'আন্তর্জাতিক গণিত দিবস'


Published: 2020-03-13 19:09:07 BdST, Updated: 2020-04-11 00:13:17 BdST

ড. মোঃ শহীদুল ইসলামঃ রহস্যময় সংখ্যা পাই (π)-এর ইতিহাস সুপ্রাচীন, এই সংখ্যার উদ্ভব ঘটে প্রায় ৪০০০ বছর আগে। ১৭০৬ সালে ওয়েলেশ গণিতবিদ উইলিয়াম জোনস সর্বপ্রথম গ্রীক অক্ষর পাই ব্যবহার করেন। এরপর ১৭৩৭ সালে সুইস গণিতবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী লিওনহার্ড অয়লার এই সংখ্যাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তখন থেকে প্রকৌশলী, পদার্থবিদ, স্থপতি, ডিজাইনার থেকে শুরু করে অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাই ব্যবহার করে আসছেন।

পদার্থবিদ ল্যারি শ ১৯৮৮ সালের ১৪ ই মার্চকে পাই দিবস হিসেবে মনোনীত করেন। কারণ, ৩.১৪ সংখ্যাটি পাই-এর প্রথম তিনটি অংকের সমান। বিশেষ এই দিনটি আবার আলবার্ট আইনস্টাইনেরও জন্মদিন। ২০০৯ সালে শ-এর কর্মস্থল সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক বিজ্ঞান যাদুঘরে সর্বপ্রথম পাই দিবস উদযাপিত হয়। মার্কিন জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদে আইন পাস করার প্রেক্ষিতে এই দিনটি সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়। গণিতবিদ, বিজ্ঞানী শিক্ষকগণ আশা করেন, এই ছুটি পৃথিবীব্যাপী গণিত এবং বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে বিশেষ অবদান রাখবে।

২৬ নভেম্বর ২০১৯ সালে ইউনেস্কো-এর ৪০ তম সাধারণ অধিবেশনে ১৪ ই মার্চকে আন্তর্জাতিক গণিত দিবস (আইডিএম) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৩ মার্চ দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রথমবারের মতো ইউনেস্কোর সদর দফতর প্যারিসে অনুষ্ঠিত হবে।

কম্পিউটার আবিষ্কারের আগে ডি এফ ফার্গুসন ১৯৪৪ সালে পাই-এর মান সবচেয়ে নির্ভুলভাবে গণনা করেন। তিনি পাই-এর মান ৬২০ ঘর পর্যন্ত বের করতে সমর্থ হন। আজ অবধি পাই-এর মান ১ ট্রিলিয়নেরও বেশি ঘর পর্যন্ত গণনা করা হয়েছে এবং গণিতবিদরা সেখানে থেমে থাকতে চান না।

আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়ন (আইএমইউ) একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারী এবং অলাভজনক বৈজ্ঞানিক সংস্থা। যার প্রধান লক্ষ্য গণিতের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। প্রথম আইডিএম ২০২০-এর প্রতিপাদ্য হলো: গণিত সর্বত্রই রয়েছে।

গণিত আমাদের জীবনকে সহজ করে তোলে কারণ সব কিছুতেই রয়েছে গণিত। - আফ্রিকান গণিত ইউনিয়নের সভাপতি অধ্যাপক আডেওয়াল সোলারিন।

বিশ্বকে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রই হচেছ শিক্ষা (নেলসন ম্যান্ডেলা) এবং গণিত হলো এর অপরিহার্য অঙ্গ।

গণিত দিবসের প্রধান লক্ষ্যঃ

১. সর্বস্তরে গণিতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা (এসডিজি ৯);

২. উন্নয়নশীল দেশের নারী ও শিশুদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা (এসডিজি ৪);

৩. জেন্ডার ভিত্তিক সমতা অর্জন এবং গণিতে নারীদের ক্ষমতায়ন (এসডিজি ৫);

৪. প্রযুক্তি ও সমাজ পরিচালনার বীজ হিসাবে মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপর গুরুত্ব প্রদান (এসডিজি ৮);

৫. অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন, টেলিযোগাযোগের মতো ক্ষেত্রে গণিতের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা (এসডিজি ৩);

৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী এবং উদীয়মান রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে গণিতের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি (এসডিজি ১১);

৭. জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনীতি গতিশীল করতে গণিতের ভূমিকা অপরিহার্য (এসডিজি ১৪-১৫);

৮. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জীবনের মান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে গণিত ও গণিত

শিক্ষার অবদান অনস্বীকার্য (এসডিজি ১৭) ।

২০২০ সালের প্রতিপাদ্য ‘‘গণিত সর্বত্রই”। বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণিতের প্রায়োগিক ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণঃ

১. সার্চ ইঞ্জিনসমূহ জটিল গাণিতিক মডেলের মাধ্যমেই ইন্টারনেটকে পরিচালনা করে।

২. সিটি স্ক্যান, এমআরআই এর মতো মেডিকেল ইমেজিং ডিভাইস গাণিতিক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সংখ্যাসূচক তথ্য

হতে ইমেজ তৈরি করে।

৩. মানবদেহের জিনোমের ডিকোডিং হল গণিত, পরিসংখ্যান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি অন্যতম বিজয়।

৪. গণিতের মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণগহ্বর ও সৌরজগতের প্রথম ছবি পেতে সমর্থ হই।

৫. সুরক্ষিত যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি সংখ্যাতত্ত্বর উপর নির্ভরশীল।

৬. গণিতশাস্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং এর মাধ্যমে বিশ্বকে পরিবর্তন করে দিচেছ।

৭. আমাদের স্মার্টফোনের সফ্টওয়্যারের পেছনেও রয়েছে গণিতের অবদান।

সভ্যতার সর্বত্র রয়েছে গণিত। কতিপয় উদাহরণঃ

১. পরিবহন ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে অপটিমাইজ করতে গণিতশাস্ত্র ব্যবহৃত হয়।

২. মহামারীর বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণ করতে গণিতের সাহায্য নেয়া হয়।

৩. স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার কার্যকরী পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় গণিতের মডেল কাজে লাগে।

৪. জনগণের ইচ্ছাকে আরও ভালভাবে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে গণিত সাহায্য করে।

৫. গণিতশাস্ত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন: বন্যা, ভূমিকম্প, হারিকেন প্রভৃতি) ঝুঁকি অনুধাবন এবং আগাম প্রস্তুতিতে

সহায়তা করে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে গণিত অপরিহার্য। যেমনঃ-

১. বৈশ্বিক পরিবর্তন ও জীব বৈচিত্রে তার প্রভাব মডেলিং এ জন্য গণিত ব্যবহৃত হয়।

২. গণিত শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নত ভবিষ্যত অর্জনে সহযোগী ভূমিকা রাখে।

৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে স্যাটেলাইট চিত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ ও মানচিত্র অংকন করা যায়।

৪. গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা প্রতিটি নাগরিককে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরও ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

৫. বৈশ্বিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে গণিত অপরিহার্য।

গণিত যাপিতজীবনে যেভাবে অবদান রাখছে তার কয়েকটি উদাহরণঃ

১. শিল্প এবং সংগীতে রয়েছে গণিতের উপস্থিতি।

২. দাবার কৌশলে আছে গণিত।

৩. বাজেট প্রণয়ণের ক্ষেত্রে গণিতের অবদান লক্ষ্যণীয়।

৪. নির্মাতা, কৃষক, শ্রমিক, বিপনী বিতান, ক্রীড়াবিদ প্রতিদিনই কিছু না কিছু গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করে থাকে।

৫. গণিত নক্ষত্র, সূর্য ও জিপিএস স্যাটেলাইট ভিত্তিক নেভিগেশনের মাধ্যমে আমাদের পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করে।

৬. আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস পেতে উন্নত বায়ুমন্ডলীয় মডেল ব্যবহার করা হয়।

৭. গণিত পেনশন সিস্টেমকে টেকসই করে তোলে।

৮. মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্রেও রয়েছে গণিতের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার।

লেখকঃ ড. মোঃ শহীদুল ইসলাম, প্রফেসর, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়

আহ্বায়ক,আন্তর্জাতিক গণিত দিবস উদযাপন কমিটি ২০২০ ও সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ গণিত সমিতি।

ঢাকা, ১৩ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।