দর্শন জীবনের জন্য, মানবতার জন্য, পৃথিবীর জন্য...


Published: 2017-11-10 22:08:08 BdST, Updated: 2017-11-19 05:33:12 BdST



জি.এম তারিকুল ইসলাম: বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন দিবসের প্রচলন রয়েছে। তবে উচ্চতর পর্যায়ের পাঠ্য বিষয়ের নামে দিবসের প্রচলন করা বিষয়টা গভীর চিন্তার উদ্রেগ করে। কেন পাঠ্য বিষয়ের নামে দিবস ঘোষনা।

শিক্ষা জগতের মধ্যে আমরা নানা বিষয়ের সন্ধান পেয়েছি এবং বর্তমানে ও নিত্য নতুন বিষয় আমাদের সামনে আসছে যা আমাদের কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও জ্ঞানের জগতের পরিধি বৃদ্ধি করছে। তবে দর্শন বিষয়ের নামে কেন দিবস ঘোষনা এবং পালন করা তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

কেন এই বিশ্ব দর্শন? এর উত্তওে ইউনেস্কো বলেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও অভিযাত্রা বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীলতা, অশান্তি, সন্ত্রাস, অন্যায়, সহিংসতা, অনৈতিকতা, নিরাপত্তাহীনতা মোটেই কমাতে পারেনি। তাই এসব বিষয় থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে দর্শন বিষয়ের শিক্ষা ও অনুশীলন।

কেননা দর্শনের জীবনবোধ নীতি নৈতিকতা, মানবিকতা, নান্দনিকতা, যুক্তিবোধ ও মননশীলতা বর্তমান বিশ্বের নানাবিধ সংকট ও সমস্যা থেকে মানবজাতিকে দিতে পাওে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে সন্ধান। আর এ লক্ষ্যেই জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২০০২ সালের ২১ নভেম্বর প্রথমবার দর্শন দিবস ঘোষনা করে।

 

ইউনেস্কোর তৎকালীন ডাইরেক্টর জেনারেল কইচিরোমা তুসুয়ারা বিশ্ববাসীর প্রতি এক বার্তা প্রেরণ করেন যাতে ফুটে উঠেছে দর্শন বিষয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। তিনি মানবাধিকার, ন্যায়-নীতি, গণতন্ত্রকে সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ কওে বলেন, দারিদ্র্য, বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার, নারী অধিকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি সমকালীন বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা।

এসব সমস্যা সমাধানে বিশ্লেষণের গভীওে প্রবেশ করে দার্শনিক বিশ্লেষণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাই ইউনেস্কোর কাজ। এই দর্শনদিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তরুন সমাজ তথা বিশ্ববাসীর মাঝে যে প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ কওে ২০০৫ সালের ইউনেস্কোর সাধারন সম্মেলনে নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব দর্শন দিবসে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এরপর থেকে ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতি বছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব দর্শনদিবস। এবছর ১৭ নভেম্বর পালিত হবে দিবসটি।
ডশক্ষার বিষয় হিসেবে দর্শন খুবইএকটি প্রাচীন বিষয়। যে দেশ যত ধনী এবং যত শিক্ষিত সেই দেশে বর্তমানে দর্শন বিষয়ের কদর বেশি।

দর্শনকে এসব দেশ সকল শিক্ষার মাতৃরূপে গ্রহণ করেছে।তাই আমরা দেখি যেসব দেশের দর্শন চর্চা যত বেশি সেসব দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবিকতা তত বেশি উন্নত।

Philosophy কে সকল বিজ্ঞানের মাতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। দার্শনিক কোঁতে ও পলসনের মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায়, ‘দর্শন হলো সকল বিজ্ঞানের বিজ্ঞান। ‘দর্শন হলো সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমষ্টি’।

| (Philosophy is the science of all sciences. Philosophy is the sumtotal of all Scientitic Knowledge.)

আর বর্তমান পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে বিষ্ময়কর উত্থান ও প্রসার এর যাত্রা শুরু হয়েছিল দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন ও রেঁনে দেকার্তেও হাত ধরে। বেকনকে তো বলা হয় Prophet of Modern Science. আর গত তিন শতকের বৈজ্ঞানিক যান্ত্রিক ধারনার স্রষ্টারূপে বিবেচনা করা হয় ফরাসী দার্শনিক দেকার্তাকে।

বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার আমাদের জীবনযাত্রা আমূল পাল্টে দিলেও সঠিকভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যদি আমরা কাজে না লাগাই, তাহলে তা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিবে। বিশ্বে সাধিত হবে বিশ্ব ধ্বংসলীলা।

এ ক্ষেত্রে দর্শনের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে মানবজাতির ক্ষাপাবে বর্তমানের দ্ব›দ্ব,সংঘাত, অনিশ্চয়তা, আশান্তিময় পরিস্থিতি থেকে।

দর্শনদিবস ঘোষনার কারণে দর্শনের প্রচার-প্রসার হচ্ছে বা হবে তা নয়। বিশ্ববাসী বর্তমান বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও অস্থিরবিশ্ব থেকে মুক্তি পেতে দর্শনের কাছে সাহায্যে প্রর্থনা করছে। দর্শনের কাছে চাচ্ছে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার দিকনির্দেশনা।

কেননা পৃথিবীতে দর্শন এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়, যেখানে নীতি নৈতিকতা, যুক্তি, নান্দনিকতা, মানবতা, চিন্তা-চেতনা তথা জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়। দর্শন মানুষের আত্মসত্তাকে জাগিয়ে তোলে, প্রশ্ন করতে শেখায় কে তুমি? পৃথিবীতে কি তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য? বিশ্ববরেন্য দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায়,

``Know thyself.Knowledge is virtue.’’

