33076

লকডাউনের ঈদ! ভার্চুয়াল ঈদ!

লকডাউনের ঈদ! ভার্চুয়াল ঈদ!

2020-05-28 21:08:45

আহমেদ জুনাইদ: বলছিলাম এই লকডাউনের কথা। আবদ্ধ পরিস্থিতি, স্থবির জনজীবন। যার মধ্যেই হয়ে গেলো মুসলমান জাতির সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। লকডাউনে ঘর বন্দী জীবনে ঈদও কি অন্যান্য দিনের মতোই কেটেছে? নাকি কেউ কেউ ভিন্ন কাজের মাধ্যমে পেয়েছেন পূর্ণতা। জেনে আসা যাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মুখ থেকেই। তারা তাদের নানানবিদ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ক্যাম্পাসলাইভকে।

মাজহারুল ইসলাম। ইংরেজি বিভাগ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি জানালেন, ঈদের নামাজ পড়ে এসে সেলামি আর সেলফি দুটো তুলেই ফুটবল বা ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে মাঠের দিকে সদলবলে দৌড়। এই ছিল গত ঈদুল ফিতরের দিনের চিত্র। ঈদের দিনে দাদুবাড়ি কিংবা নানুবাড়িতে এই আনন্দটাই ছিল ঈদের দিন সর্বোত্তম উপায়ে কাটানোর মূলমন্ত্র । আমার মত কখনো কেউ হয়ত ভাবেনি এবারের ঈদের নামাজ স্বল্প পরিসরে পড়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে ঘুমে মগ্ন থাকতে হবে।

তাই-ই হলো এবার। এই ঈদে অপ্রাপ্তি তো অনেক। তবে প্রাপ্তির খাতায় যা থাকার মত তা হলো সকল আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগ। চাহিদাবঞ্চিত লোকদের মাঝে নিজের সেলামি বিলিয়ে দেয়া আর ঈদের উন্মাদনায় নিজেকে না হারিয়ে রমজানের শিক্ষা যথাযথভাবে উপলব্ধিকরণ। এমন ভিন্নধর্মী ঈদের শিক্ষা টুকু যেন পরের ঈদে কাজে লাগানো যায়, সুস্থ থেকে আর এভাবে যেন কোন ঈদ আমাদের কাটাতে না হয় যেখানে ঈদের ধর্মীয় বা সামাজিক দুই গুরুত্বই কমে যায়। এই আশাবাদই রাখা যায় এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী ঈদ কাটানোর পর।

রাহনুমা তাবাসসুম তাকওয়া। এনিম্যাল সাইন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। তিনি জানালেন, প্রতিবার গ্রামের বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটালেও এবার সেটা সম্ভব ছিল না। দুপুরের পর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া কিংবা ঈদের কেনাকাটা না করলেও ঈদটা বেশ উপভোগ করেছি । ঘরেই ঈদ উদযাপন করতে হবে ভেবে এমন কোনো প্ল্যান চাচ্ছিলাম যেখানে বাবা মা দুজনেই অংশ নেবেন। তো সেটা ভেবেই বাসার সবাইকে নিয়ে সন্ধ্যায় কবিতা পাঠের আসর বসিয়েছিলাম। বাবা মা দুজনেরই পছন্দ হলো পুরনো বাঙালী কবিদের কবিতা। তাই ছেলে মেয়েদের সামনে নিজেদের প্রিয় কবিতা আবৃতি করে যে খুশি হয়েছিলেন তা বলাই বাহুল্য। আসরটা শেষ হলো মায়ের গলায় একটা নাত-ই-রাসূল দিয়ে।
আয়োজনটা সাদামাটা হলেও আনন্দের কোন কমতি ছিল না। কারণ পরিবারকে কাছে পেলে ঈদ আনন্দে কোয়ারেন্টাইন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না।

রেদওয়ান কবির অনিক। ক্রিমিনোলোজি বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনিক ক্যাম্পাসলাইভকে বললেন। করোনার করাল গ্রাসে স্তম্ভিত বিশ্বে বাস্তবিকই খুব অসহায়ভাবে ঘরবন্দী জীবন যাপন করছি আমরা। সমগ্র মানবজাতি ধ্বসে পড়ছে। শিল্পোন্নত শক্তিশালী দেশের অর্থনীতি বলাই বাহুল্য যে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের নাজুক অর্থনীতির দেশের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল অনেকটা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর এটা বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদ মানেই আনন্দ। সে ঈদ এই করোনাময় বিশ্বে বিরাজ করেনি বলেই আমার ধারণা।

