২২২ বছর পর হজ বাতিল নিয়ে নানান সুর...


Published: 2020-04-03 09:48:56 BdST, Updated: 2020-07-12 19:17:54 BdST

লাইভ ডেস্ক: হজ্ব। একটি ইবাদাত। ইসলাম ধর্মের অন্যতম একটি স্তম্ভ। এটা বাতিল বা রহিত করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কি আর করা। সব কিছু ছাপিয়ে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সৌদি আরব সরকার। মরণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সৌদি আরবেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জানা গেছে ইতিমধ্যেই দেশটির পবিত্র দুই নগরীতে মক্কা-মদিনাতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কারফিউ জারি করেছে সরকার। পুরো দেশে ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউন। বায়তুল্লা ও মাসজিদে নববীতে আজান হলেও খুবই সীমিত আকারে হচ্ছে নামাজ। বাইরের কেউ সেই নামাজে অংশ নিতে পারছেন না।

এই নাজুক পরিস্থিতিতে চলতি বছর মুসলমানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় জামায়েত পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে কি-না সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ১৭৯৮ সালের পর এই প্রথম বাতিল হতে পারে হজ। যা ২২২ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন ঘোষণা দেয়নি হজের বিষয়ে। অবস্থাদৃস্টে এমনটি হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।

সৌদি সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানসহ ক'টি সঙবাদ পত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর হজ বাতিল হতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে অবশ্য হজ বাতিলের ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে আধুনিক ইতিহাসে এটা বিরল ঘটনা। সর্বশেষ প্রায় ২০০ বছর আগে ১৭৯৮ সালে হজ বাতিল করা হয়েছিল।

সৌদি কর্তৃপক্ষ হজযাত্রীদের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে। এ থেকে অনুমান করা হচ্ছে, চলতি বছর হজ অনুষ্ঠিত নাও হতে পারে। জুলাই মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়ার কথা এ বছরের হজের আনুষ্ঠানিকতা। তবে হজের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম এখনও বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমদের হজে অংশগ্রহণের বিষয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মক্কা ও মদিনা মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র দুটি শহর, যা হজযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু। করোনার কারণে দুটি শহরই গত এক মাস ধরে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রয়েছে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সময়ও এই দুটি শহর বন্ধ করা হয়নি। সৌদি কর্মকর্তারা বিদেশের জন্য দেশের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং আংশিকভাবে হজের আগে এই ভাইরাসটি নির্মূল করার আশায় মক্কা ও মদিনার অভ্যন্তরে চলাচলে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

সৌদি আরবে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে দেড় হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ১০ জন। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭২ হাজার। বুধবার এক টেলিভিশন ভাষণে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ সালেহ বিন তাহের বেনতেন বলেছেন, সৌদি আরব সব মুসলমান ও নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত। সেকারণে পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত হজের বিষয়ে কোনও চুক্তিতে না যেতে আমরা সব দেশের মুসলিম ভাইদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

এদিকে সর্বশেষ ১৭৯৮ সালে বাতিল হয়েছিল হজের আনুষ্ঠানিকতা। এছাড়া মহামারি ও যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ৪০ বার এই বার্ষিক জমায়েত বাতিল হয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজের লেকচারার সিরাজ মাহের গার্ডিয়ানকে বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছে যে এবারের হজ বাতিল হতে পারে।

সিরাজ মাহের বলেন, তারা অতীতের ঐতিহাসিক উদাহরণ উল্লেখ করছে যেখানে বিপর্যয় বা সংঘাতসহ বিভিন্ন কারণে হজ বাতিল করা হয়েছিল। আমার মনে হয় এটি সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টা যাতে মানুষকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, হজ যদি বাতিল করা হয়েই থাকে তাহলে তা একেবারেই কোনও অভূতপূর্ব ঘটনা নয়।

সিরাজ মাহের জানান, ইসলামে কেয়ামতের ইঙ্গিতের যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে সেখানে বলা হয়েছে হজ বাতিল হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলছেন করোনাভাইরাসের কারণে হজ বাতিল হলে তা কেয়ামত নিকটে আসার ইঙ্গিত বহন করবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, তা যথাযথ নয়। কারণ কেয়ামতের ইঙ্গিত দিতে গিয়ে হজের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে, মহামারীর কারণে হজ বাতিলতো আলাদা ব্যাপার।

কিংস কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্ট্যাডিজ বিভাগের প্রভাষক সিরাজ মাহের বলেন, হজ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ মুসলিমদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করছে। তারা অতীত থেকে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেতে শুরু করেছে, যেখানে বিপর্যয় ও যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে হজকে স্থগিত করতে হয়েছিল। আমি মনে করি, এটি মানুষকে আশ্বস্ত করার বিস্তৃত প্রয়াসের একটি অংশ। যদি হজ সত্যিই বাতিল হয় তবে সেটা কোনো নজিরবিহীন ঘটনা হবে না।

উল্লেখ্য, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে সৌদি আরবে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৮৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। আর প্রাণ গেছে ২১ জনের। এদিকে বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আর ৫৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ হারিয়েছেন এ ভাইরাসে।

ভাইরাসটি ছোঁয়াচে হওয়ায় এর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সব ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়া জনসমাগম এড়িয়ে চলতে সৌদি আরব দেশে লকডাউন ও কারফিউ জারি করেছে।

সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ সালেহ বিন তাহের বেনতেন বলেন, হজের প্রস্তুতি নিয়ে এবার তাড়াহুড়ো না করতে মুসলিম দেশগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। মহামারির গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত। বেশি গুরুত্ব পাবে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি।

ঢাকা, ০৩ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।