আমি সামাজিক মাধ্যমে আছি, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল!


Published: 2020-06-23 15:37:04 BdST, Updated: 2020-08-06 06:26:16 BdST

অসীম কুমার পাল: আমার এই লেখার শিরোনামটি ফরাসি দার্শনিক রেনে ডেকার্তের বিখ্যাত উক্তি থেকে অনুপ্রাণিত; যেখানে ডেকার্ত বলেছিলেন, “আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল”। এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে ডেকার্ত আসলে বলতে চেয়েছেনঃ “যখন আমরা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা কিংবা সন্দেহ করতে পারি, তখন আসলে আমরা অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেই।“ অর্থাৎ, আমরা চিন্তা করতে পারি বলেই আমরা অস্তিত্বশীল। আমি আসলে এই দার্শনিক মতবাদের মূল বিষয়কে ভিত্তি করে সামাজিক মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরার প্রয়াস করেছি।

প্রচলিত আছে, জীবনে জন্মদিন আসা মানে আমরা আরো বৃদ্ধ হচ্ছি আর মৃত্যুর দিকে আরো ধাবিত হচ্ছি যদিও এই জন্মদিনে আমাদের প্রিয় ও কাছের মানুষ এসে আমাদের বরং আরো দীর্ঘজীবি হবার আশীর্বাদ করে যায়! অনেকটা বিদ্রুপের মতো শোনায় না? কয়েকদিন আগে আমার জন্মদিন গেছে, মানে আমি বৃদ্ধ হবার পথে আরো এগিয়ে গেছি। যাই হোক, জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একাউন্ট খোলার পর থেকে প্রতি বছর যেমন আমার বন্ধুর তালিকার পরিধি বেড়েছে, তেমনি, আমার জন্মদিন যেদিন আসে, সেদিন আমার ফেসবুক ওয়াল ও মেসেঞ্জার আমার বন্ধু তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অভিনন্দন ও শুভাশিসে অনেকটাই প্লাবিত হয়ে যায়। এদের মধ্যে যেমন আমার পরিচিত-প্রিয় ব্যক্তিরা আছেন, আবার অনেকে আছেন যাদের সাথে কেবল ফেসবুক নামক এই ভার্চুয়াল পৃথিবীতে পরিচয়, বাস্তবে কখনো দেখা হয় নি। তবে তাদের অভিনন্দন ও শুভাশিস আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত করে নতুন করে জীবনকে উপভোগ করতে ও নতুন কিছু শুরু করতে।

তবে অন্য আর বছরগুলোর মত এ বছরের জন্মদিনটি ছিল না। গত ২৩ মে থেকে ব্যক্তিগত কারণে আমি আমার ফেসবুক একাউন্ট নিস্ক্রিয় (ডিএকটিভেটেড) রেখেছিলাম যদিও যোগাযোগের জন্য মেসেঞ্জার অ্যাপটি খোলা রেখেছিলাম। আমার ফেসবুক একাউন্ট নিস্ক্রিয়তার মধ্যে আমার জন্মদিন আসে। এর ফলে, অন্য বছরে যেরকম অভিনন্দন ও শুভাশিস পাওয়া যায়, সে তুলনায় এ বছর ফেসবুক একাউন্ট নিস্ক্রিয়তার কারণে আমার জন্মদিনে সেরকম আর অভিনন্দন ও শুভাশিসের ঢলে ফেসবুক ওয়াল প্লাবিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। যদিও আমার ফেসবুক মেসেঞ্জার অ্যাপ খোলা ছিল যেখানে অন্যবারের মত জন্মদিনের অভিনন্দন ও শুভাশিসের বন্যা হবার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে বন্যার পরিবর্তে খরা দেখা দেয়।

এমনকি, আমার মোবাইল ফোনের মেসেজের ইনবক্সও খালি থাকত যদি না আমার দুইজন বন্ধু আমাকে জন্মদিনের অভিনন্দন ও শুভাশিস না জানাতো! এর অর্থ কি এমন যে সামাজিক মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্নতা মানে সবার মনের আড়ালে চলে যাওয়া? আমার এই অভিজ্ঞতা অন্তত সেইসব ব্যক্তিদের বিস্মিত করতে পারে যারা বাস্তব জীবন আর ভার্চুয়াল জীবনকে এক করে ফেলেছে আর ভার্চুয়াল পৃথিবীতেই থাকতে ও সামাজিকতা পালন করতে পছন্দ করে।

আসলে আমার এবারের জন্মদিন আমার জন্য নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। আমার উপলব্ধি এই যে, এই ভার্চুয়াল পৃথিবীতে আমাদের পরিবারের গণ্ডির বাইরে খুব কম ব্যক্তি আছে যারা আমাদের জন্মদিন মনে রাখে। অবশ্য, যারা প্রভাবশালী কিংবা বিখ্যাত, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা হতে পারে। আমার পরিচিত যারা আছে তাদের সাথে কথা বলে এবং আমার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে যেটা বুঝি, তা হলো, এই ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দারা আসলে ফেসবুক নোটিফিকেশনের উপর নির্ভর করে থাকে। যখন ফেসবুক নোটিফিকেশনে কারো জন্মদিনের তথ্য আসে, তখনই কেবল জানতে পারে আজ কার জন্মদিন। তবে, জন্মদিনে অভিনন্দন জানানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে দেখা হয় সেই ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের বেড়াজাল কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্টতা।

