রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের জনপ্রিয়তা তলানিতে


Published: 2017-11-25 13:16:49 BdST, Updated: 2017-12-17 15:55:28 BdST

শেখ মোঃ ফায়েকুজ্জামান টিটো : বাংলাদেশে চীনের জনপ্রিয়তা অব্যাহতভাবে হ্রাস পেয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তেমন একটা মধুর কখনই ছিলনা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিরোধীতাকারী চীন। তাই স্বভাবিকভাবেই বাংলাদেশের মানুষ চীনকে আপন করে নিতে পারেনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা হয় তাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এর ফলেই শত্রু মিত্র হয় আর মিত্ররা শত্রুতে পরিনত হয় যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মুল কথা হল “Friendship to all malice to none” সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের আধিপত্য ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দু-একবার ছাড়া বাকি সব সময়ই উষ্ণ ছিল। ভারতের প্রাধান্য- পরবর্তী বাংলাদেশে ৯০ এর দশকের পরে চীন কিছু সময়ের জন্য উষ্ণতা উপভোগ করা শুরু করলেও তা পূর্ণতা প্রাপ্তির আগেই থমকে গেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষ গ্রহন করার কারনে বাংলাদেশে চীনের আগের জনপ্রিয় অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেছে।

মানবতাকে বরাবরই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো চীন এগুলোকে তেমন একটা পরোয়া করেনা। ব্যবসা আর ব্যবসায়িক সম্পর্ককেই তারা বড় করে দেখে। বাংলাদেশ তার পার্শ্ববর্তী বৃহৎ দেশগুলোর সাথে যে শক্তির সাম্য (Balance of power) ব্যবস্থা চালু রেখেছে তাতে ভারতই সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত আগ বাড়িয়ে প্রথম দিকে মিয়ানমারের পক্ষ নেবার চেষ্টা করে তাতে ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয় কিন্তু ইদানীং ভারত একেবারেই চুপচাপ বসে আছে। ভারতের এই ভূমিকা নিয়ে আগে যে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছিল, এখন তা অনেকটা কম স্বার্থপরমূলক মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের জনমতে এখন চীনকে অনেকটা ভারতের মতোই মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে , ভারত ও চীন উভয়ই দক্ষিন এশিয়াবিষয়ক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধে লিপ্ত ভারত ও চীন। এক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল তার ঐতিহাসিক রেকর্ড।

এ অঞ্চলের ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ভারতের আচরণ কখনই ইতিবাচক নয়। জনগণ পর্যায়ে কার্যক্রম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ভারতের প্রতি ক্ষোভ দীর্ঘ দিন ধরেই রয়েছে।

নতুন এই সমীকরণে সবচেয়ে বেশি ফায়দা হাসিল করেছে চীন। দক্ষিন এশিয়ার ছোট ছোট অর্থনীতির প্রবল প্রয়োজন মেটাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে এখানে প্রবেশ করেছে চীন। ভারতের ক্ষীণদর্শী অবস্থানের ফলে চীনকে স্বাগত জানানোর পরিবেশ আগে থেকেই তৈরি ছিল। তাদেরকে বরণ করে নেওয়া হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায়।

কিন্তু আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন সময়ে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে চীন দৃঢ়ভাবে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ানোতে বাংলাদেশে চীনা জনসমর্থন দ্রুত কমে গেছে। বাংলাদেশের কঠিন সময়টাতেই চীন অনুপস্থিত। তার মিত্র মিয়ানমার। ফলে রোহিঙ্গা ঘটনার আগে চীনের প্রতি যে সমর্থন ছিল তা হ্রাস পেয়েছে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

ভারতের অবস্থানটি অনেক দিনের হিসাব-নিকাশে গড়ে ওঠলেও চীন এই পথে এসেছে সম্প্রতি। সে মিয়ানমারের সর্বোত্তম রক্ষাকারী এবং মিয়ানমার হলো রোহিঙ্গা ঘটনায় বড় ভিলেন। ভারতকেও মিয়ানমারের সমর্থক মনে হয়েছে। তবে ভারতকে কিছু কম বিশ্বাসঘাতক বিবেচনা করার কারণ হলো মিয়ানমারে দেশটির প্রভাব খুব বেশি নয়। এই বিষয়টি মিয়ানমারের সর্বোত্তম মিত্র চীনের অনুকূলে কাজ করছে না।নতুন মিত্র সন্ধানসহ ওই প্রক্রিয়ায় একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অনুকূলে কয়েক কদম এগিয়ে আছে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা নিয়ে তেমন একটা ভাবছে না।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে আইএস সমস্যা যখন শুরু হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় বাংলাদেশ সরকার ছিল অখুশি। কারণ দেশটি বলেছিল, বাংলাদেশে বড় আকারে সমস্যাটি আছে। বাংলাদেশ ওই দাবি বরাবরই অস্বীকার করে বলেছিল, গুটিকয়েক আইএস কর্মী থাকলেও থাকতে পারে। বেশির ভাগ জিহাদী দেশীয়, তারা জেএমবির মতো স্থানীয় দলের পরিচালিত।বাংলাদেশ আইএস আছে ধরনের গবেষণাকে সমর্থন করতে বা সে যুক্তিকে জোর দিতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভালো পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে অনড় ভূমিকা গ্রহণ করেন, সব গবেষণা এবং গবেষকদের ছুঁড়ে ফেলে দেন।রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক খবর তৈরি করেছে। এসব খবরের সবই বাংলাদেশের পক্ষে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের উদারবাদীদের মধ্যে অং সান সু চির প্রতি নমনীয়তা অনেক। মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার ইচ্ছা ভারতীয় ও চীনা মহলের চেয়ে ইউরোপের মধ্যে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও কানাডার বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করে প্রকাশ্যেই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। মিয়ানমারে পাশ্চাত্যের স্বার্থ কম থাকায় তাদের পক্ষে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। চীনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ভারতের পক্ষেও নয়, যদিও তাদের সম্পৃক্ততা অনেক কম। এটা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিরাট কোনো পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলবে বিষয়টি তেমন নয়, কিংবা সাবেক সমাজতন্ত্রী শিবিরের বিরুদ্ধে পুরনো পাশ্চাত্যের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টি করবে, তা-ও নয়। তবে এটা পরিষ্কার, ছয় মাস আগেও যেমন ছিল, এখন অবস্থা তার চেয়ে অনেক নমনীয়। চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং বিনিয়োগে পাশ্চাত্য বেশ উদ্বিগ্ন থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যু তাদেরকে নৈতিক অজুহাত হিসেবে উঁচু গলায় কথা বলার সুযোগ এনে দিয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধ নামক কেকের ওপর এটা চিনির একটি আবরণ। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো চীনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের একটি উদ্যোগ। চীন অবশ্য এটা পছন্দ করবে না।বাংলাদেশে চীন তার নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে সাথে সাথে বিশ্ববিবেকের কাছেও চীনের যে দায়বদ্ধতা আর মানবতার জন্য চীনের যে মায়াকান্না তা ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হল।


শেখ মোঃ ফায়েকুজ্জামান টিটো
লেকচারার, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ


ঢাকা, ২৫ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।