আমরা সচেতন হবো ঠিক মরার এক ঘণ্টা আগে


Published: 2020-03-24 10:54:28 BdST, Updated: 2020-08-14 11:39:44 BdST

মোঃ রেজোয়ান হোসেনঃ সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস যখন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ঠিক সেই সময়ে আমরা নিশ্চিন্তে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়েছি। যখন বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে নিউজ হয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি স্ক্যানার এর মধ্যে দুটিই নষ্ট তখন আমরা সেটাকে গায়ে লাগায়নি আর এখন সেই বিমানবন্দর থেকে কোন প্রবাসী এলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন এ থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। তখন যদি আমরা এর যথাযথ ব্যবস্থা নিতাম তাহলে আজ এত কড়াকড়ি নিয়মের দরকার হতো না। সারাদেশে কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশনে অসংখ্য মানুষ থাকলেও এখনো পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার যন্ত্রপাতি পৌঁছে দেওয়া হয়নি। যার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা নিজেরাও জানেন না যারা তারাও রোগীদের থেকে সংক্রামিত হচ্ছেন কিনা।

যখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি স্ক্যানার এর দুটিই নষ্ট ছিল তখন সেখানে কি ঘটেছে/ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেখানে কি ঘটতে পারে সেটা সকলেরই জানা। মাত্র একটি স্ক্যানার মেশিন দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বিদেশি এবং প্রবাসীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। অন্য সব জায়গার মতো হয়তো সেখানেও কিছু টাকার বিনিময় মিলেছে মুক্তির সার্টিফিকেট। কিছু টাকা দিলেই হয়তো তাকে সম্পূর্ণ সুস্থতার একটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। অথচ তখনই যদি আমরা খুব কড়াকড়িভাবে বিমানবন্দর সুরক্ষিত করতে পারতাম তাহলে আমাদের আজ এই মহামারীর মুখোমুখি এভাবে হতে হতো না। প্রবাসীরা দেশে এসে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের সংস্পর্শে এসে পরিবার-পরিজন এলাকাবাসী এবং অনেক সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এখন আমাদের প্রশাসন তাদেরকে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করছে। পুলিশ এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসন গিয়ে তাদেরকে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খুঁজছে এবং সতর্ক করছে। ঠিক যেমন চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।

সারা বিশ্ব যখন করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে তখন আমাদের দেশের বিমান প্রতিমন্ত্রী বলছেন এপ্রিলে গরম পড়লে করোনা ঠিক হয়ে যাবে। তাই যদি হতো তাহলে উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থ হয়ে যেত। রাজনৈতিক নেতারা তাদের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন অথচ তারা কি বলছেন সেটা নিজেরাও জানেন না। তবু তারা বলছেন এবং বলা অব্যাহত রেখেছেন। কেউ করোনাভাইরাসকে তাদের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সেই শত্রুর মোকাবেলা করবেন বলে লম্বা বুলি আওড়াচ্ছেন অথচ নিজেও এখন পর্যন্ত সচেতন নয়, হরহামেশাই ঘুরে বেড়াচ্ছেন জনসমাবেশে। কেউ আবার বলছেন শক্ত হাতে মোকাবেলা করবেন অথচ প্রস্তুতির বেলায় শূন্য। এখনো পর্যন্ত দেশের অনেক হাসপাতালগুলোতে পৌছায়নি করোনাভাইরাস পরীক্ষার সরঞ্জামাদি। কে বা কারা এই করোনাভাইরাস রোগীদের সেবা করবেন, সেটা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। করনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। কিন্তু ঠিক করে দেয়া হয়নি কে বা কারা সেই ওয়ার্ডটি পরিচালনা করবেন। সেখানে পৌঁছানো হয়নি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি। শুধু খুলে ওয়ার্ড খুলেই দায়িত্ব শেষ।

যখন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সারাবিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে তখন আমাদের দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন করোনাভাইরাস মারাত্মক রোগ নয়, ছোঁয়াচে রোগ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন করনা মারাত্মক রোগ নয়, এটি সর্দি-জ্বরের মতো। আমাদের মন্ত্রীদের এইসব মন্তব্য দেওয়ার আগে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ, তারা কি বলছেন। সবকিছুতেই প্রথমেই আমরা সরকারের দোষ বলেই চালিয়ে দেই। কিন্তু সরকার কারা। জনগণ নিয়েই তো সরকার গঠিত। সেই আমরা জনগণ কতটুকু সচেতন? প্রতিদিন টেলিভিশনে দেখছি বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে। আমরা কতটুকু সচেতন হয়েছি? সচেতনতামূলক কার্যক্রম হিসেবে কি কর্মসূচি হাতে নিয়েছি? কেউ মাস্ক কিনে স্টক করে রেখেছি, কেউ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি করেছি। আবার কেউবা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এই ভয়ে আগে থেকেই ১০০ জনের খাবার একা কিনে রেখেছি। এইভাবে যদি ৫ জন মানুষও ১০০ জনের খাবার কিনে রাখে তাহলে তো ৫০০ জন এমনিতেই মারা যাবে। সরকার কোনটা সামলাবে? আপনাদের এই খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি? নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণ? নাকি কোন ভাইরাস মোকাবেলা?

