বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ: বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধিবে কে?


Published: 2018-05-22 14:04:25 BdST, Updated: 2018-06-18 15:11:24 BdST

অভিজিৎ সরকার: সময় এখন পরিবর্তনের কথা বলে মেধা, মননশীলতা পরিবর্তনে ডানা মেলে। পরির্তন হয় চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধি আনে উৎকর্ষ উদ্ভাবনায়। তারুণ্য দীপ্ত পরশে বদলে যায় চির চেনা রূপ, ভেঙ্গে যায় দীর্ঘ দিনের অচলায়তন। তারুণ্য দীপ্ত পথে চলতে গিয়ে তৈরী হয় সম্ভবনার অনি:শেষ দাঁড়, উদ্ভাবন হয় গবেষণার নতুন নতুন ক্ষেত্র। তারুন্যের জয়গানে যখন পরিবর্তনের সুর বেঁজে উঠেছে তখন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা বদলেছে?

চোখ রাঙিয়ে বেড়ানো "গবেষণা কর্ম" এখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের দৈন্যদশা। প্রশ্ন তুলছে উচ্চ শিক্ষা ব্যাবস্থার মেরুদণ্ডের মেরুদণ্ডে (শিক্ষক)। যেখানে গবেষণা চর্চায় নতুন নতুন আবিষ্কারে মুখিয়ে আছে জাতি সেখানে "গবেষণা কর্ম" চুরি, কক্ষে প্রেমালাপের নেতিবাচক সংবাদে আলোচিত আমাদের শিক্ষক সমাজ। আমাদের গবেষণায় পিছিয়ে পড়ার জন্য শুধু মাত্র স্বল্প বাজেট যে দায়ী তা নয় এর পিছনে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যাবস্থা ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া।

ব্রিটিশ উপনিবেশের আদলে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যাবস্থায় যে পরিবর্তন আসেনি তা মান্দাতার আমলের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ই জানান দিচ্ছে পাশাপাশি সুযোগ করে দিচ্ছে অনিয়ম, দুর্নীতি, দলপ্রীতি সহ সংশ্লিষ্ট বিষয় গুলোকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তিনটি বিষয়কে বৈশিষ্ট্য হিসাবে ধরা হয় তা হল:
১) জ্ঞান চর্চা
২) পাঠদান
৩) নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী তার অনার্স মাস্টার্সে সবচেয়ে বেশী ভালো ফলাফল করবে তাকেই শিক্ষক নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রায়ই নির্ধারণ করে দেয়া থাকে বিশাল মাপের তথাকথিত ন্যূনতম যোগ্যতা।

যেখানে শিক্ষা ব্যাবস্থার কোন অংশেই প্রমানিত হয় না সেরা শিক্ষার্থী সেরা শিক্ষক হবে সেখানে ন্যূনতম যোগ্যতার বিষয়টি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। পাঠদানের দক্ষতা, জ্ঞান চর্চা, নতুন জ্ঞানের বিকাশ (গবেষণা) এই তিনটি বিষয়কে তুচ্ছে করে তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দেয়া হয় মুখস্ত বিদ্যার অতল সাগরে।

কথিত ইতিবাচক পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পাঠদানে, শিক্ষা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় কিছু নোট শীটে।শিক্ষকরা দিনের পর দিন একই নোট একই লেকচার শীট পড়ানোর ফলে একদিকে যেমন নতুন জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে না অন্যদিকে সৃজনশীলতার ও বিকাশ ঘটে না।
যেখানে একজন ব্যাক্তি সিজিপিএ ৩.০০ কিংবা তার চেয়ে কম নিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, সেখানে শিক্ষক নিয়োগে বেঁধে দেয়া সিজিপিএ নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন উঠতে পারে শুধু মাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে কেন নিয়োগ দেয়া হবে? মেধাবীদের লিখিত পরীক্ষায় বসতেইবা এত অনীহা কেন? যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনীতির আধিপত্য ধ্বংস করে দিচ্ছে মেরুদন্ড কে সেখানে লিখিত পরীক্ষা প্রকৃত মেধাবীদের খোঁজে বের করে আনার পাশাপাশি মুখস্তবিদ্যার উপর ভর করে সিজিপিএ ভালো করা শিক্ষার্থীদের লাগাম টানার সুযোগ করে দিবে।

যে তরুণ প্রজন্ম স্লোগান দিচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, সে তরুণ প্রজন্ম কখনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি কে আশ্রয় দেয় এমন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আপোষ করতে পারে না। প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র শিক্ষকতার মহান পেশা কে ই অপমানিত করছেনা, করছে সমগ্র শিক্ষা ব্যাবস্থাকে।

যেখানে শিক্ষকদের সম্মান থাকার কথা সবার উপর সেখানে শিক্ষক নিয়োগের কথা আসলে সাধারণ মানুষের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া নানা সন্দেহ নানা উৎকন্ঠার জন্মদেয়। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষকতা পেশার প্রতি মানুষ নিশ্চিত আস্থা হারাবে। শিক্ষরা হয়ে উঠবে সমাজে অশ্রদ্ধার পাত্র।

তাই এই অচলায়ত ভেঙ্গেদিতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নয় যারা শিক্ষকতার পেশা কে ভালবাসেন শিক্ষকতায় আগ্রহী তাদের কে ও এগিয়ে আসতে হবে সমানতালে।প্রতিহত করতে হবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি কে দেশের স্বার্থে, সম্মান টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ত্যাগ করতে হবে ব্যাক্তি স্বার্থ।

সিজিপিএর উপর ভর করে শুধু মাত্র ভাইবার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলে কোন ভাবেই অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া কে স্বচ্ছ করার জন্য নিম্নোক্ত বিষয় গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।

১/ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ের পাঁচ সদস্যের আলাদা নিয়োগ বোর্ড গঠন করা যেতে পারে।

২/ নিদিষ্ট মার্কের লিখিত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

৩/ টিচিং স্টাইল ক্যাপাসিটি যাচাই করার জন্য চুক্তি ভিক্তিক নিয়োগের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।

৪/ প্রভাষক পদের জন্য বিবেচিত হতে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রে প্রকাশিত গবেষণা পত্র থাকা আবশ্যক করার পাশাপাশি পর্যায় ক্রমিকভাবে গবেষণা পত্র ছাড়া পদন্নোতির বিধান না করা।

৫/ শিক্ষক নিয়োগে ন্যূনতম যোগ্যতা শিথিল করে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি লিখিত, মৌখিক ও একাডেমিক সার্টিফিকেটের উপর আলাদা আলাদা মার্ক রাখা যেতে পারে।

ইউজিসি সাম্প্রতিক সময় লিখিত পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তাব করলে ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দোহাই দিয়ে পাশকাটিয়ে যাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষক নিয়োগের অচলায়ন ভাঙ্গা যে জটিল তারই ইঙ্গিত বহন করে।

যে দেশে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেবাশীষ জীবন উৎস্বর্গ করে গেলে ও বিন্দু মাত্র টনক নড়ে না সে দেশে এগিয়ে এসে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধিবে কে?

লেখক:
অভিজিৎ সরকার
শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঢাকা, ২২ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।