‘‘ছেলের হাসপাতালের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নেন বাইডেন, জিল হচ্ছেন ফার্স্ট লেডি’’স্ত্রী-কন্যা হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার গল্প


Published: 2020-12-01 22:38:42 BdST, Updated: 2021-01-27 10:42:09 BdST

লাইভ ডেস্ক: জো বাইডেন। একটি নাম। একটি ইতিহাস। একটি অসমাপ্ত গল্পের শিরোনাম। তার আদরের ছেলে বো বাইডেনের স্বপ্ন পূরণ হলো। তবে জীবত ছেলের নয়। যে চিরতরে চলে গেল তার শেষ ইচ্ছাটাই সত্যি হলো। গল্পের শিরোনামের সফল সমাপ্তিও হলো। তবে সেই ছেলে নেই। 

৬ বারের যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেটর নির্বাচিত হওয়া বাইডেন সর্বপ্রথম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেন। বাইরে থেকে না বোঝা গেলেও বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হতে চলা মানুষটির বাস্তব জীবনে লুক্কায়িত আছে এক বিষাদময় কাহিনী।

ছয়বার যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেটর নির্বাচিত হওয়া বাইডেন সর্বপ্রথম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। নির্বাচিত হবার কিছুদিন পরই এক গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী নীলিয়া হান্টার এবং এক বছরের শিশুকন্যা নাওমি ক্রিস্টিনাকে হারান বাইডেন।

বো বাইডেন

 

আহত দুই ছেলে বো এবং হান্টারকেও রাখতে হয় হাসপাতালে। বাইডেন তার ছেলের হাসপাতালের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছিলেন।

সিনেটের ওয়েবসাইটে লেখা আছেঃ

গল্পটা এখানেই শেষ। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে ডেলাওয়ার সিনেটর জোসেফ বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পরপরই একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী এবং শিশু কন্যা প্রাণ হারায় এবং তার দুই ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। বাচ্চাদের শয্যাপাশে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, সিনেটের সেক্রেটারি ফ্রান্সিস ভ্যালিও নতুন সিনেটর বাইডেনের শপথ নেওয়ার জন্য উইলমিংটনে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে ভ্যালিও এক মৌখিক সাক্ষাৎকারে সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি স্মরণ করেছিলেন।

সে সময় সিনেটে নির্বাচিত সবচেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে একজন বাইডেনের বয়স ছিল ২৯ বছর। তবে শপথের সময় সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৩০ বছর বয়সে উপনীত হন তিনি। সন্তান-বাৎসল্যের দিক থেকে কোন ঘাটতি ছিল না বাইডেনের।

জো বাইডেন ও তার পরিবার

মাতৃহারা দুই সন্তানকে সময় দেয়ার জন্য রাজধানী ওয়াশিংটনে আবাস গড়েন নি তিনি। বরং ডেলাওয়ারের উইলমিংটনের বাড়ি থেকে প্রতিদিন ট্রেনে চেপে সুদূর (১১১ মাইলের দূরত্বে) ওয়াশিংটন যেতেন।

স্ত্রী এবং শিশুকন্যাকে হারানোর সাড়ে চার বছর পর জিলকে বিয়ে করেন বাইডেন, যিনি হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ফার্স্ট লেডি। তাদের সংসারে একমাত্র সন্তান- কন্যা অ্যাশলে। বাইডেনের জীবনে ট্র্যাজেডি যেনো পরিচিত এক নাম।

১৯৭২ এর ট্র্যাজেডির ৪৩ বছর পর ২০১৫ সালে তার ছেলে বো বাইডেন ব্রেইন ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে মারা যান। তখন বাইডেন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

নিউইয়র্ক টাইমস এর এক রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছিল, বো-র ইচ্ছা ছিল তার পিতা বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন। কিন্তু পিতা প্রেসিডেন্ট হবার মাত্র ৫ বছর আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বো বাইডেন। তারা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। আর ফিরবেন না কোনদিন। সেই বাইডেন অবশেষে জেদী ট্রাম্প শপথ নিলেন।

হোয়াইট হাউসে গেলেও কাজ ছাড়বো না:

