চারঘাট থানাটিই হতে পারত দেশের গর্ব


Published: 2020-04-18 11:59:25 BdST, Updated: 2020-09-23 09:37:05 BdST

শাহাদত হোসেন: বাইরে থাকলেও সবসময়ই গ্রামের কথা ভাবি। কিভাবে নিজ এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে, তার জন্য চিন্তা মাথায় থাকে সর্বদায়। যেখানে বড় হয়েছি, যার আলো বাতাস, মানুষের ভালোবাসা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে, তার ভাবনা আসাটাই স্বাভাবিক।

এলাকায় গেলে দেখি অনেক পরিবর্তন হয়েছে সেখানকার। গ্রামের ভেতর দিয়ে পাকা রাস্তা বাড়ির দোড়গোড়ায় পৌঁছে গেছে। আগের কাঁচা বাড়ি আর নেই, দালান বাড়ি বিশেষ করে ফ্ল্যাট বাড়ির সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে চলেছে। মানুষের আয় বেড়েছে অনেক। বাড়িতে বাড়িতে রঙিন টেলিভিশিন, কম্পিউটার রয়েছে অনেক বাড়িতে। শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। মাছ মাংসের বাজার রমরমা। বালুমহলের সাথে জড়িত ব্যবসায়ী এবং শ্রমিক শ্রেণি অনেক ভালো আছে।

এক হিসেবে দেখা যায়, বাৎসরিক প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেন হয় এই মহলে। চাকুরিজীবির সংখ্যাও বেড়েছে। কৃষিভিত্তিক (মাছ, ফসল, ফল) ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেড়েছে। যেখানে পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়ি করে পথ চলেছি ছোট বেলায়, সেখানে এখন বাড়িতে বাড়িতে মোটরসাইকেল। অটো রিক্সা ভ্যান, ইজি বাইক আছে চলাচলের জন্য। বাড়ির গেটে ৫ মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, শহরের মতো সেবা গ্রামেও পায়। এ পুরো চারঘাট থানারই চিত্র। মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সর্বদায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন চারঘাট বাঘার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে। তাহলে তো সবকিছু ভালোই আছে? আর চিন্তা কিসের!!!

হ্যাঁ, চিন্তার কিছু বিষয় আছে বটে। আমরা যে উন্নয়নটুকু দেখতে পাচ্ছি তা একপ্রকার মোহ, বাহ্যিক উন্নয়ন, ঘুনে ধরা উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন না। যে উন্নয়নের কথা সারা দেশ ভাবছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখছেন এটা ঠিক সেই উন্নয়ন না। যে উন্নয়ন হলে আমরা সভ্য উন্নত দেশের মানুষ হতে পারব, এটা সেই উন্নয়ন না। আমরা যে পরিবর্তনের কথা বলছি, তা হলো স্থায়ী পরিবর্তন। এইযে যে উন্নয়ন আমরা দেখলাম, এ জন্য অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের। কি রকম!! আমাদের এই সকল ব্যবসার সাথে আর একটি ব্যবসা যুক্ত হয়েছে, তা হলো মাদক ব্যবসা। পুরো চারঘাটের চিহ্নিত সর্বোচ্চ ১০০ টি পরিবার এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে যারা চারঘাট থানার মোট পরিবারের (প্রায় ৫১৬৯৭ টি) মাত্র .২% (দশমিক দই শতাংশ)।

অবশ্য এই ব্যবসার সাথে জড়িত না হলেও এর প্রভাব পড়ছে সবস্তরেই। একসময় যখন লোকচক্ষুর আড়ালে সীমিত পরিসরে মাদক ব্যবসা চলত, এখনকার মতো খোলামেলা নয়, তখন ১৬-৩০ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা পড়ার টেবিলে বসত। তারা এই পড়াকেই ভাগ্যোন্নয়ের চাবিকাঠি মনে করত। সৎ অসতের ধারণাটি প্রবল ছিল। অবৈধ কোন কাজ করে অর্থ উপার্জনের সর্বগ্রাসী ধারণা তখনো পেয়ে বসেনি আমাদের। তখন প্রতি বাড়ি তো দূরের কথা, একটি গ্রামে যে কয়জন মাদকসেবী ছিল, তাও হাতে গোনা। সবাই তাদের খারাপ চোখে দেখত। ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি একটি সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যারা এখন সমাজের, রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। তখন অবশ্য এত ভোগ বিলাসের সামগ্রী আমাদের ছিল না। তবে শান্তি ছিল। রাতে ভালো ঘুম হত।

এখন, প্রতি বাড়িতেই মাদকসেবী সন্তান। অবাধ্য আচরণ, চোখ লাল। ভালো করে কথাও বলতে জানে না। শুধু টাকার নেশা। এই টাকার জন্য যত অপকর্ম করা সম্ভব, সবই করছে। রাতে ছেলে বাড়ি ফিরছে গভীর রাতে। পড়ার টেবিলে আর কাওকে পাওয়া যায় না। চিন্তিত বাবা মা। বয়স ৩০ হতেই বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, কর্মক্ষমতা, চিন্তার শক্তি সবই লোপ পাচ্ছে এই ভবিষ্যত প্রজন্মের। সংসার টিকছে না, নানা অশান্তি প্রতিনিয়ত লেগেই আছে। আবার পুলিশ প্রশাসনের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