দেশের অন্যান্য এলাকার মতো আমার গ্রামের বাড়ি উপকূলীয় জনপদ বরগুনায়। নিম্ন আয়ের কর্মহীন মানুষ এই লকডাউনে অসহায় হয়ে পড়ছে। আমাদের স্কুলের কয়েকটি প্রাক্তন ব্যাচের সহায়তায় প্রায় দেড়শো পরিবারকে প্রথমে ইফতার সামগ্রী ও পরে ঈদ সামগ্রী দিয়ে ঈদের হাসি ফুটানোর চেষ্টা করেছি। নিজেও অনুভব করেছি অতৃপ্ত সুখ। ঈদের দিনে আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য আশ্রয় নিতে হয়েছে অডিও বা ভিডিও কলের। আমরা সবাই সচেতন থাকি, সুস্থ থাকি আবারও সুদিন কাছে আসবে ইনশা আল্লাহ। সুস্থ পৃথিবীতে আমরা সবকিছু একসাথে ভালোবাসবো।

নাফিসা সাদাফ। শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। নাফিসা খোলামেলা ভাবে কথা বলেছেন ক্যাম্পাসলাইভের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ঈদের প্রথম দিন স্বজনের সাথে বছরের অন্যতম গেট টুগেদার আর পরের দিন ষোলশহরের ধোয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে আড্ডায় মশগুলো হওয়াই ছিলো গত কিছু ঈদের চিত্র। সেই মানুষগুলোকে এবার ৮ ইঞ্চি স্ক্রিনে দেখেই মন খারাপের ঈদ কাটলো। ঈদের পোষাকের বহর, খাওয়াদাওয়ার হুল্লোড় বিহীন এবার অদ্ভুত ঈদ কাটলো পরিবারের সাথে টিভিতে ঈদ অনুষ্ঠান দেখে। ব্যস্ততা না থাকায় সোস্যাল মিডিয়াতে অনেক সময় কাটানো হয়েছে। সন্ধ্যার পর অনলাইনে ঈদ প্রদর্শনী বিতর্ক আর ভিডিও কলে আড্ডা এভাবে ভার্চুয়াল ঈদ গেলো। তবে রাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ প্রার্থনায় এবারের মত ঈদ আর না আসার দোয়ায় এবং সবার সুস্থ কামনায় শেষ হলো ঈদের দিনের।

আহমেদ কারীম মাহমুদ। শিক্ষা বিভাগ। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। মাহমুদ মনখুলে কথা বলতে পছন্দ করেন। তিনি বলেন, এইবারের ঈদ লকডাউনের হযবরল দিনের মতোই শুরু হয়েছিলো। ঈদের দিন আমার কোয়ারেন্টাইনের কততম দিন ছিলো হিসেব নেই। সকালে উঠে ফজর নামাজ আদায় করলাম। গোসল সেরে পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ঈদের নামাজ আদায় করতে উপজেলা মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষে কারো সাথে ঈদের কোলাকুলি'টা করতে পারিনি এবার। সবাই কেমন একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে ছিলো 'হা' করে ৷ কেউই কোলাকুলি করার সাহস পাচ্ছিলো না। মুখে ঈদ মোবারক বলে সর্বোচ্চ হ্যান্ডশেকের নামে আলতোভাবে হাত ছুঁইয়ে দিচ্ছিলো।

বাসায় এসে আব্বু, ভাইয়া এবং ছোটভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করলাম। মনে হচ্ছিলো, কোয়ারেন্টাইনে থাকলে করোনা থেকে বাঁচতে পারলেও, দমবন্ধ হয়ে মারা যাবো নিশ্চিত। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হলাম। হাসপাতাল গেইটে আড্ডার প্লেসে সবাই হাজির। ইচ্ছেমতো কোলাকুলি করলাম সবার সাথে। তারপর সবাই মিলে বাহার মিয়ার টংয়ে সেই পুরনো জম্পেশ আড্ডা। 'করোনা' নামে একটা ভাইরাস রোগ যে এবারের ঈদ'কে বিবর্ণ করে দিয়েছে, তা একটিবারের জন্যও মনে হয়নি। বাসায় ফিরলাম রাত সাড়ে ১১টার দিকে । সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে বাল্যবন্ধু'দের সাথে ঈদের রাতের সেই আড্ডা'টা বেহিসেবী কোয়ারেন্টাইন ডে-গুলোর সব খারাপ-লাগা, বিষিয়ে ওঠা মনের ভ্যাকসিন স্বরূপ ছিলো।

ঢাকা, ২৮ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

প্রধান সম্পাদক: আজহার মাহমুদ
যোগাযোগ: হাসেম ম্যানসন, লেভেল-১; ৪৮, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, তেজগাঁ, ঢাকা-১২১৫
মোবাইল: ০১৬৮২-৫৬১০২৮; ০১৬১১-০২৯৯৩৩
ইমেইল:[email protected]