সিনিয়র নেতাদের পাত্তাই দিতেন না যিনি...দুই প্রজন্মের দুই নেতার টেলি সন্ত্রাস, টেলি হুমকি!


Published: 2019-09-29 21:17:14 BdST, Updated: 2019-10-21 17:13:37 BdST

লাইভ প্রতিবেদকঃ হালে আলোচিত। সমালোচিত। পিতার দেখানো পথেই হাটছেন পুত্র। তার চলা ফেরা ও আচার অনুষ্ঠান রাজকীয়। দেশ বিদেশে রয়েছে তার ব্যাপক চলাচল।
তিনি মন্ত্রী-এমপি ও শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে অনেকেরই সঙ্গে ফটোসেশন করেন। পরে ওই ছবি ব্যবহার করেই তিনি সমাজের উচু তলা থেকে সাধারণ মানুয়ের সঙ্গে আলোচনা করতেন বলে সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন। তিনি হলেন জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। তিনি এখন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে আছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে।

ভাইরাল হওয়া জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের একটি ভিডিও চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার ফেসবুকে ‘চ.সি.ক নির্বাচন-২০২০-প্রিয়নেতা আ.জ.ম নাছিরউদ্দীন ভাইয়ের ভক্ত নামের একটি গ্রুপে মো. মনিরুল রহমান মনি ও সাচ্চু চৌধুরী নামের দুটি আইডি থেকে এই ভিডিওটি শেয়ার হতে দেখা যায়।

ছবি: মন্ত্রি ওবাইদুল কাদের এর সাথে শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন

 

ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সামরিক মহড়ার মতোই হুইপ পুত্র শারুন একে-৪৭ রাইফেল সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ করছেন। এ বিষয়ে নাজমুল করিম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিও রাশিয়া বিশ্বকাপে শুটিং রেঞ্জে স্পটশট। আমি গত বছর বিশ্বকাপ শেষে রাশিয়াতে একটি শুটিং রেঞ্জে একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে শুটিং করি। আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ হিসেবে একটি মহল এই ভিডিওটি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণ পর রাত ৮টার দিকে হুইপ পুত্র ফেসবুকে তার ভিডিওটির লিংক শেয়ার করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা জাতির বিবেক, দয়া করে কোনো কুচক্রীমহলের ষড়যন্ত্রে আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। বিজয় আমাদের হবেই ইনশাল্লাহ। মেঘ দিয়ে সূর্যকে বেশিক্ষণ ঢেকে রাখা যায় না। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চেপে রাখা যায় না তার শেয়ার করা লিংকে দেখা যায়, ভিডিওটি তিনি গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথমে শেয়ার করেছিলেন।

এদিকে জুয়া, ক্যাসিনো বন্ধে দেশব্যাপী চলমান অভিযান সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের পিতা আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক চৌধুরী। তিনি ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও ক্লাবে তাস খেলার পক্ষে মত দেন। কিন্তু তিনি আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসর বসিয়ে দিনে ছয় লাখ টাকা আয় করেন বলে ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম দাবি করার পর এ নিয়ে দ্বন্দ্ব আরো ঘনীভূত হয়।

এর পাশাপাশি জুয়ার আসর থেকে হুইপের বিশাল অঙ্কের আয় নিয়ে ফেসবুকে এক পুলিশ কর্মকর্তার দেওয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে পানি আরো এক দফা ঘোলা হয়। আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসর থেকে গত পাঁচ বছরে হুইপের ১৮০ কোটি টাকা আয় হয়েছে বলে নিজের ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দেন ওই পুলিশ পরিদর্শক। ওই স্ট্যাটাসের পর পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে আবাহনী ক্লাবে জুয়ায় হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এবং হুইপের ছেলের সঙ্গে দিদারুল আলমের টেলিফোনের কথোপকথনের অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়েছে বলে জানা গেছে।

দ্বন্দ্ব তৈরির পেছনে তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে দায়ী করেছেন হুইপের ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী (শারুন)। এই তিন নেতা হলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এবং নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী। এর আগে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরীকে টেলিফোনে হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন হুইপপুত্র নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন।

ছবি: হুইপ এর ছেলে শারুন

 

এ ঘটনায় শারুনের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকিসহ কুরুচিপূর্ণ কথা বলার অভিযোগ এনে গত ১৯ সেপ্টেম্বর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন দিদারুল আলম চৌধুরী।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন (দিদারুল আলম) চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব।

