লোহিত সাগর ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়ছে


Published: 2018-01-10 22:21:34 BdST, Updated: 2018-09-21 22:27:58 BdST


ইন্টারন্যাশনাল লাইভ: মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তুরস্ক এখন আরবদের কাছে ‘থ্রেট’। গত বছর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জেরুজালেম ইস্যুতে ডাকা ওআইসির সম্মেলনে কিছু হেভিওয়েট আরব নেতার অনুপস্থিতি এই ধারণার জন্ম দিয়েছে।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ানের আফ্রিকা সফরের পর লোহিত সাগর এলাকায় মিশর ও আরব আমিরাতের মিলিটারি মুভমেন্ট এই ধারণাকে আরো প্রতিষ্ঠিত করে। অটোমান শাসকদের মত লোহিত সাগরে সম্প্রতি তুরস্ক তার অবস্থান জোরদার করেছে। সোমালিয়াতে দেশের বাইরে সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে তুরস্ক,আর সুদানের সুয়াকিন দ্বীপেও ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এতে নড়েচড়ে বসেছে সৌদি আরব,মিশর আর আরব আমিরাত। ইথিওপিয়া এবং সুদানেরও মুভমেন্ট চোখে পড়ছে।

অটোমান শাসকদের পরিত্যক্ত 'সুয়াকিন দ্বীপ' সুদান কর্তৃপক্ষ আবারো তুরস্কের হাতে ছেড়ে দেয়ার পর সৌদি-আমিরাত- মিশর জোটের সাথে দূরত্ব বাড়ে সুদানের। এরই প্রতিক্রিয়ায় ৪ জানুয়ারি সুদানের প্রতিবেশী ইরিত্রিয়াতে সেনা পাঠায় মিশর।

যেখানে এই সেনা মোতায়েন করা হয় সেটি মূলত আরব আমিরাতের একটি সামরিক ঘাঁটি। এর মাধ্যমে মূলত সুদানকে একটা বার্তা দেয়া হয়। এমনিতেই হালায়েব দ্বীপের মালিকানা নিয়ে সুদান ও মিশরের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে।

দ্বীপটি এখন মিশরের দখলে রয়েছে। সৌদিও একসময় দ্বীপটি সুদানের বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেটা বহু বছর আগের কথা। বর্তমানে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জেনারেল সিসি। মুসলিম ব্রাদারহুডকে ফেলে দিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে সৌদি ও তার মিত্ররা।

সুদানের পত্রিকাগুলো লিখেছে, জেনারেল সিসি সরকার জিবুতি ও সোমালিয়াতে ২০ থেকে ৩০ হাজার সৈন্যের ঘাঁটি বানানোর জন্য দেন দরবার করে যাচ্ছে। এটা ইথিওিপিয়ার জন্যও শংকার খবর কারন নীলনদে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে মিশরের সাথে দেশটির বিরোধ চলছে।

সুয়াকিন চুক্তির কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লোহিত সাগরে সৌদি-আমিরাত- মিশর জোটের সেনা মুভমেন্ট প্রমাণ করছে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে মূল লড়াইটা আসলে সৌদি ও তুরস্কের মধ্যে। আরব সংবাদমাধ্যমগুলোই এই ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। আরবদের মধ্যে একটা আশংকা তৈরি হয়েছে, সোমালিয়া ও সুদানের পর ভবিষ্যতে ইথিওপিয়াতেও কি কোন তুর্কি ঘাঁটি গড়ে উঠতে পারে? এ আশংকা একেবারেই উড়িয়ে দেবার মত নয়।

বিপত্তিটা লোহিত সাগর নিয়ে। এখানে সামরিক বেইস নির্মাণ করতে চায় তুরস্ক। সুয়াকিন দ্বীপ লিজ নেয়ার জন্য সুদানের সাথে এরদোয়ান সরকার সাড়ে ছয়শ মিলিয়ন ডলারের যে চুক্তি করেছে তার মূল উদ্দেশ্য এটিই।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান- সৌদি দ্বন্দ্বের মুখে অটোমান উত্তরসূরীরা যে 'স্ট্রাটেজিক লিডারশীপ' নিতে চায় এখন সে চিন্তা-ভাবনাকেই যেন প্রতিষ্ঠিত করল তুরস্কের এই পদক্ষেপ। লোহিত সাগর ঘিরে এ অঞ্চলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, চীন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আগে থেকেই ছিল।

