মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনে কেন এত অবিচার, নির্যাতন!


Published: 2019-02-12 20:35:56 BdST, Updated: 2019-04-21 02:57:08 BdST

লাইভ ডেস্কঃ মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনে কেন এত অবিচার। কেন এতো নির্যাতন। উইঘুরদের দমন করতে চীন ভিন্ন এক কৌশল নিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের তারা যেখানে আটকে রাখছে সরকার তাকে মুক্ত ‘ভকেশনাল’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করছে। কিন্তু যারা এর শিকারে পরিণত হচ্ছেন তারা একে বর্ণনা করছেন জেলখানা হিসেবে।

এমনই একজন আইবোতা শেখ। তিনি চীনা কাজাখ। তার পিতা দুদায়বার্জেন শেখ তারবাগাতায় এলাকার স্থানীয় একজন ইমাম। এ এলাকাটি সিনজিয়াং অঞ্চলের একটি এলাকা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে আটক করে পুলিশ। তারপর থেকে তার মেয়ে আইবোতা শেখ পিতার কাছ থেকে আর একটি শব্দও শুনতে পান নি।

তিনি বলেন, আমি জানি না কি কারণে আমার বাবাকে এভাবে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি চীনের কোনো আইন লঙ্ঘন করেন নি। তাকে কোনো আদালতেও বিচারের জন্য তোলা হয় নি। এ কথা বলতে বলতে পিতার একখানা ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আইবোতা শেখ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

বিবিসির সাংবাদিক আবদুজলিল আবদুরাসুলভ এ নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, আমি কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় শহর আলমাটিতে চীনা কাজাখদের একটি গ্রুপের সঙ্গে কথা বলি। তার মধ্যে ছিলেন আইবোতা শেখ।

তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওই মানুষগুলো কাজাখ সরকারের একটি ছোট্ট অফিসে সমবেত হয়েছিলেন তাদের প্রিয়জনকে মুক্ত করার জন্য আবেদন নিয়ে। অনেক দিন ধরে এসব মানুষ নিখোঁজ।

জাতিসংঘের কমিটি অন দ্য ইলিমিনেশন অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট পেয়েছে যে, প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সিনজিয়াংয়ের বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। এর প্রায় সবাই মুসলিম সংখ্যালঘু উইঘুর, কাজাখ ও অন্যান্য গোষ্ঠীর।

চীনে ১০ লাখেরও বেশি কাজাখ বসবাস করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর হাজার হাজার কাজাখ চলে যান তেলসমৃদ্ধ কাজাখস্তানে। কাজাখস্তানে জাতিগত কাজাখদের প্রতি আকর্ষণও এক্ষেত্রে তাদেরকে অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকতে পারে। যারা কাজাখস্তানে গিয়েছিলেন তারা এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

চীনে তাদের যেসব আত্মীয়স্বজন রয়ে গেছেন তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না। নুরবুলাত তুরসুনজান উলু ২০১৬ সালে আলমাটি অঞ্চলে চলে যান। তিনি বলেছেন, তার পিতামাতার অনেক বয়স হয়েছে। চীন ছেড়ে কাজাখস্তানে যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই তাদের।

তা ছাড়া তাদের পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আরেকজন আবেদনকারী বেরমুরাত নুসুপকান উলু বলেছেন, চীনে থেকে যাওয়া তাদের আত্মীয়রা ফোনে অথবা চীনে জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটে কথা বলতেও ভয় পান। তাদের এই ভয় পাওয়ার যৌক্তিকতা আছে।

তিনি বলেন, আমার শ্বশুর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের দেখতে এসেছিলেন। আমার বাসা থেকে তিনি চীনে অবস্থানরত তার ছেলের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তারা কেমন ছিলেন এবং কি করছিলেন সে সম্পর্কে। এর অল্প পরেই তার ছেলে বুরঝানকে আটক করা হয়েছে।

তাকে বলা হয়েছে, তিনি দু’ বা তিনবার কাজাখস্তান থেকে ফোন কল রিসিভ করেছেন। এ জন্য তাকে রাজনৈতিক বন্দিশালায় পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কোনো যথাযথ প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে এসব মানুষকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয় না।

বিচারেও তোলা হয় না। তাদেরকে আইনজীবী অথবা পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। এমন বন্দিশালায় বেশ কিছু মাস কাটিয়েছেন জাতিগত কাজাখ ওরিনবেক কোকসিবেক। তিনি বলেছেন, সেখানে নরকে সাতটি দিন পাড় করেছি আমি। আমার হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল। দু’পা বেঁধে রাখা হয়েছিল।

তারা আমাকে একটি ছোট্ট জায়গায় ছুড়ে ফেলেছিল। এ সময় আমি দুটি হাত উপরের দিকে তুলে ধরি এবং উপরের দিকে তাকাই। সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার ওপর পানি ঢেলে দেয়। এ সময় আমি আর্তনাদ করেছি। তারপরে কি ঘটেছিল আমি স্মরণ করতে পারছি না। জানি না সেখানে কত সময় ছিলাম আমি। তখন ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা।

তারা আমাকে একজন বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করতো। আমার কাছে ছিল দ্বৈত্য নাগরিকত্ব। আমার ঋণ ছিল এবং জমির মালিক ছিলাম আমি। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই সত্য নয়। এক সপ্তাহ পরে কোকসিবেককে নিয়ে যাওয়া হয় আরেকটি আলাদা স্থানে। সেখানে তাকে শিখানো হয় চীনা গান ও ভাষা।

তাকে বলা হয়, তিনি ৩০০০ শব্দ শিখতে পারলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। চীনে তারা এটাকে বলে পুনঃশিক্ষা বিষয়ক ক্যাম্প। যদি তাই হয় তাহলে মানুষকে কেন হ্যান্ডকাপ পরানো হবে? প্রশ্ন করেন তিনি। তার ভাষায়, তারা কাজাখদের আটক করে।

এর কারণ, তারা মুসলিম। কেন তাদেরকে জেলে আটকে রাখা হয়? এর উদ্দেশ্য হলো, তারা কাজাখদের চীনা বানাতে চায়। তারা পুরো জাতিকে মুছে ফেলতে চায়। কোকসিবেকের এই কাহিনী নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় নি। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্য যেসব অধিকারকর্মীরা এ বিষয়ে যেসব ডকুমেন্ট হাজির করেছে তার সঙ্গে মিলে যায় তার কাহিনী।

এ বিষয়ে কাজাখস্তানে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের মুখোমুখি হয় বিবিসি। তারা কোনো জবাব দেয় নি। ওদিকে চীনা কর্তৃপক্ষ এমন জেলখানাকে ‘ভকেশনাল’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলে, যে পরিবেশ সন্ত্রাস ও ধর্মীয় উগ্রবাদের উর্বরতা দেয় তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এ ব্যবস্থা।

ওদিকে কাজাখ সরকার বলে, চীনের ভিতরে যেকোনো চীনা নাগরিকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয়। সেখানে তাদের হস্তক্ষেপ করার কোনো এক্তিয়ার নেই। এনিয়ে এখন নানান আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।


ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।