২০০৭ সালে তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রাখা হয়। সে হিসেবে প্রিমিয়ার ব্যাংক জিইসি মোড় শাখায় ‘চট্টগ্রাম আবাহনী ফুটবল কমিটি’ নামে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়। হিসাবের স্বাক্ষরকারী হিসেবে সব ধরনের লেনদেনে ক্লাবের মহাসচিব শামসুল হক চৌধুরী, ম্যানেজার সাইফুদ্দিনের পাশাপাশি দিদারুল আলমের স্বাক্ষর নেওয়ার কথা।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তাকে অন্ধকারে রেখে ওই হিসাব থেকে টাকা-পয়সা লেনদেন করা হচ্ছিল। সে জন্য দিদারুল এ মাসে অ্যাকাউন্ট বন্ধের আবেদন করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখে। এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে শামসুল হকের ছেলে নাজমুল করিম শারুন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে দিদারুলের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন।

কথা বলার একপর্যায়ে বন্ধ হওয়া ব্যাংক হিসাব খুলে দিতে তিনি চাপ দিতে থাকেন। তার দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে প্রবীণ এ ক্রীড়া সংগঠককে হুমকি-ধমকিসহ গালি দেন শারুন।

কী ছিল দিদারুল ও শারুনের কথোপকথনে?

দিদারুল আলম ও শারুনের টেলি সন্ত্রাস:

শারুন : আর আঙ্কেল আপনি ঐ চিঠিটা উইথড্র করে ফেলবেন। ওটা দরকার নাই।

দিদারুল : ঐটা... ঐটা ক্লাবের বিষয়। ওটা আমি তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব। ওকে।

শারুন : ঐগুলা...ঐগুলা দরকার আছে শুধু শুধু?

দিদারুল : আশ্চর্য কথা এনা। আমার যে...

শারুন : ঐটা দিয়ে কিছু হবে যে না। এটা আপনার প্রতি আমাদের...

দিদারুল : না হইলে মনে করো আমার একটা আপত্তি থাকলে ভবিষ্যতে ...

শারুন : ঠিক আছে আপনার আপত্তি আপনি রাখেন। আমরা এইরকম কতো আপত্তি দিতে পারি না বিভিন্ন জায়গায়...

দিদারুল : ঠিক আছে। তুমি রবিবারে আস।

শারুন : আপত্তি কি এখানে আপনি একা দিতে পারেন নাকি? আপত্তি তো আমরাও দিতে পারি।

দিদারুল : ক্লাবের ব্যাপারে তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব।

শারুন : ক্লাবের ব্যাপারে কিসের কথা? ক্লাবের ব্যাপারে যা কথা হওয়ার হইছে আর কথা বলার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখাইছেন তো, এখন আমাদেরটা আমরা দেখাব।

দিদারুল : ক্ষমতা-টমতা কিচ্ছু না।

শারুন : দেখাইছেন তো। আপনি ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না?

দিদারুল : আমাদের সেইফের জন্য করতে হবে না?

শারুন : আমরা যদি ক্ষমতা দেখাই আপনি এক শতাংশও টিকতে পারবেন?

দিদারুল : না না, আমি ১০০ শতাংশ টিকতে পারব। আমি হইলাম শেখ মুজিবের আদর্শিক সন্তান।

শারুন : এগুলা... এগুলা আঙ্কেল... এইসব, এইসব, এইসব গালগোল অন্য জায়গায় কইরেন। আমার সঙ্গে কইরেন না। আমি সম্মান দিছি সম্মান নিয়ে থাইকেন।

দিদারুল : শোন আমি সাগরেদ নই। তোমার আব্বা তো জাতীয় পার্টি করে, এখন আওয়ামী লীগে আইসা...

শারুন : এগুলা শেখ হাসিনা বুঝবে। আপনার বোঝার দরকার নাই। রাখেন মিয়া ফালতু।

দিদারুল : আমরা তো শাহজাদা, সাগরেদ না।

শারুন : আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?

দিদারুল : আমি তোমাকে এজন্যই ফোন দিই নাই। তুমি এক কাজ করো রবিবারে আইসা...

শারুন : রাস্তাঘাটে যখন প্যান্ট শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন। বেয়াদবি তো এখনো দেখেন নাই। সম্মান করে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?

দিদারুল : অ্যাঁ অ্যাঁ? তুমি রাস্তাঘাটে!!!

শারুন : আপনি উলটাপালটা কথা বলতেছেন কিসের জন্য?

