ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভাবনা!সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইবি: ‌‌‍‍‍‌‌‌''পুলিশের অবাধ ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে হবে''


Published: 2020-08-21 14:03:25 BdST, Updated: 2020-09-25 05:39:17 BdST

মেজর (অব) সিনহা মোহাম্মাদ রাশেদ খান। একটি নাম। একটি মেধা। একটি দেশ দরদী বারুদ। একই সঙ্গে একটি আন্দোলন। তার সব কিছুই এখন কেবলই স্মৃতি। আর ফিরবেন না তিনি। দেশের জন্যে মানুষের জন্যে তার মন আর কাঁদবে না। ৩১শে জুলাই। কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মাদ রাশেদ খান। দুই পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তলের গুলিতে নিভে যায় একটি স্বপ্ন। এমন চৌকস সেনা কর্মকর্তার নির্মমভাবে হত্যার ফলে গোটা জাতি আজ স্তম্ভিত। সমালোচনার ঝড় বইছে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে। মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকান্ড নিয়ে কী ভাবছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাই তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের প্রতিনিধি মো, আজহারুল ইসলাম

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জিকে সাদিক মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, মেজর (অব.) সিনহা হত্যা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর যে হত্যাকাণ্ডের ঘৃণ্য ঐতিহ্য রয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ। অতীতের রেখা মেনেই এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ওসি প্রদীপ ও লিয়াকত মিলে ২০১৮ সালের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত ওই এলাকায় ১৬১ জন মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা করেছে। এতোগুলো হত্যাকাণ্ডের সংবাদ রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কাছে ছিল না এমন নয়। কিন্তু সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারাদেশে যখন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তখন এগুলো সামনে আসছে এর আগে প্রকাশও হয়নি।

আজ যদি মেজর সিনহার মতো কেউ না হয়ে সাধারণ কাউকে গুলি করে হত্যা করতো তাহলে আমাদের আলোচনাতেই আসতো না। ইতোপূর্বে আসেওনি। আর আমরাই বিচারহীনতার সংস্কৃতির যাতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো এমন হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করি। এই ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের সার্বিক সংস্কার দরকার এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর হাতে দেয়া অবাধ ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে হবে। সর্বোপরি সংস্কার ও আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এসব হত্যাকাণ্ডের লাগাম টানা সম্ভব হবে না।

আইন ও ভূমি ব্যাবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিম নিলয় ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, সেনাপ্রধানের ভাষ্য মতে মেজর সিনহা হত্যা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যার দায় কোনো প্রতিষ্ঠানের হতে পারেনা। বিভিন্ন অনুসন্ধানে ইতিমধ্যেই বের হয়ে এসেছে, টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি প্রদীপ কুমার কিভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেকনাফে ত্রাসের রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন। প্রদীপ কুমারের মাদক চোরাচালানের মত অবৈধ কাজের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই একজন চৌকষ সেনা অফিসারকে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই মামলার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করে আসামীদের শাস্তি প্রদান এবং পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের তাদের কাজের স্বচ্ছ জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। নয়তো, আইন শৃঙ্খলার রক্ষকের হাতেই প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হবে দেশের পবিত্র আইন।

এক আলাপচারিতায় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন রুম্মান ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, মেজর সিনহা হত্যায় কারণ দর্শানো হলো সেই পুরনো গল্প, ‘আত্মরক্ষার্থে’ পুলিশ বাধ্য হয়ে ট্রিগার চেপেছে! এবং গল্প এখানেই শেষ নয়, পুলিশ দাবি করল, দুই বোতল মদ ও গাঁজা পাওয়া গেছে সিনহার কাছে। মেজর সিনহার ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা যে ব্যর্থ হয়েছে সেটা স্পষ্ট। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নড়বড়ে অবস্থার কারণে আষাঢ়ে গল্প শুনিয়ে পার পেয়ে যায় অভিযুক্তরা। তাছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকায় বরাবরের মতই চলে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সংবিধানের কাছ থেকে হয়তো মেজর সিনহা অধিকারের নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন, কিন্তু সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে একদল পুলিশ। যখন এভাবে মৌলিক অধিকার খর্বের আয়োজন চলে, তখন সংবিধান পরিণত হয় স্রেফ একটি পুস্তকে। দেশের বিচারব্যবস্থা হয়ে উঠে অপ্রয়োজনীয়। এককথায়, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা সরকার, সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ, বিচার বিভাগ, সংবিধান সর্বপরি রাষ্ট্রীয় স্তম্ভগুলোর উপর একেকটি আঘাত।