গত অক্টোবরে সোমালিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে সেই বহরে যোগ দিয়েছে তুরস্ক। আর সুয়াকিনে বেইস নির্মাণ হলে সেটি হবে লোহিত সাগরে তাদের দ্বিতীয় ঘাঁটি। সৌদি- আমিরাত আর ইসরায়েলের দুশ্চিন্তার কারন এটিই। কারন মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্ব নিয়ে সৌদ আরব ও ইরানের মধ্যে প্রকাশ্য যে বিরোধ চলছে,তাতে আপাত দৃষ্টিতে লড়াইটা দুই দেশের মধ্যে মনে হলেও মূল লড়াইটা আসলে সৌদি ও তুরস্কের মধ্যে।

কারন শিয়াপ্রধান হওয়ায় ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণের অভিলাষ হালে পানি পাবেনা,এটা সৌদি আরবও ভাল করেই জানে। মক্কা- মদিনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অটোমান আর সৌদ পরিবারের দ্বন্দ্ব সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই। তুরস্কে আতাতুর্কদের উত্থান হলে সে লড়াই প্রশমিত হয়। কিন্তু এরদোয়ানের উদার ইসলামপন্থী জোট, একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তুরস্ক তার ছানিপড়া দৃষ্টিসীমা বাড়িয়েছে।

লোহিত সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

তেল পরিবহনে লোহিত সাগর বিশ্বের ব্যস্ত তম প্রবেশপথগুলোর একটি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেটিন গুরাসান সম্প্রতি আলজাজিরাকে বলেন, সম্ভাব্য তিনটি কারনে তুরস্ক সুয়াকিন লিজ নিয়েছে। প্রথমত তুরস্ক সেখানে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়, দ্বিতীয় আর তৃতীয় কারনটি মূলত অর্থনীতি ও মানবিক।

সেন্টার ফর ইউরোপীয়ান পলিসির গবেষক জেমস মোরান মনে করেন এটার মূল কারন অর্থনৈতিক, কারন লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তুরস্কের সাম্প্রতীক তৎপরতা থেকে এটা পরিষ্কার যে, আফ্রিকাকে কেন্দ্র করেই সে তার কৌশল সাজাচ্ছে। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত আফ্রিকার আরেক দেশ জিবুতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র,ফ্রান্স ও চীনের সামরিক বেইস।

২০১৭ এর শেষদিকে আফ্রিকার তিনটি দেশ সফর করেন তুর্কি প্রসিডেন্ট এরদোয়ান। শুরু করেন সুদান দিয়ে আর সফর শেষ করেন সাদ প্রজাতন্ত্র দিয়ে। তার সাথে ছিলের্ন ফার্স্ট লেডি এমিলি এরদোয়ান অার তুরস্কের সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল হুলুসি আকার। সুদানের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক মিলিয়ে মোট ১২ টি চুক্তি করেন তিনি।

যার মধ্যে রয়েছে সুদানের অটোমান আমলের সুয়াকিন দ্বীপ লিজ নেয়ার বিষয়টিও। ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর এই প্রথম কোন তুর্কি সরকার প্রধান সুদান সফর করেছেন। এরপর তিউনিশিয়া গিয়ে সামরিক সহ দেশটির সাথে ৪ টি চুক্তি করেন এরদোয়ান। আরব গণমাধ্যমগুলো খবর প্রচার করে,সুয়াকিন দ্বীপের পূর্ণ মালিকানা এখন তুরস্কের হাতে। সৌদি আরবের একটি গণমাধ্যম সংবাদের শিরোনাম ছাপায়, ‘আংকারার হাতে সুয়াকিন তুলে দিল খার্তুম সুদান এখন তুর্কিদের হাতে’।

আফ্রিকা মহাদেশে তুরস্কের লোভের শেষ নেই বলেও মন্তব্য করে আরব পত্রিকাটি। এনিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে সুদানের রিয়াদ দূতাবাসকে বিষয়টিতে বিবৃতি পর্যন্ত দিতে হয়েছে। তারা বলেছে, তুরস্ককে একেবারে সুয়াকিন দিয়ে দেয়া হয়নি,এর মালিকানা সুদানের হাতেই রয়েছে।

আরব বিশ্বকে এনিয়ে আতংকিত না হওয়ার পরামর্শ দেয় সুদান। ৬ জানুয়ারি (২০১৮) মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাসালায় কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করেছে ইথিওপিয়া। এখানে সুদান, ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সীমান্ত রয়েছে; সম্প্রতি ইরিত্রিয়াতে মিশরীয় সেনা পৌঁছানোর পর, ইরিত্রিয়ার সাথে সুদান সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।


ঢাকা, ১০ জানুয়ারী (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।