যে প্রজন্ম স্বপ্ন দেখত বড় হব, মানুষের মতো মানুষ হব, সেই প্রজন্ম আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত ক্ষণিক উন্নয়নের আলোর নাচনে। এক হিসেবে দেখা যায়, চারঘাট উপজেলায় প্রতিদিন ৫০ লক্ষ টাকার নানা প্রকার মাদকের লেনদেন হয় যার বাৎসরিক হিসেবে ১৮০ কোটি টাকা। এই টাকার লেনদেন সীমাবদ্ধ সেই ১০০ টি পরিবারের মধ্যে। এর ছিটে ফোটা পায় সাধারণ দিনমজুররা যারা এটা দিয়ে কোনমতে সংসার সামলানোর চেষ্টা করে।

এই সীমিত সংখ্যক মানুষ বিশাল অঙ্কের টাকার লেনদেনের সাথে জড়িত থাকায় তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, যারা মনে করছে তাদের কাছে পুলিশ, প্রশাসন, আর ৯৯.৮% মানুষ কিছুই না। সবাইকে জিম্মি করে পুরো এলাকার ভবিষ্যৎ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা হারাব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রাম, দেশ হারাবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। সারা দেশে চারঘাট উপজেলা চিহ্নিত হবে মাদক সাম্রাজ্য হিসেবে। এ কলঙ্কের ভাগ নিতে হবে সর্বস্তরের মানুষকে। কিন্তু এই থানাটিই হতে পারত দেশের গর্ব। অন্যায়, অবৈধ পন্থা কখনই শক্তিশালী হতে পারে না।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
"মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে
যার ভয়ে তুমি ভীত, সে অন্যায়, ভীরু তোমা-চেয়ে
যখনি জাগিবে তুমি, তখনি সে পলাইবে ধেয়ে।"

''চারঘাট থানায় মাদক সন্ত্রাস ও পরিত্রাণ ভাবনা''

কিভাবে আমরা মাদকের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে পারি তা নিয়ে বিস্তর পরামর্শ আছে, মান অভিমান আছে। দিব্যবাণী হয়ে ঝরে পড়বে কোন সমাধান, না সমাধান আমাদের হাতেই আছে, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কে শুরু করবে আগে, তুমি না আমি।

সহজ করে ভাবি। কে বেশি শক্তিশালী, সরকার না জনগণ? বলবেন, রাষ্ট্রীয় পাওয়ারের কাছে কিছুর তুলনা হয় নাকি। ও, তাতো ঠিকই। আসলে ভুলতে বসেছি, কারা সরকারের জন্ম দেয়! এই জনগণ এখন এদেশে ভোট দিয়ে সরকার বানায়, বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এখানে কোন বিতর্ক নেয় যে, জনগণের টাকায় সরকার চলে। আজ যারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে বলে গর্ব অনুভব করে, তারা কিন্তু এই খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় বেতন পাই, পেতে পারে নানা সুযোগ সুবিধা। এসব সুযোগ সুবিধা আসলে দেয়া হয়েছে এই জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করতে।

কিন্তু বিধি বাম, কিছু অসাধু কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধির কারণে কষ্ট পায় হাজারো মানুষ। ও হ্যা, বলছিলাম মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে কিভাবে সমাজকে রক্ষা করা যায়? সরকারি সকল প্রতিষ্ঠান থাকতেও কেন মাদক নির্মুল হচ্ছে না বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের পরেও কিভাবে একটি এলাকা মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে উঠে!! মাদকের বিরুদ্ধে সকল দেশপ্রেমিককেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে এবং

১। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মাদকের বিরুদ্ধে প্রচারণা বাড়াতে হবে

২। প্রতিটি ওয়ার্ডভিত্তিক এলাকার উন্নয়নের জন্য উন্নয়নকামী যুবসমাজকে একত্রিত হতে হবে

৩। গণস্বাক্ষর নিয়ে চিহ্নিত মাদকব্যবসায়ীর তালিকা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে পৌঁছাতে হবে, এক কপি বিজিবি ক্যাম্পেও দিতে হবে

৪। বাইরের মাদকসেবীদের এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের দ্বারা গ্রামে প্রবেশের পথে চৌকি বসাতে হবে, কোন অপরিচিতকে এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।

৫। সমাজের সর্দার, মসজিদের ইমাম সাহেবকে মাদকবিরোধী প্রচারণায় সম্পৃক্ত করা

৬। নিয়মিত খেলাধুলা, সুস্থ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুবসমাজকে ব্যস্ত রাখা

৭। ‘’মাদক নয়, ফুল ভালোবাসি’’ এই লিখা টি শার্ট জনগণের মাঝে বিলি করা

৮। কোন মাদক ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায় ব্যবসা ছেড়ে দিলে তাকে প্রকাশ্যে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো এবং ৬ মাস অবধি তার পরিবারের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করা

৯। বর্তমান এলাকার যারা মাদকসেবন করছে, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা

১০। আর্থিক সহযোগিতার জন্য জনপ্রতিনিধি এবং এলাকার সমর্থবানদের এগিয়ে আসা

এরকম আরও উপায় ভাবা যেতে পারে। তবে মনে প্রাণে সৎ হতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এ সরকারের আছে, বিশ্বাস করি। সুস্থ সবল জাতি গঠনই হোক আগামীর অঙ্গীকার।

লেখক : মোঃ শাহাদত হোসেন
সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
লালমনিরহাট সরকারি কলেজ

ঢাকা, ১৮ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আরআর//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।