বিষ্ময়, কৌতুহল, সংশয়, জিজ্ঞাসা, প্রয়োজনবোধ এবং জ্ঞানপ্রীতি থেকে দর্শন চিন্তার উৎপত্তি। দর্শনচিন্তার মূলে কাজ করেছে মানুষের মহানমানবিক মূল্যবোধ।

এই মানবিকতা মূল্যেবোধের মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবীতে তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার চেষ্টা কওে আসছে যুগযুগ ধরে। আর দর্শনের তিনটি কাজ-অনুধ্যানমূলক, সমালোচনামূলকও গঠনমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষতার শ্রেষ্ঠত্ব ধওে রাখতে সচেষ্ট।

দর্শন বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারনার অভাবে বিষয়টির অবমূল্যায়ন এবং অপপ্রচার হয়ে থাকে। বিশ্ব দর্শন দিবসের প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব ও তাৎপর্য সাধারন ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যে জীবনের সর্বস্তরে নৈতিকতা প্রয়োগ ও পরিব্যাপ্তির ধারনা কে প্রসার ঘটাবে বলে আমরা আশা রাখি।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মানব জাতির বিকাশের ধারায় যত সভ্যতার সংকট সামনে এসেছে তার মূলে রয়েছে মূলত নীতি নৈতিকতার সংকট। মানবজীবনে সকল প্রকার দুঃখ দুর্দশার মূলে রয়েছে নৈতিক সংকট।

সভ্যতার সঙ্কট, মানব সঙ্কট থেকে উত্তরনের পথ বিজ্ঞান প্রযুক্তি, পারমানবিক অস্ত্র, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা অফুরন্ত সম্পদ দিতে পারবেনা।
এই সঙ্কট থেকে উত্তরনের একমাত্র পথ নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষাব্যতীত একদিকে যেমন বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও সাফল্য কোন ভাল ফল বয়ে আনবেনা, অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর অফুরন্ত সম্পদ মানুষের কোন কাজে আসবেনা।

তাই পৃথিবীর সর্বস্তরেসুখ, শান্তি ও কল্যানের জন্য মানবজাতিকে নৈতিক শিক্ষার মাতৃভূমি দর্শনের কাছে আসতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে, এখানে পাশ্চাত্যেও প্রভাবশালী দার্শনিক এফ এইচ ব্রাডালির বক্তব্য উল্লেখ করা যায়।

তিনি তাঁর Appearance and Reality গ্রন্থেও ভূমিকাতে এরূপ কথা বলেছেন, মানুষ যেদিন তার শ্রেষ্ঠত্ব, বিবেক, মর্যাদা, স্বতন্ত্রতা হারিয়ে অমানবিক ও পশুর পর্যায়ে নি:পতিত হবে সেদিনই সে কেবল দার্শনিক জ্ঞান ও সত্য অনুসন্ধানের মহৎ পথ থেকে নিজেদের পরিহার করতে পারবে।

ব্রাডলির এই বক্তব্য মানবজাতিরজন্য একটা বড় ম্যাসেজ। কেননা জ্ঞানও সত্যের অন্বেষণ ছাড়া পৃথিবীর বুকে মানবজাতির টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই একথা নিশ্চিত কওে বলা যায় উন্নত মানবিক জীবনের যৌক্তিক, নৈতিক ও নান্দনিক দিকের অনুসন্ধানের জন্য দর্শন শিক্ষা অপরিহার্য।

আমাদের সমাজব্যবস্থা থেকে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বিবেকবোধ, স্মৃতি, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়।

সমাজব্যবস্থা যেন অসচেতন ও অসংবেদনশীল হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছে তার মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। ব্যক্তি মানুষ দিনদিন দয়া, মায়া, মমতা, ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি, শ্রদ্ধা, বন্ধন, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছে। শুধু ব্যক্তি মানুষই নয়, বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান যেমন- প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক সংগঠন।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র তথা মিডিয়া জগত, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুলো ভেতরে ভেতওে তার নৈতিক চরিত্র হারিয়ে অসাঢ় হয়ে পড়ছে। সঠিক শিক্ষা তথা নৈতিকতা সম্পৃক্ত মানবিক আদর্শিক শিক্ষার অভাবে এমনটি হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এরূপ বাস্তবতা থেকে উত্তরনের পথ হবে দর্শনের শিক্ষাগ্রহণ অনুশীলন ও তার প্রয়োগ।

দর্শনবিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক দিক থেকে খাদ্য, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসায়, প্রযুক্তিক দিক থেকে প্রাচুর্য আসবে কিন্ত ুকখনো সুখ বা শান্তি আসবেনা। তাই একটি দেশ বা সমাজের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক বিষয় দর্শনের বিষয়ের অন্তর্ভূক্তি, অনুশীলন ও প্রয়োগ আজ সময়ের দাবী।

পরিশেষে বলা যায় দর্শনের বিষয়বস্তু ও নির্দেশের প্রতিমানুষের মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। ইউনেস্কো বুঝতে পেরেছে যে দর্শনের বিষয়বস্তুর চর্চা ও প্রসারের মাধ্যমে আসবে মানবজাতির প্রকৃত মুক্তি।

সে লক্ষ্যেই ইউনেস্কো বলছে সকল দেশের সকল মানুষের জন্য বিশ্ব দর্শন দিবস। তাই আজ সময় এসেছে দর্শনের মর্মবানী উপলব্ধি কওে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত কওে মানব কল্যাণের মহান পথে অগ্রসর হওয়া।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শনবিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

E-mail: gmtariq@yahoo.com

 

ঢাকা, ১০ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।