সমস্যা ও সম্ভাবনায় নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস


Published: 2020-09-21 16:55:47 BdST, Updated: 2020-10-20 12:11:32 BdST

সারা পৃথিবীজুড়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। চলতি বছরের ৬ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার বাড়তে থাকায় ১৭ই মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা এবং দেশজুড়ে লকডাউন জারি করা হয়।

দিনদিন করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বিঘ্নিত ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকারের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মাঝেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) এ শুরু হয় অনলাইন ক্লাস। অনলাইন ক্লাস কার্যক্রমকে কিভাবে দেখছে জাককানইবি'র শিক্ষার্থীরা বিস্তারিত জানাচ্ছেন ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকমের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জিহাদুজ্জামান জিসান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাবের সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ম ব্যাচের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী হায়দার আলী খান রনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, "পৃথিবীজুড়ে মন্থর গতিতে চলছে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। যতো সময় অতিবাহিত হচ্ছে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সংক্রমণ কমাতে শিক্ষার্থীদের বর্তমানে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হচ্ছে। ক্লাস হচ্ছেনা, ফলে পড়ালেখাতে আলস্য চলে এসেছে।

এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সেশনজট কাটাতে এবং কোর্স সমাপ্তির লক্ষ্যে অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রতিটি বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অসংখ্য শিক্ষার্থী গ্রামে অবস্থান করায় এবং নেটওয়ার্ক এর ধীরগতির কারণে অনলাইন ক্লাসে অনীহা প্রকাশ করছে।

হায়দার আলী খান রনি

 

আবার নেটওয়ার্ক ঠিক থাকলেও পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে স্মার্টফোনের অভাবে সেইসাথে মেগাবাইট কিনে ক্লাস করতেও আগ্রহ প্রকাশ করছেনা অনেক শিক্ষার্থী। যদিওবা প্রশাসন স্বল্পমূল্যে মেগাবাইট এবং মোবাইল ফোন কিনতে সফট লোনের মাধ্যমে এ ধরণের অসুবিধা লাঘবের চেষ্টায় আছে।

ডিজিটালাইড এই যুগে শিক্ষার্থীদেরকে অনলাইনমুখী করার লক্ষ্যে প্রশাসনের এরকম উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা অনেকাংশেই উপকৃত হবে বলে আমি আশাবাদী।"

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ তম ব্যাচের ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী থেংআ শ্রাবন্তী রেমা ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, "১৬ মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর, আমি ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় আমার বাসায় ফিরে যাই। ১ সপ্তাহ পর আমার দাদী স্ট্রোক করায় সপরিবারে গ্রামের বাসায় যেতে হয়। তার ঠিক দুদিন পর সারাদেশে লকডাউন জারি করা হয়। এরপর বারবার লকডাউন সময় বাড়ানো এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায়, ঢাকায় ফেরা সম্ভব হচ্ছিলো না। এভাবে প্রায় ৪ মাস কেটে যায়।

এ অবস্থায় জুন মাসে ডিপার্টমেন্ট থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং ক্লাসও শুরু হয়ে যায়। দাদুবাড়ি প্রত্যন্ত বর্ডার এলাকায় যেখানে সাধারণ ফোন করার জন্যই ভালো নেটওয়ার্ক থাকেনা। জুম অ্যাপ ডাউনলোড করে ক্লাস করার মতো পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক সেখানে ছিলো না। যার ফলে ১ মাসেরও বেশি সময় আমি কোনোভাবেই অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারি নি।

থেংআ শ্রাবন্তী রেমা

 

আগস্টের শুরুতে ঢাকায় ফিরে আসি। এখানে আসার পর নিয়মিত ক্লাস করছি। কিন্তু এখানেও আমাকে নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মাঝেমাঝে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে ঠিকমতো স্যার-ম্যাডামের কথা শোনা যায় না, কারেন্ট না থাকলে ক্লাস করা যায় না। এছাড়াও বাসায় আমি আর আমার বোন দুজনে অনলাইনে ক্লাস করি। বাসায় একটিমাত্র স্মার্টফোন থাকায়, দুজনের একইসময় ক্লাস থাকলে একজনকে সময়ের আগেই ক্লাস থেকে বের হয়ে অন্যজনকে সুযোগ করে দিতে হয়।"

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তম ব্যাচের লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ খান ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, "করোনা মহামারির কারণে ছাত্র-শিক্ষক সবাই ভীষণ উদ্বিগ্ন, কখন ফিরবে শ্রেণিকক্ষে এই বলে। দীর্ঘ এই ছুটিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, ঠিক তখনি সরকার অনলাইন ক্লাসের উপর জোর দিলেন।

