যদি বলে, 'চল পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি।' ওপাশ থেকে মুচকি হেসে উত্তর আসে 'অনিশ্চয়তার মুখে কাউকে ফেলে দেওয়া মহা অন্যায়। তুমি ভালো কাউকে খুঁজে নাও।' চোখের কাজল লেপ্টে যেতে যেতে এই মেয়েরাও অন্য কারো ঘরের বউ হয়, কখনো বলা হয় না 'ডিয়ার মা-বাবা আমারও কিছু বলার ছিল।'

একটা সময় থাকে যখন ক্লাসের সেরা ছাত্রের খাতা ফটোকপি করে ক্লাসের ব্যাকবেঞ্চারদের কাজ চলে। কম সিজিপিএর দৈন্যদশায় বন্ধু মহলে চুপটি করে মুখ লুকোতে হয়, টিচারদের কড়া পরিহাস আর একরাশ হতাশা মাকড়সার জালের মত আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে। পরিবারের কঠিন দায়িত্ব মাথায় চেপে বসে, হয়ত বোনের বিয়ে, বাবার অপারেশন, ফুটো টিনের ঘর। ওদিকে কাঁটা গায়ে নুনের ছিটার মত পড়শীরা শোনাতেই থাকে, 'অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পইড়া কী করলা জীবনে?'

চাপা তলার আড্ডা, বার্থ ডে সেলিব্রেশান, টিএসসিতে চায়ের কাপে ঝড় সব এক সময় ফ্যাকাসে হয়। জীবন এখানে আবেগের নয়, বাস্তবতার। একলা চলো নীতিতে বিশ্বাসী হতে হয়।

"পড়াশোনা করে কী হবে? " নীতিতে বিশ্বাসী ছেলে-মেয়েদেরও এক সময় হুশ হয় তখন তারা "কিছু একটা করতেই হবে" নীতিতে বিশ্বাসী হয়, বাধ্য হতে হয়। সবচেয়ে ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীরাও এক সময় লাইব্রেরিতে দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কোন তাড়া নেই। তাড়া একটাই 'নিজের জীবন নিজে গোছাও নয়ত পস্তাও।' আমি অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি বলে অহংকারে মাটিতে পা না পড়া মানুষটারও এক সময় মাটিতে পা রেখেই অন্য দশটা মানুষের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। ছাড়পোকার কামড়, সিনিয়রদের দৌরাত্ম্য, বাসি-পঁচা খাবার সবই এক সময় বাসি হয়।

যার আঞ্চলিকতা শুনে এক সময় অন্যরা হেসে লুটোপুটি খেত আজ সেই ব্যক্তিও হয়ত গটগট করে চার-পাঁচটা ভাষা শিখে তার ক্লায়েন্টদের সাথে বিজনেস ডিল করে। অমুক জায়গায় পড়ে বলে হয়ত কোনদিন তার সাথে কথা বলার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করেননি। কে জানে সেই হয়ত বসে আছে কোন একটা অফিসের বস হয়ে। সৃষ্টিকর্তা পরিশ্রমীদের কখন কোনদিকে, কীভাবে দু'হাত ভরে দেবে কেউ জানে না। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা কিছু না পাওয়া অতশত হিসেব করার সময়ও হয়তো থাকবে না।

চোখের জলের হিসেব যিনি রেখেছেন তিনি কাউকে ঠকিয়ে দেন না, হয়ত তিনি অনেক বেশি কিছুই আপনাকে দেবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন। আপনি পেতে চান কিনা নিজেকেই প্রশ্ন করুন, উত্তর খুঁজুন। বসে বসে তাকে দোষারোপ করে কেউ জিততে পারেনি, যারা জিতেছে শুনে দেখুন চোখের জলের প্রত্যেক ফোঁটায় কত তিক্ততায় ভরা কাহিনী লেখা আছে। সে কাহিনী কেউ না জানুক উপরে যিনি আছেন তিনি অবশ্যই জানেন। জেনে বুঝেই সেই পরিশ্রমীকে তিনি জিতিয়ে দিয়েছেন। এই জেতাটা তার প্রাপ্য।

লেখক : তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১১ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।