দিদারুল : উলটাপালটা কী বললাম? আরে শোনো তোমার বাবা বিএনপি-যুবদলে এরপর জাতীয় পার্টি কইরা এখন—

শারুন : গালবাজি যেডে এডে গরিবি রাস্তাঘাটত চোয়ারাই গালর দাঁত বেয়াগ্গুন ফেলাই দিইয়ুম। বেয়াদব হডিয়ার! (গালবাজি যেখানে সেখানে করবি রাস্তাঘাটে চড় মেরে মুখের দাঁত সবগুলো ফেলে দেব। বেয়াদব কোথাকার!)

দিদারুল : এরপরে জাতীয় পার্টি গরি।

শারুন : এই মিয়া তোরে রাস্তাত ধরি পিডিব মাইনস্যে। বেয়াদব! তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? এই তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ? (এই মিয়া তোকে রাস্তায় ধরে পেটাবে মানুষ। বেয়াদব! তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? এই তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)

দিদারুল : আমি তো অর্জিনাল।

শারুন : তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? (তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)

দিদারুল : এই দেখ না তোমার বেসিক, যেটা সেটা তুমি উলটাপালটা, এটাই তো তোমাদের বেসিক।

শারুন : তুমি আমারে ফোন দিছ কেন? ফালতু কোথাকার। আমার বাপে যেটা করবে করুক না। আমার বাবা হুইপ। আর তুমি এসব গালবাজি করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেছো।

দিদারুল : রাস্তাঘাটে তুই প্যান্ট খুলিবিদে ব্যাডা! (রাস্তাঘাটে তুমি প্যান্ট খুলবে ব্যাটা!)

শারুন : আমি খুলব না। মানুষজনে খুলবে যে।

দ্বিতীয় পর্বে দেখুন সেই আলোচিত নাজমুল করিম শারণের অস্ত্র চালানোর কৌশল:

সমালোচনার মূল আলোচিত ব্যক্তি হলেন জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী। কেবল তিনি নন তার সোনার ছেলেও জড়িয়েছেন ওই সমালোচনার জটে। নানান বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীকে।

শামসুল হকের ছেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে অশ্লীল বাক্যবিনিময়ের অডিও ফাঁসের পর এবার ভাইরাল হলো ভারী অস্ত্র দিয়ে পুরোপুরি সামরিক কায়দায় হুইপপুত্র শারুনের গুলিবর্ষণের ভিডিও। আর তা নিয়ে চলছে নানান সমালোচনা।


শারুন, তার পিতা ও সাধারণ সম্পাদক

জানাগেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওটি হুইপ পরিবারকে নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে এ নিয়ে। অনেকে আবার এর মাঝে দেখছেন ষড়যন্ত্র। Alizeh Murtaza : News (আলিজেহ মুরতাজা নিউজ) নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, পুরোপুরি সামরিক কায়দায় ৪৭ রাইফেল সাদৃশ্য আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি বর্ষণ করছেন হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। তখন তাকে ঘিরে ছিল তার দলবল।

সংশ্লিস্টরা জানান, গত ১৪ ঘণ্টায় ভিডিওটি দেখা হয়েছে সাত হাজার ৯০০ বার। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলের একজন সদস্য ও হুইপপুত্রকে ঠান্ডা মাথায় এমন ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখে এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এর আগে নগরের আবহানী ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান নিয়ে মুখ খুলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন হুইপ শামসুল হক চৌধুরী।

পরে একই ইস্যুতে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীকে টেলিফোনে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে অপমানের অডিও ক্লিপও ঝড় তোলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শারুনের ওই ভিডিও-কে পুঁজি করে সরকারের সমালোচনায় মেতে উঠেছে একটি পক্ষ।

তারা প্রশ্ন তুলছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হুইপ শামসুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছে। পরিকল্পিতভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।’ ভিডিওটির বিষয়ে বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের একটি শ্যুটিং ক্লাবে অনুশীলনের সময় এ ভিডিওটি ধারণ করা হয়।

ছবি: একে-৪৭ হাতে শারুন

 

একে-৪৭ হাতে শারুন

‘হুইপ শামসুল হক চৌধুরী ক্লাবে জুয়ার আসর থেকে ১৮০ কোটি টাকা আয় করেন’-এমন অভিযোগ এনে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহমুদ সাইফুল আমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করা হয়।

গত বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আস-শামস জগলুল হোসেনের আদালতে মামলাটি করেন হুইপ শামসুল হক চৌধুরী। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমকে তদন্ত করে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন।