কেবল জন্মদিনে অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রেই নয়, আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে ঘটে যাওয়া নানাবিধ কার্যক্রম ও অর্জনের ক্ষেত্রেও উপরিউল্লেখিত ব্যাপারগুলো ঘটতে পারে। ধরুন, আপনি নতুন কোন চাকরি পেয়েছেন অথবা চাকরিতে পদোন্নতি পেয়েছেন। এখন ফেসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অর্জনগুলো যখন শেয়ার করবেন, তখনই কেবল আপনার বন্ধু তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের থেকে (অবশ্যই তাদের প্রিয়ভাজন কিংবা স্বার্থসংশ্লিস্ট হবার সাপেক্ষে) নানাবিধ কমেন্ট ও লাইক পেতে পারেন। এ ব্যাপারে আমার আরো অভিজ্ঞতার কথা এখানে শেয়ার করতে চাই।

আজ থেকে সাত বছর আগে যখন আমি একটি ইংরেজি দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি, তখন ফেসবুকে দেয়া পোস্টের কল্যাণে আমার বন্ধুতালিকায় থাকা সবাই জানতে পেরেছিল। একইভাবে, এরপরে একটি ব্যাংকে যখন যোগ দেই, সেই তথ্য ফেসবুকে দেয়া পোস্টের কারণে সবাই জানতে পারে। তবে, যখন আমি সহকারী পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে নিয়োগপত্র পেলাম এবং যোগদান করলাম, তখন আর ফেসবুকে সেই ব্যাপারটা জানানো হয় নি। কেবল আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, কিছু কাছের ব্যক্তিবর্গ আমার যোগদানের ব্যাপারটা জানতেন। যাই হোক, একদিন ইউজিসি অফিসে আমার পরিচিত ও একই এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হলো। তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

তিনি ইউজিসিতে এসেছিলেন তার বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত সনদটি সমতা করার জন্য। মজার বিষয় হলো, তখন সেই সমতা বিধানের প্রশাসনিক কাজের একটি অংশ আমার উপর অর্পিত ছিলো। তিনি আমাকে দেখে অবাক হলেন কেননা, তিনি জানতেন যে আমি ব্যাংকেই কর্মরত আছি। আবার যখন বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে আমার নির্বাচিত হবার খবরটি ফেসবুকে শেয়ার করলাম, তখন ফেসবুকের ওয়াল ও মেসেঞ্জার এবং মোবাইল ফোনে অভিনন্দন বার্তায় পূর্ণ হতে লাগলো। এবার আর কারো অজানা থাকলো না যে আমি বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে নির্বাচিত হয়েছি। সুতরাং, এটা বলা বাহুল্য হবে না যে, জন্মদিনের অভিনন্দন পাবার মত সাফল্য ও অর্জনের খবর ফেসবুকে শেয়ার না করা পর্যন্ত বুঝি তা সবার কাছ থেকে স্বীকৃতি না পাবার মতোই।

একইভাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে অনেকের কাছে বন্ধু ও পরিবারপরিজনদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ব্যাপারটা অনেকটাই ভুলে যাবার দশা হয়েছে। এ কারণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য শেয়ার, কাউকে অভিনন্দন জানানো এমনকি কারো মৃত্যু খবরে শোক জানানোটাও এখন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, আড্ডার নামে পাশাপাশি বসেও অনেকে একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ রেখে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লিক করা, কমেন্ট করা কিংবা পোস্ট শেয়ার করাতে বেশি আগ্রহ দেখায়।

আরো অবাক করা বিষয় হলো, এখন অনেকে আছে যারা নিজেদের সামাজিক ও পেশাগত পরিমন্ডলের কারো জন্মদিনের কথা কিংবা কোন অর্জনের কথা মনে না রাখলেও অন্য পরিমন্ডলে বিশেষ করে যারা সমাজে ও পেশায় প্রভাবশালী অথচ তাদের সাথে সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, তাদের ব্যাপারে খুব আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশেষ করে, সেইসব প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ কোনকিছু অর্জন করলে কিংবা তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে দেখা যায় কিভাবে অভিনন্দন বার্তার জোয়ার নামে ফেসবুকে। এমনকি যদি নিজেদের সামাজিক ও পেশাগত পরিমন্ডলের কারো জন্মদিন কিংবা কোন অর্জনে অভিনন্দন জানায়, তবে দেখা যাবে, সেই ব্যক্তিদের অবস্থান ও প্রভাবের উপর তা অনেকখানি নির্ভর করে।
মানে, হয়ত, ব্যক্তিগত ভাললাগার সাথে সাথে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা এখানে ভূমিকা পালন করে। এই প্রবণতাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্তিত্বের সংকটের সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ, মানুষজন নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা বাস্তবে নিজেদের অস্তিত্বকে আরো শক্তিশালী করার প্রবৃত্তে এমন অসম আচরণ করে কিংবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়।

আমার মনে হয়, এখন এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দার্শনিক ডেকার্ত যদি থাকতেন, তাহলে হয়ত তিনি প্রশ্ন করতেনঃ আমরা যদি যোগাযোগমাধ্যমে না থাকি, তাহলে কি আদৌ আমাদের অস্তিত্ব আছে?” এজন্য, ডেকার্তের বিখ্যাত উক্তিকে নতুন মাত্রায় ভাবার প্রয়াস করিঃ “আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছি, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল। আমি এই সমাজে প্রভাবশালী, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল। আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার পোস্টে ক্লিক করি, কমেন্ট করি, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল। আর আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিস্ক্রিয় থাকি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে যাই, তখন আমার অস্তিত্ব লীন হয়ে যায়!”

লেখক:
একজন ৩৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য এবং প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, পাবনা। বর্তমানে, কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি)-এর আওতায় নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসে এমএ ইন এডুকেশন কোর্সে অধ্যয়নরত।

ঢাকা, ২৩ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।