ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের 'অপরাধের দায়মুক্তি' ধারণা ধর্ষণ বৃদ্ধি করছে


Published: 2020-10-07 11:28:42 BdST, Updated: 2020-10-29 01:51:00 BdST

মিজানুর রহমান, ঢাবিঃ ‘কে আমার কী করতে পারবে, দেখি’— ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের এই ধারণা ও ‘ইম্পিউনিটি’ বা অপরাধের দায়মুক্তি, সুবিচারের অনুপস্থিতি, দুর্নীতি, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক শক্তির বশ্যতাকে বাংলাদেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই নয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৩২ টি।গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন নারী। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন নারী। আর আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এই লাগামহীন ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে উদ্ধেগের সৃষ্টি করেছে। নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গণমাধ্যমের দিকে থাকলে বুঝা যায় এই ধর্ষণ ও গণধর্ষণের অধিকাংশ ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা জড়িত। সিলেটের এমসি কলেজ কিংবা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গণধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায়ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা জড়িত। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিরাই কী ধর্ষণের দিকে বেশি ঝুঁকছে? ক্ষমতাকাঠামোর সাথে ধর্ষণ বৃদ্ধির সম্পর্ক কী? কিংবা ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ কী?

বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন ক্ষমতার রাজনীতির সংস্রব’কে। বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে লেগে থাকার বড় লাভ ‘ইম্পিউনিটি’ বা অপরাধের দায়মুক্তি। ফলাফল সুবিচারের অনুপস্থিতি, দুর্নীতি, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক শক্তির বশ্যতা ইত্যাদি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, "কে আমার কী করতে পারবে, দেখি’—সরকারে থাকা দলের কর্মীদের মধ্যে এই ভাবনা কাজ করে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত কর্মীরা কালচারাল ইম্পিউনিটি " অপরাদের দায়মুক্তি" থেকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তারা মনে করে দল তাদের আশ্রয় দিবে। ক্ষমতাসীন গডফাদাররাও তাদের ব্যবহার করে অনেক কিছু আদায় করে সেই হিসেবে তাদের অপকর্মগুলো গডফাদাররা আশ্রয় দেই। রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে অপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেই যেহেতু তাদের মধ্যে দেনা পাওনার সম্পর্ক।"

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল’র অধ্যাপক ও পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, "ক্ষমতাসীন দলের সাথে জড়িত থাকলে ধর্ষণ- নিপীড়ন করেও পার পেয়ে যাবে এমন একটা ধারণা দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে কাজ করে। এই ধারণা ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটানোর সহায়ক হিসেবে কাজ করে। আর এটা দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফল।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ সম্পর্কে ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, দেশে আইনের শাসন নেই। সামাজিক অবক্ষয়, নির্যাতন, ধর্ষণ সব কিছুর মূল কারণ হলো আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নাই। আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতা আছে। রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। ক্ষমতায় থাকা দলের কর্মীরা অপরাধ করেও রাজনৈতিক ভাবে প্রশ্রয় পায়। ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। যা পরবর্তী সময়ে অপরাধ সংঘটনের দ্বার উন্মুক্ত করে দেই।"

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘যদি আইনের শাসন বড্ড দুর্বল হয়ে যায় তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। দেশে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে গেছে। দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণ হলো প্রভাবের একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার আইনের শাসনকে কোনঠাসা করে ফেলেছে।’

ধর্ষণের প্রতিকার সম্পর্কে ড. সাদেকা হালিম বলেন, ধর্ষণ বন্ধে সরকারের কঠোরতম পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাতে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ পার পেয়ে না যায়। কিন্তু আমি বলবো না যে ক্রস ফায়ার দিতে হবে। আমরা প্রচলিত আইনের ওপর আস্থা রাখছি না বলেই ক্রস ফায়ার চাই। ক্রস ফায়ার কোন সমাধান না। সঠিকভাবে বিচার করতে হবে। সঠিক বিচারের ফলে অ্যাসিড নিক্ষেপের হার কমেছে।"

তিনি বলেন, "শিক্ষা কারিকুলামের পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মাদরাসায় শিক্ষকরা ছাত্রদের বলাৎকার করতেছে। আসলে সব জায়গায় কাজ করতে হবে।"

ড. সাদেকা হালিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্ষণের শুধু সামাজিক কারণ আছে সেটা না। যতই সাংবিধানিক স্বকৃতি দিই না কেন আসলে মেয়েদের কে আমরা মানুষই মনে করি না। নারীকে এখনো আমরা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারি নাই। নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের কোন মূল্য নাই।"

ড. নেহাল করিম ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের শাসন প্রতিষ্টা করার ওপর জোর দিতে বলেন। তিনি বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে।

ধর্ষণ বন্ধে সরকারী উদ্যোগে বেশ্যালয় চালু করা উচিত মনে করেন ড. নেহাল করিম। তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে কারণ আমাদের দেশে জৈবিক চাহিদা পূরণের সরকারি ব্যবস্থা নেই। প্রায় সব দেশেই বেশ্যালয় আছে। সৌদি আরবেও সরকারি বা বেসরকারি বেশ্যালয় আছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে এখানেও অনেক পতিতালয় ছিলো। এখানেও নাই এমন না। আনাচে কানাচে ছোটখাটো পতিতালায় আছে কিন্তু অনেকেই জানে না বা জানলেও যায় না। সরকারীভাবে বেশ্যালয় চালু করা হলে অনেকে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে। ফলে ধর্ষণ কমে যাবে। আর ধর্ম নিয়ে যারা কথা বলে, বেশ্যালয় তৈরিতে ধর্মের দোহাই দেই তারা সবাই বাটপার, চোর।"

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ এবং রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলাল মহিউদ্দীন ধর্ষণ বন্ধে ধর্ষকদের গায়ে রাজনীতির পোশাক পরতে না দেওয়া; ইম্পিউনিটি, ‘আমি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকব, ক্ষমতাবলয়ের সঙ্গে আমার সংযোগ আছে’ এ রকম ভাবার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া; ক্ষমতার রাজনীতিতে স্থান করে নেওয়া নারীদের রাজনীতির সুবিধাভোগী হয়ে এই দুই শ্রেণির দুষ্কর্মে নীরব না থেকে সজাগ থাকার প্রতি গুরুত্ব দিতে বলেন।

ঢাকা, ০৭ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআর//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।