ক্যারিয়ার মানে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিসিএস ক্যাডার!


Published: 2018-05-15 12:38:47 BdST, Updated: 2018-05-21 13:01:21 BdST

মুহিত আহমেদ জামিল : হাতের পাঁচ আঙুল যেহেতু সমান নয়। সেহেতু সবাই যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর বিসিএস ক্যাডার হবেন এটাও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমাদের দেশের গার্ডিয়ানদের মধ্যে এই কমন সেন্সটার যথেষ্ট অভাব আছে।

তারা হাতের পাঁচ আঙুলকে সমান মনে করেন। ওমুকের ছেলেমেয়ে ডাক্তার হতে পারলে আমার ছেলেমেয়ে কেনো পারবে না? তাকে পারতেই হবে। যাইহোক না কেনো, ছেলে/মেয়েকে আমি ডাক্তার বানাবোই বানাবো। অনেকদিনের শখ বলে কথা!

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর বিসিএস ক্যাডার হওয়া ছাড়া জগতে যেন আর কিছুই হওয়া যায় না। উন্নত বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা ইচ্ছেমত এইম ইন লাইফ চয়েস করতে পারেন। তাদের বাবা-মায়েরা জন্মের পরপরই বলেন না, বড় হয়ে আমার ছেলেটা/মেয়েটা ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে।

ছেলেমেয়েরা বড় হোক, তাদের যেটা ভালো লাগবে, তাদের যেটা করতে আনন্দ লাগবে, সুখ লাগবে, যেইটা করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে তারা সেইটাই করবে। এই হলো উন্নত দেশের গার্ডিয়ানদের চিন্তাভাবনা।

আমাদের দেশের দিকে তাকান। ভয়াবহ একটা ট্রেন্ড চালু আছে এখানে। সবাইকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিসিএস ক্যাডার হতে হবে। আমার পরিচিত বেশ কিছু ছেলেমেয়ে আছে, যারা কিনা শুধুমাত্র বাবা-মায়ের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারি পড়াশোনা করে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।

এককালের সুপারহিট রেজাল্ট করা ছেলেটা এখন প্রায় প্রত্যেকটা পরীক্ষাতেই ফ্লপ রেজাল্ট উপহার দেয়। টিচাররা বলেন, "এভাবে পড়াশোনা করলে আর যাই হও না কেনো, জীবনেও ডাক্তার হতে পারবা না। ডাক্তার হতে হলে ডাক্তারি পড়াশোনাকে ভালোবাসতে হবে, আপন করে নিতে হবে।"

আমাদের দেশে সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করা বেশীরভাগ স্টুডেন্টরাই এইচএসসি পাশের পর ডাক্তারি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। নিজেদের ইচ্ছায় যতসংখ্যক ভর্তি হয়, তার চেয়ে বেশী ভর্তি হয় তাদের গার্ডিয়ানদের ইচ্ছায়, গার্ডিয়ানদের চাপে পড়ে। গার্ডিয়ানদের চাপ আর কত দূর পর্যন্তইবা লাস্টিং করে?

পড়াশোনা ঠিকঠাক মত না করার কারণে এদের অধিকাংশেরই আর ডাক্তারিতে চান্স হয় না। হুট করে আবার ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য ভালো ডিপার্টমেন্টেরও প্রিপারেশন নেওয়া সম্ভব হয় না। যেহেতু ডাক্তারি সিলেবাসের সাথে ওইসব সিলেবাস মিলে না। ম্যাথের আগা-মাথা খুব একটা বুঝে না। তারপরেও বাসা থেকে চাপ দেয় ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করার জন্য।

নিজের ভালোলাগা ব্যতীত সর্বোচ্চ এফোর্ট দেওয়া সম্ভব হয় না। এ কূল, ওই কূল সবকূলই শেষ অবধি হারানো লাগে! এভাবেই ট্র্যাক থেকে ছিটকে পড়া নতুন নতুন ডিপ্রেশন রোগীদের জন্ম হয়। এদেশে জন্মের পরপরই বড় হয়ে সে কী হবে এইটা নিয়ে গার্ডিয়ানদের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। এই জিনিসটা ঠিক না। কে কী হবে, কার স্বপ্ন কী এইটা সে নিজেই সবচেয়ে ভালো বুঝবে।

তাকে সাজেশন দেওয়া যেতে পারে। "দেখো বাবা, এইটা করে তোমার লাইফে খুব বেশীদূর যেতে পারবে না। এই জিনিসটা আমাদের সমাজের সাথে যায় না।" এইভাবে বুঝানো যেতে পারে। তাই বলে জোর করে কারো উপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়াটা মোটেই ঠিক না।

সন্তানদের এইম ইন লাইফ তারা নিজেরাই ঠিক করবে। সেখানে গার্ডিয়ানদের হস্তক্ষেপ করাটা উচিত না। সন্তানরা যদি ভুল কিছু সিলেক্ট করে তখনই কেবল হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে। তবে সেটা শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নয়। বুঝিয়ে শুনিয়ে।

শুধু শুধু গার্ডিয়ানদের দোষ খোঁজেও লাভ নাই। আমাদের স্টুডেন্টদেরও দোষের অভাব নাই। গার্ডিয়ানদের মুখের ওপর এরা কথা বলতে পারে না, পাছে বেয়াদবি হয়ে যায় এই ভয়ে। অথচ, ঠিকঠাক মত নিজের ইচ্ছার ব্যাপারটা বুঝাতে পারলে বেশীরভাগ গার্ডিয়ানদেরই সেটা বুঝার কথা।

প্যাশনের সাথে ক্যারিয়ার মিলে গেলেই সবচেয়ে বেশী আউটপুট দেওয়া সম্ভব। নিজের ভালো লাগার জায়গাতেই মানুষ সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করতে পারে। আনফরচুনেটলি, আমাদের দেশে নিজের প্যাশনের জায়গা আর ক্যারিয়ারকে এক করাটা ব্যাপক মুশকিলের কাজ।

প্যাশন আর ক্যারিয়ারের মেলবন্ধনে গার্ডিয়ানদের হস্তক্ষেপ, বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার মন-মানসিকতা, অসুস্থ প্রতিযোগীতা, জটিল শিক্ষা ব্যবস্থা, যার যেটা নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা তাকে সেটা নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ দিতে না পারা... এইসব কারণগুলোই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিয়ে করার জন্য বর বা কনে চয়েসে যেমন সন্তানদের নিজস্ব পছন্দকে প্রায়োরিটি দেওয়ার একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে, কে কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে, ক্যারিয়ার গড়বে এইটা সিলেক্ট করতেও সন্তানদের নিজস্ব পছন্দকে প্রায়োরিটি দেওয়ার ব্যাপার-স্যাপার আছে।

ভালোবাসা, ভালোলাগা ব্যতীত সংসার করা যেমন কঠিন, নিজের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়াটাও ঠিক তেমনই কঠিন!

মুহিত আহমেদ জামিল
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৫ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।