১৫ বছরেও পিতৃ পরিচয় না পাওয়ায় শিক্ষার্থীর আর্তনাদ!


Published: 2020-05-16 19:58:32 BdST, Updated: 2020-09-21 08:01:02 BdST

সবুজ মিয়া, কালীগঞ্জ লাইভঃ বাবা আমাকে দেখেও অন্য দিকে ফিরে থাকে। কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যায়। সবাই বাবার আদর পায়, আমি বাবার কোন আদর পাইনা। সবাই বাবাকে বাবা বলে ডাকে, কিন্তু আমি বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারছি না। আমার কি অপরাধ? এই বলে বুক ফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পরেন শিমলা আক্তার (১৫) নামে মাদ্রাসায় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী। 

সে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিনের ব্রাহ্মনগাঁও গ্রামের শেখ আজিজুর রহমান সুমনের কন্যা। ১৫ বছর বয়সেও নিজের বাবার কাছ থেকে সন্তানের স্বীকৃতি পায়নি এ কিশোরী।

তাই সম্প্রতি কালীগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মনগাঁও শহীদ ময়েজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার এ কান্নায় উপস্থিত প্রায় শতাধীক মানুষের চোখ অশ্রুশিক্ত হলো। সবাই নিরবেই চোখ মুছে নিলেন। কিন্তু কেউই শিমলাকে শান্তনা দিতে এগিয়ে আসলেন না।

কারণ গত ১৫ বছর স্থানীয়রা শিমলার বাবা ও তার পরিবারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও শিমলাকে তার বাবার পরিচয় বা আদর ফিরিয়ে দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে কেউ এগিয়ে গেলে তার বাবার সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক লাঞ্চিত হতে হয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের নানা বিপদে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্ঠা করেছে। তাই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এখন আর কেউ শিমলাকে শান্তনা দিতে এগিয়ে আসেনা। কারণ এলাকাবাসী জানে শিমলার পিতৃ পরিচয় তারা ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

স্থানীয়রা জানায়, ২০০৪ সালে উপজেলার ব্রাহ্মনগাঁও গ্রামের শেখ মোহাম্মদ আলীর ছেলে শেখ আজিজুর রহমান সুমন একই গ্রামের ছবির মোল্লার মেয়ে সাথীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর সেই সূত্রে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়। কয়েকদিন পর সাথী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি টের পেয়ে সুমন কেটে পড়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু এলাকাবাসীর কারণে তা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. আতাউর রহমান ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানের সালিশের মাধ্যমে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। সাথীকে বাড়ী নিয়ে যায় সুমন ও তার পরিবার।

বিয়ের ৩ মাসের মধ্যেই ২০০৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মাসে স্থানীয় একটি হাসপাতালে জন্ম হয় আজকের এই শিমলার। ওই সময় সুমন হাসপাতালে তার স্ত্রী ও নবজাতককে রেখে পালিয়ে যায়। কিন্তু সাথীর দরিদ্র পরিবারের পক্ষে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করা সম্ভব না হওয়ায় থানার ওসি তা পরিশোধ করেন এবং নগদ কিছু অর্থ ও শিশু খাদ্য দিয়ে বাড়ীতে পাঠান। এরপর থেকে একটি দিনের জন্যও সুমন তার স্ত্রী-কন্যার খোঁজখবর নেয়নি।

শিমলার নানা ছবির মোল্লা ও নানী সালেহা বেগম জানান, ওই সময় অসুস্থ্য মেয়ে ও নবজাতককে নিয়ে তাদের বাড়ীতে ফেরার পরও সুমন তার বাড়ী না নেওয়ার কারণে স্থানীয় কিছু মানুষ নানা ধরণের কথা বলাবলি করছিল। সেই সাথে সুমন গংরা নানাভাবে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছিল।

অশেষে লজ্জা ও ভয়ে তারা বাড়ী ছাড়া হয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর গাজীপুরের টঙ্গীতে ছিলেন বলে জানান শিমলার নানা ছবির মোল্লা ও নানী সালেহা বেগম। পরিবারের খরচ ও বাড়ী ভাড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিধায় ১ বছর আগে শিমলাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ী ফিরে আসেন তারা। কিন্তু পূনরায় শুরু হয়েছে সুমন গংদের হুমকি-দামকি।

শিমলার নানা-নানী আরও জানায়, স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় শিমলাকে লেখাপড়া কারাচ্ছেন তারা। সেখান থেকে এবার জেডিসি পরীক্ষা দিবে। ইতিমধ্যে শিমলার মা সাথীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু শিমলার কি হবে? তারও তো ভবিষ্যৎ আছে? তারা তাকে নিয়ে কোথায় যাবো? তারা চায় সুমন তার মেয়েকে পরিচয় দিয়ে ফিরিয়ে নিক।

এ ব্যাপারে কথা হয় শিমলার বাবা শেখ আজিজুর রহমান সুমনের সাথে। তিনি বলেন, তাকে পিতৃ পরিচয় দেইনি কে বলেছে? জন্ম নিবন্ধনে তো পিতা হিসেবে আমার নামই লিখছে। শুধু জন্ম নিবন্ধনে বাবার নাম লিখলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নে তিনি উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যান।

তৎকালীন ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমান আকন্দ ফারুক জানান, ওই সময় স্থানীয় একটি স্কুল মাঠে গ্রাম্য সালিশে তৎকালীন ওসির ও স্থানীয় প্রায় হাজার খানেক এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সুমন বিয়ে করে সাথীকে। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি করা সুমন দলের প্রভাব খাটিয়ে পরে তা অস্বীকার করে। বিষয়টি অমানবিক, মেয়েটি এখন খুব অসহায়।

ঢাকা, ১৬ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।