জাককানইবির সকল বিভাগে এখন অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। শুরুতে নানান প্রতিবন্ধকতা ছিলো, নতুন একটি ব্যবস্থায় ছাত্র-শিক্ষক বুঝবে কিনা, স্মার্ট ফোনের অপ্রতুলতা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের দুর্বল গতি। সমস্যাগুলো মাথায় নিয়েই অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত। সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই সমস্যাগুলো কিছুটা সমাধান করায় স্বাভাবিক সময়ের মত অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা।"

রাশেদ খান

 

তিনি আরো বলেন, "উন্নত বিশ্বে যখন প্রযুক্তি নির্ভর পড়াশুনার গল্প শুনতাম তখন অনেক হিংসে হত। অনেক শিক্ষাবিদ শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে দীর্ঘদিন লিখে যাচ্ছেন। হতেপারে করোনাকালীন আপদ থেকেই আমাদের ভালো কিছুর সূচনা হলো। আমরা আগামী দশকে প্রযুক্তি নির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে যাবো। বিদ্যমান প্রযুক্তির দুর্বলতা এবং অপ্রতুলতা আমরা কাটিয়ে উঠবো কারণ প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয়ে চাহিদা বাড়বে, বাজার সম্প্রসারণ হবে।

ধরণী তার রূপ প্রতিনিহিত পরিবর্তন করছে, কঠোর হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। করোনা দীর্ঘায়িত হতে পারে অথবা আমাদের এমন কোন মহামারি আবারও খাঁচাবন্দি করতে পারে! তাই সমস্যা সামনে আসলে তার সমাধানের পথে হাঁটাই শ্রেয়, অন্যথায় সঙ্কট বহুমাত্রিক রূপ নিবে।

লম্বা ছুটিতে শিক্ষার্থীরা হাঁপিয়ে উঠেছে, বিশেষজ্ঞরা তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিরূপ প্রভাব লক্ষ্য করেছেন। ঠিক তখনি অনলাইন ক্লাস খানিকটা মানসিকভাবে চাঙ্গা করছে শিক্ষার্থীদের। নজরুলের শিক্ষার্থীরা এখন ডিজিটাল ক্লাস রুমে!"

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তম ব্যাচের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুল্লাহ আল মারুফ ক্যাম্পাসলাইভকে জানিয়েছেন, "করোনা মহামারীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন ক্লাস শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা ও পথ উন্মোচন করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে যে ক্ষতিটা হয়েছে তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে অনলাইনে ক্লাসে। যদিও অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ খুব একটা আশানুরূপ সাড়া ফেলেনি।

হাবিবুল্লাহ আল মারুফ

 

অনেক শিক্ষার্থীর নেই ডিভাইস ও প্রয়োজনীয় ডাটা। অধিকাংশ বিভাগেই অনলাইনে ক্লাস খুব একটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে না। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করলে হয়তো অনলাইন ক্লাস কিছুটা ফলপ্রসূ হতে পারে।"

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ তম ব্যাচের লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদ অর্ক বলেন, "অনলাইন ক্লাস একটি সময়োপযোগী দাবী। বর্তমানে এই করোনা মহামারীর সময়ে মার্চ মাস থেকে বন্ধ রয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার কারণে আমরা যে একটি জটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছি সেটা বলা বাহুল্য। জট কিছুটা নিরসনের একটি উপায় ছিলো অনলাইন ক্লাস।

ফাহমিদ অর্ক

 

তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে অতীতে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় পুরো ব্যবস্থাটিই হুমকির মুখে। যেমন এখন পর্যন্ত আমি অনলাইন এ ক্লাস করতে পেরেছি মাত্র ২ টি। অনেকে তাও করেনি।

সুতরাং আমার কাছে মনে হয়, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য আমরা এখনো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ নই।"

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন পিস ক্যাফের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ তম ব্যাচের ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইজাহ্ ওমর তূর্ণা ক্যাম্পাসলাইভকে জানিয়েছেন, "অনলাইন ক্লাস আমাদের সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনসমূহ অনলাইনেই এখন তাদের সকল কার্যক্রম, ক্যাম্পেইন এবং ইভেন্টগুলো পরিচালনা করছে।

লকডাউনের পর আমরা যখন ক্লাস শুরু করি, তখন ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ক্লাসগুলো নেওয়া হতো। কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যা, স্মার্টফোনের অভাব, মেগাবাইট সুবিধা না থাকায় অনেককেই ক্লাসে পাওয়া যায় না।

ফাইজাহ্ ওমর তূর্ণা

 

সম্প্রতি মোবাইল লোনের জন্য তালিকা নেওয়া হলো কিন্তু আদৌ সেটি বাস্তবায়ন হবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। আবার টেলিটকের নেটওয়ার্ক সব এলাকায় ভালো না থাকায়, শিক্ষার্থীরা মেগাবাইট সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

যেহেতু করোনার প্রকোপ বেড়েই চলছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি মেগাবাইটসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে।"

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।