আওয়ামী লীগের হুইপ শামসুল হকের ছেলে শারুন ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রবীণ নেতা দিদারুল আলমের টেলিফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে দেশজুড়ে ঝড় ওঠে। হুইপের ছেলে শারুন দিদারুল আলম চৌধুরীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও রাস্তায় নগ্ন করে পেটানোর হুমকি দেন।

হুইপকে নিয়ে যা বললেন দিদারুল আলম চৌধুরী

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রবীণ এ নেতা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, পটিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী একসময় ডবলমুরিং থানা যুবদলের সেক্রেটারি ছিলেন। পরে জাতীয় পার্টির রাজনীতিও করেছেন। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে আসেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।

এ সময় উপস্থিত অন্যদের ধরে নির্বাচনী প্রচারণার মাইক হাতে নেন শামসুল হক চৌধুরী। জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে লাগামহীনভাবে গালাগালি করায় সেদিন জিয়াউর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন শামসুল হক। সেদিন তার ‘বিচ্ছু শামসু’ নামটি দেন জিয়াউর রহমান। দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, জিয়ার প্রডাক্টের কাছে কখনও বঙ্গবন্ধু কিংবা তার মেয়ের জন্য ভালোবাসা থাকবে না। থাকবে শুধু বাইরের একটা রূপ ব্যবহার করে উনার থেকে কিছু হাতিয়ে নেয়া। প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে বিএনপি-জাতীয় পার্টি। মুখে মুখে তিনি আওয়ামী লীগ।

আর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক আরও বলেন, ডবলমুরিং থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় তিনটি টাইপ মেশিন চুরি করে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন শামসুল হক চৌধুরী। ওই ঘটনায় ১৭ দিন হাজতবাসও করেন। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নিউ মার্কেট মোড়ে আওয়ামী লীগের মিটিং পণ্ড করার জন্য বোমা হামলা চালান দলবল নিয়ে।

তখন আমাদের মোশাররফ ভাই আহত হন। বোমা হামলার পর আমাদের নেতা ইসহাক মিয়া মাইকে বলেছিলেন, “কে তুমি হামলাকারী? আমি তোমাকে ভালো করে চিনেছি। তোমার নামের প্রথম অক্ষর ‘শ’।” দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, ৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে শামসুল হক আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাচ্ছেন বিধায় স্টেডিয়ামে গরু জবাই করেন।


হুইপ পুত্র শারুন:
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাই আর আমি বহু চেষ্টা করে তাকে যোগ দিতে দেইনি। এর সাক্ষী আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন প্রটোকল অফিসার। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আওয়ামী লীগের ৫০ বছর পূর্তিতে তার যোগদানের চেষ্টা আমরা রুখে দেই। পরে ঢাকার কিছু নীতিভ্রষ্ট ক্রীড়া সংগঠক টাকার বিনিময়ে তাকে আওয়ামী লীগে যোগদানের সুযোগ দেন।

সৈয়দ সেলিম নবীর (বর্তমানে ভারতে বসবাসকারী) কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে শেখ রাসেল ক্রীড়া সংসদে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ পান শামসুল হক। সেদিনও সেলিম নবী ইন্ডিয়া থেকে আমাকে ফোন করে বলল, তার টাকাটা আজ পর্যন্ত শামসুল হক দেননি। তাকে বলা হয়েছিল পরিচালক করা হবে।

কদিন আগে পরিচালক পদ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে সেলিম নবীর নাম নেই। তিনি এমপি বা হুইপ যদি না হতেন তাহলে একবাক্যে বলতাম, তার মতো একজন প্রতারক বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের প্রবীণ এ নেতা আরও বলেন, এরপর শামসুল হক আবাহনীর সাইনবোর্ড ধারণ করলেন। আবাহনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটা দুর্বলতা আছে, যেহেতু সংগঠনটি তার প্রিয় ভাই শেখ কামালের হাতে গড়া।

শামসুল হক চৌধুরী চেয়েছিলেন আবাহনীকে হাতিয়ার করে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। এই আবাহনীকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগান, ষোল আনা উশুল করে নিলেন।
দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় নেত্রী, আমার বড়বোনকে অনুরোধ করব- দলে যারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শ বিশ্বাস করে না তাদের ছাঁটাই করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শিক সন্তান, সে পেটে পাথর বেঁধে উপোস থাকবে, কিন্তু চুরি করতে যাবে না।

ট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরীকে প্রাণনাশের হুমকিসহ কুরুচিপূর্ণ কথা বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন পটিয়ার সাংসদ ও হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। এ ঘটনায় নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা চেয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি আবেদনও করেছেন এ ক্রীড়া সংগঠক দিদারুল আলম চৌধুরী।

ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।