আইন ও ভূমি ব্যাবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী প্রতাপ পাল ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, সিনহা হত্যাকান্ডের দুই জিনিস দেখতে পাই, একটি ক্ষমতার দাপট বা অপব্যবহার আরেকটি সামাজিক অবক্ষয়। বর্তমানে কিছু পুলিশ সদস্য খুব বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যার জলজ্যান্ত প্রমাণ ওসি প্রদিপ। এছাড়াও আরও বেশ কিছু বিষয় বর্তমানে খুবই দেখা যাচ্ছে যেমন ইয়াবা দিয়ে ফাসিয়ে দেয়া বা মিথ্যা মামলা, অহেতুক হয়রানি। পুলিশকে আরও জনবান্ধন করতে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো উচিত বলে আমি মনে করি। তাছাড়াও এসব বিভিন্ন ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ বিচার না হওয়া বা বিচারের বিলম্বতা অনেক বড় একটা কারণ। পুলিশ বাহিনী কে দুর্নীতিমুক্ত করতে শুদ্ধি অভিযান চালানো উচিত। আর সামাজিক অবক্ষয় বলতে ব্যক্তিগত আক্রমণ। যা ইদানিং বেশি দেখা যাচ্ছে এখানে শিপ্রার উদাহরণ দিতে চাই। ব্যাক্তিগত ছবি প্রকাশ এবং তা শেয়ারের প্রবনতা এসব বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হওয়া উচিত। কেউ বেফাঁস মন্তব্য করতে পারে, তাই বলে তাকে হেয় করার জন্য তার ব্যক্তিগত জীবন কে আক্রমণ করা থেকে অনুচিত।

বর্তমানে দেশের সর্বস্তরের জনগনের মনে নাড়া দিয়ে গেছে বর্বরচিত এই হত্যাকান্ড। সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা হউয়ার পর থেকে ক্রসফায়ারের বিভিন্ন ঘটনা পুর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিক থেকে হ্রাস পাচ্ছে মাদকের অবাধ ব্যবসা কিন্তু পুলিশের ক্রসফায়ারে মৃতের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সচেতন মহলে গুঞ্জন সরব ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ করতে।

তানজিম মারিয়া, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী সিনহা হত্যার ব্যাপারে ক্যাম্পাসলাউভকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা টেকনাফে ওসি প্রদীপ এবং এস আই লিয়াকত এর বিভিন্ন দুর্নীতি এবং নির্বিচারে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যার অভিযোগ এখন আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে আসছে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিপ্রা এবং সিফাত এর নিরাপত্তা এখন মূখ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি মেজর সিনহার হত্যার বিচার অতি দ্রুত সম্পন্ন হোক এবং ক্রসফায়ারকে আইনের ডাইরি থেকে মুছে ফেলা হোক। হতেই পারে এমন একটি ঘটনা আজ সামনে এসেছে তাই আমরা জানতে পেরেছি বাংলাদেশের কোথায় না জানি এমন কত ঘটনা লুকিয়ে আছে।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতিমাতুজ্জোহরা বলেন, গত ৩১ শে জুলাই রাতে টেকনাফের বাহারছড়া চেকপোস্টে তল্লাশির সময় বিচার বহির্ভূতভাবে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর অব. সিনহা। যে ঘটনাটির মূল হোতা হিসেবে ধরা হচ্ছে ওসি প্রদীপকে। অন্যদিকে শিপ্রা ও সিফাত হচ্ছে মেজর সিনহার সহকর্মী ও বন্ধু তারা একসাথে মিলে তৈরী করছিলেন ‘জাস্ট গো’ নামের একটি ডকুমেন্টারী। এমনটাই জানা যায় শিপ্রার অনলাইন বক্তব্য হতে।তবে যে শিপ্রা এবং সিফাত হচ্ছে মেজর সিনহার বন্ধু ও সিনহা হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী তাদেরকেই আমরা মেজর সিনহা হত্যার বিচার চাইতে দেখি নি।

যেটা জনমনে বেশ প্রশ্নবিদ্ধের একটা জায়গা তৈরী করে।শিপ্রার ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর যেনো তিনি ওগুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। একবারের জন্যও মেজর সিনহা হত্যার জট তারা জাতির সামনে খুলতে চান নি। অতএব তারা কি মেজর সিনহার বন্ধু ছিলেন নাকি শত্রু সেটাও সঠিকভাবে বলা যায় না।

ঢাকা, ২১ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।