সরকারের পক্ষ থেকে গণ জমায়েত নিষিদ্ধ করার পরেও কেউ কেউ সরাসরি ইতালি থেকে ফিরে যোগ দিচ্ছেন মহাসমাবেশে। করোনাভাইরাস যেন না আসে সেজন্য এলাকার সবাই মিলে চাঁদা তুলে মিলাদ মাহফিল করা হচ্ছে। মসজিদ বন্ধ করার জন্য চায়ের দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আলোচনার ঝড় উঠছে। কিন্তু যে কাপে চা খাচ্ছে, সেই কাপটি জীবাণুমুক্ত কিনা সেটা দেখবে কে? একটা সংকটের মুহূর্তে সবাই ব্যস্ত নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য। আমরা সেই দেশে বাস করি যেখানে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার থেকে ২৬ টি সিলিং ফ্যান চুরি হয়। আমাদের দেশের লকডাউন অমান্য করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হয় এবং সেটি বন্ধ করতে উল্টো জরিমানা করা হয়। আমরা সেই জাতি যারা প্রবাসীরা বিদেশ থেকে এলে কোনরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে সুস্থতার সার্টিফিকেট দিয়ে বাড়ি ফেরার অনুমতি দিয়ে থাকি এরপর লোকটি যখন বাড়িতে পৌঁছায় তখন পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন গিয়ে পুনরায় তাদের খুঁজে বের করি। এদিকে তারাও আবার আত্মগোপন করে থাকতে পছন্দ করেন। কি অদ্ভুত- তাইনা? বিমানবন্দর থেকে কেন তাকে কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বা ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে না রেখেই ছাড়া হল? এরপর বাসায় পৌঁছানোর পরে কেন তার বাসায় গিয়ে তাকে খুঁজে বের করা লাগবে? আর সেই প্রবাসী বা কেন আত্মগোপন করে থাকবে। তাকে তো আর মেরে ফেলা হচ্ছে না। তাকে জেল হাজতে রাখা হচ্ছে না। তার কাছ থেকে যেন তার পরিবারের লোকজন এবং আশেপাশের লোকজন নিরাপদ থাকতে পারে সেজন্য তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হচ্ছে। তাহলে এখানে দোষ কার। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের, নাকি পুলিশ প্রশাসনের, নাকি প্রবাসীর? নাকি সব দোষ সরকারের?

এবারে কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশন নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বেশিরভাগ বাঙালি জানে না কোয়ারেন্টাইন এর বাংলা অর্থ কি এবং আইসোলেশন এর বাংলা অর্থ কি। কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশন দুটোই বিদেশি শব্দ। বাঙালির জন্য সহজবোধ্যভাবে গৃহবন্দী বা নজরবন্দি শব্দ ব্যবহার করা কি ভাল ছিল না। তাহলে আমজনতার বুঝতে সুবিধা হতো। কাউকে হোম কোয়ারেন্টাইন এ থাকতে বলা হল, এখন সে যদি এটার মানে না বুঝে তার কি করা উচিত, তাহলে সে কিভাবে নিজেকে সুরক্ষা করবে, সে তো জানেই না তাকে কি করতে হবে। তাহলে ফলাফল কি দাঁড়াবে? এরপর আসে লকডাউন। যদি কারফিউ বা ১৪৪ ধারা শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় তাহলে হয়তোবা আমজনতার জন্য ব্যাপারগুলো বোধগম্য হতো।

চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদন দেখছিলাম, করোনা ভাইরাসকে তারা কেউ ভয় করে না। এটি তারা তাদের স্থানীয় ভাষায় বেশ গর্ব সহকারে বলছিল। কেউবা আবার ধর্মের দোহায় দিচ্ছিল। আল্লাহর রহমতে তাদের চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস হানা দিতে পারবে না। অথচ তারা জানে মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান সৌদি আরবে করোনাভাইরাসের প্রকোপে কি অবস্থা। আবার অনেকেই বলছেন তাদের বাইরে যেতেই হবে কর্ম করে খেতে হবে। করোনা আক্রান্ত হলে ঘরে বসে মরবে, আর বাইরে না বের হলে, না খেয়ে মরবে।

আমরা সেই বাঙালি যারা দেশে মহামারীর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পরে সেই ছুটিতে কক্সবাজার ভ্রমণে চলে যায়। সেখানে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় হয়। পর্যটন স্থানগুলো ফাঁকা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠে নামতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে যেন সেখানে গণজমায়েত না হয়। একজনের থেকে ভাইরাস অন্যজনের কাছে না ছড়ায়। কিন্তু আমরা সেটাকে একটি উপলক্ষ করে ছুটি হিসেবে নিয়ে সেই ছুটির সর্বোত্তম উপভোগ করার জন্য দর্শনীয় স্থান গুলোতে ভিড় জমাচ্ছি। তাহলে আমরা কি নয় বেয়াক্কল নয়? যমুনা টেলিভিশনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে ২১শে মার্চ করোনাভাইরাস নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছেন মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার পেছনে ৩৭ যখন মানুষ গাদাগাদি করে দাড়িয়ে আছে এবং একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করছেন, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আপনি করোনা ভাইরাসের আপডেট নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছেন যেখানে আপনার পেছনে ৩৭ জন গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে ঠিক কি আমাদের সচেতনতা এবং কি আমাদের করণীয়। যিনি করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা দিবেন তিনি এখনো পর্যন্ত সচেতন হন নি। আরও একটি খবর বেশ গুরুত্বের সহকারে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে প্রচার হয়েছে ২১শে মার্চ সকালে রাজবাড়ী জেলায় করোনাভাইরাস নিয়ে বিতর্কের জের ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছে। এরা কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ে তর্ক-বিতর্কের পর সংঘর্ষে মারা গেছে। মিরপুরে একটি বাড়িকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে আর সেই বাড়িটিকে দেখতে সাধারণ উৎসুক জনতার উপচে পড়া ভিড়।

অনেক হয়েছে সার্কাস। এবার বন্ধ করুন। আসুন আমরা এখানেই থামি। না হলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে আমাদের। নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও সচেতন করুন।

লেখক: মোঃ রেজোয়ান হোসেন
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, গোপালগঞ্জ।

ঢাকা, ২৪ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।