বাইডেন-জিল

 

আমেরিকার নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের স্ত্রী জিল বাইডেন পেশায় একজন শিক্ষিকা। ফার্স্ট লেডি হতে যাওয়া এই নারী দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন সমাজসেবামূলক নানা কাজের সঙ্গে।ফার্স্ট লেডি হওয়ার পরেও জীবনযাত্রায় বিশেষ পরিবর্তন আনবেন না বলে আগেভাগেই বুঝিয়ে দিয়েছেন জিল। ডেমোক্রেটদের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব সামলানোর পরও কোনো ফার্স্ট লেডি অন্য কাজ করবেন আমেরিকার ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন।

পদাধিকার বলে আমেরিকার ফার্স্ট লেডি হোয়াইট হাউসের 'হোস্ট'। নিজস্ব অফিসের পাশাপাশি তার অধীনে থাকেন চিফ অব স্টাফ, প্রেস সেক্রেটারি, হোয়াইট হাউস সোশ্যাল সেক্রেটারি, চিফ ফ্লোরাল ডিডাইনার এবং তাদের অধীন কর্মী-কর্মকর্তারা।

সেই কি প্রেম...

 

তার ওপরে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজনের দায়িত্বভার থাকে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিদেশ সফরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গী হন ফার্স্ট লেডি। কয়েক দশক ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত জিল বাইডেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে (২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল) ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন।

ওই ৮ বছর আমেরিকার সেকেন্ড লেডি হিসেবে কলেজের শিক্ষকতা ও সমাজসেবামূলক কাজ চালিয়ে গেছেন জিল। বাইডেন যে দিন মনোনয়ন নেন, সেদিন কলেজ থেকেই অনলাইনে বিবৃতি দেন তিনি। অগস্টেই এক সংবাদমাধ্যমে জিল বলেন, 'আমি অনেক অভিবাসী এবং শরণার্থীকে পড়াই। তাদের পড়াতে ও তাদের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসি।

জিল বলেন, হোয়াইট হাউসে গেলেও কাজ ছাড়ছি না আমি।' ফার্স্ট লেডি বা সেকেন্ড লেডির চেয়েও নিজের শিক্ষক পরিচয়ে বেশি গর্ববোধ করেন জিল। স্ত্রী সম্পর্কে এক সভায় বাইডেন বলেন, 'আপনাদের সেই প্রিয় শিক্ষকের কথা ভাবুন, যিনি নিজেকে বিশ্বাস করার পাশাপাশি আপনাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছিলেন।

জিল বাইডেন তেমনই এক ফার্স্ট লেডি হবেন।' জিল জ্যাকবসের জন্ম ১৯৫১ সালে নিউ জার্সিতে। বড় হয়েছেন ফিলাডেলফিয়ায়। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। জিল প্রথমে বিয়ে করেন সাবেক ফুটবলার বিল স্টিভেনসনকে।

জিল-বাইডেন

 

পরে ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন বাইডেনকে। ১৯৭২ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় জো বাইডেনের প্রথম স্ত্রী ও এক বছরের কন্যাসন্তানের মৃত্যু হয়। তখন তিনি সিনেটর। ওই দুর্ঘটনার পর জিলের সঙ্গে বাইডেনের পরিচয় হয় এবং পরে বিয়ে করেন তারা। ১৯৮২ সালে জন্ম হয় তাদের মেয়ে অ্যাশলির। গত কয়েক দশক ধরে শিক্ষকতা করছেন জিল। দুটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার পর ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার থেকে শিক্ষাবিদ্যায় পিএইচডি করেন তিনি।

ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস শুরুর আগে একটি কমিউনিটি কলেজ, একটি সরকারি স্কুল ও কিশোরদের একটি মানসিক হাসপাতালে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে নর্দার্ন ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন জিল। ১৯৯১ থেকে ৯৩ সাল পর্যন্ত ডেলাওয়ারের ব্রান্ডিওয়াই হাইস্কুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি: ডিসেম্বর ১৮, ১৯৭২ সালে বাইডেন ছিলেন ওয়াশিংটনে। টেলিফোন বাজল, তার ভাই জিমি বাইডেন ডেলাওয়ার থেকে ফোন করেছেন। বোন ভ্যালেরির সাথে কথা বলতে চাইলেন। বোন বললেন, "একটা ছোট দুঘ'র্টনা ঘটেছে। কিন্তু চিন্তা করার কিছু নেই।"

সেদিনই আরও পরের দিকে বাইডেন জেনেছিলেন ওই দুর্ঘ'টনায় তার স্ত্রী নেইলিয়া এবং শিশুসন্তান নেওমি মা'রা গেছেন। তার স্ত্রী গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একটা লরি গাড়িতে ধা'ক্কা মা'রে। গাড়িতে থাকা তার দুই ছেলে বোও আর হান্টারও গু'রুতরভাবে আহ'ত হয়েছে।

তারা ক্রিসমাস উত্‍সবের জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনতে গিয়েছিলেন। বাইডেন তখন সবে সেনেটার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার কংগ্রেস অফিসের কর্মী নিয়োগের জন্য সেদিন ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত ছিলেন। এছাড়াও পরিবারের থাকার জন্য একটা বাসা কেনার বিষয়টি সেদিন তিনি চূড়ান্ত করতে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তিনি একেবারেই বি'ধ্ব'স্ত হয়ে পড়েন।

"আমি কথা বলতে পারতাম না, বুকের ভেতরে একটা বিশাল শূণ্যতা অনুভব করতাম, মনে হতো একটা কালো গহ্বর আমাকে ভেতরে টেনে নিচ্ছে," তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন বাইডেন। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবার কথা ভেবেছিলেন, ঠিক করেছিলেন যাজক হবেন, দুই ছেলেকে মানুষ করবেন।

তিনি লিখেছেন, ''যেসব এলাকায় খুব গুণ্ডামি হতো, সেসব এলাকায় তিনি সন্ধ্যেবেলা ঘুরে বেড়াতেন। মা'রপিট করতে তার ইচ্ছা হতো। আমার ভেতরে একটা বিরাট ক্রো'ধ তৈরি হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর আমার সাথে একটা নি'ষ্ঠু'র খেলা খেলছেন। আমার রাগ হতো।"

বাইডেন ও তার স্ত্রী

 

কৈশোর ও যৌবন: জো বাইডেনের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। বাইডেনের জন্মের আগে তিনি ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু জো-র জন্মের পর তার ব্যবসা পড়ে যায়। জো বাইডেনের কৈশোর কেটেছে পারিবারিক অভাব অন'টনের মধ্যে দিয়ে। পেনসিলভেনিয়ায় খুবই সাদামাটা এক বাসায় যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। তার পরিবার ছিল খুব ধার্মিক। ক্যাথলিক মূল্যবোধ ও তার ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল পারিবারিক ধর্মচর্চ্চার সুবাদে।

ছেলেবেলায় তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তোতলামি কাটিয়ে ওঠা। স্কুলের উঁচু ক্লাস পর্যন্ত এই সমস্যা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পড়তে গিয়ে তার তোতলামির জন্য সহপাঠীরা তো বটেই, এমনকী শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করতেন। "এখনও আমার মনে আছে সেই য'ন্ত্র'ণার কথা, ল'জ্জা রাগ আর অ'পমানের দিনগুলোর কথা," বাইডেন লিখেছেন তার স্মৃতিকথায়।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে কবিতা আবৃত্তি ও সংয'তভাবে কথা বলা আয়ত্ত করতে করতে, হাই স্কুল পার হবার পর তোতলামো কা'টিয়ে ওঠেন তিনি। হাই স্কুল শেষ করে তিনি পড়তে যান ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে।

রাজনৈতিক উত্থান: কলেজেই পরিচয় হয়েছিল নেইলিয়া হান্টারের সাথে। লেখাপড়া শেষে ফিরে যান ডেলাওয়ারের উইলমিংটন শহরে। বিয়ে করেন নেইলিয়াকে। উইলমিংটনেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। একটি বড় আইনী প্রতিষ্ঠানে তিনি আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাশালীদের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠেন।

ঢাকা, ০১ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।