বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা


Published: 2020-02-11 21:59:57 BdST, Updated: 2020-02-26 01:31:31 BdST

সৈয়দ নাজমুল হুদাঃ বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর র্পূব মুর্হূত র্পযন্ত বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও বকিাশে কাজ করে গেছেন । ভাষা আন্দোলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিশেষ অবদান রয়েছে। ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলা ভাষা মশিে আছে। ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

১৯৪৭ সালে এক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-“এ স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়। বাংলার মাটিতে নতুন করে আবার আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।” বঙ্গবন্ধুর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতা কেমন ছিল তা এ বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বর-এ খাজা নাজিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আইনসভার কতিপয় সদস্য বৈঠক করে ছিলেন।

শাহ আজিজু রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ খাজা নাজিমউদ্দীনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলে শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী প্রতিষ্ঠা করেন মুসলীম ছাত্রলীগ। যা বর্তমান সময়ে অসাম্প্রদায়কি চেতনায় গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত।

ভালবাসা, ত্যাগ, সংগ্রাম আর আর্দশের মাধ্যমে গঠিত এই বৃহত্তম ছাত্রসংগঠন সেদিন ভাষার দাবীতে রাজপথ রঞ্জিত করেছে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষনা দিলে তাৎক্ষনিক বিষয়টির বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান তীব্র প্রতিবাদ করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি বাংলাকে গণ পরিষদের ভাষা হিসাবে দাবী করেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই দাবীকে বিরোধীতা করেন লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিম উদ্দীন। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে সারা বাংলায় ঝড় সৃষ্টি হয়। এমন হীন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে নিয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ ভাষার প্রশ্নে মুসলীম লীগের এমন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।

এই সংগ্রাম পরিষদে মুসলীম লীগের এমন ষড়যন্ত্র ও হীন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট আহবান করা হয়। ধর্মঘট চলাকালীন সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান। অগণতান্ত্রিক ও অবৈধভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আরো দেশের ছাত্রসমাজ বিশেষ করে মুসলিম ছাত্রলীগ ফেটে পড়ে।

ছাত্র সমাজের দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে শেখ মুজিবসহ সকল গ্রেফতারকৃত ছাত্র নেতৃবৃন্দকে সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৫ই মার্চ কারাগার থেকে মুক্তিপান শেখ মুজিবুর রহমান। পরদিন ১৬ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিরাট এক জনসভার আয়োজন করা হয়। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এই সভায় সভাপতিত্ব করেন। এখানেও পুলিশ হামলা চালায়।

এই হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে ভয় পেয়ে তাকে আবারও গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানকে ভাষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আবারও গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানি নেতাদের ধারনা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করলে আন্দোলন থেমে যাবে।

গ্রেফতারের পর ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে। পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা আর ৭ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা ছিল উর্দু। মানুষের মনের ও মুখের ভাষাকে প্রাধান্য না দিয়ে শুধুমাত্র নিজেদের গাঁয়ের জোরে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। শেখ মুজিবুর রহমান জেলে থেকে তার নেতৃত্ব ও পরামর্শের মাধ্যমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতেন।

নাজিম উদ্দীনের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে ছাত্রদের ৮ দফার দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে নাজিম উদ্দীন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি “ঐতিহাসিক ভাষা চুক্তি” হিসাবে ইতিহাসে পরিচিতি। সকল ক্ষেত্রেই জেলে থেকে বঙ্গবন্ধু চুক্তির অনুমোদন করেন ছাত্র-ছাত্রীদেরই। ১৫ মার্চ শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। এই সভার সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক

 

মিছিল শেষ করে গণপরিষদের দিকে যাত্রা করলে পুলিশ লাঠি চার্জ করে এতে ১৯ জন ছাত্র গুরুতর আহত হয়। এর প্রতিবাদে ১৭ মার্চ প্রদেশব্যাপী সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯ মার্চ বিকেলে ঢাকায় আসে জিন্নাহ। ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় জিন্নাহ ঘোষনা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন চরম রূপ লাভ করেছে সর্বত্র। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ভাষা সংগ্রাম দিবস পালন কালে শেখ মুজিবুর রহমান কে পুন:রায় গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারি ঢাকা সফর কালে ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন আবারও ঘোষনা করেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্টভাষা”।

অথচ তিনি ঐতিহাসিক ভাষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন । ১৯৪৮ সালের ১৫ ই মার্চ। বিশ্বাস ঘাতক নাজিম উদ্দীন তার নিজ স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র লংঘন করে উর্দুকে রাষ্টভাষা প্রদানের বক্তব্য দিলে সমগ্র পূর্ববাংলা ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ডাকসুর ছাত্রনেতৃবৃন্দ মধুর ক্যান্টিনে এক ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করে।

ছাত্রনেতা গাজীউল হক এই সভায় অগ্নিঝরা বক্তব্য দেন। ৩০শে জানুয়ারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হয়। পরদিন ২১শে ফেব্র“য়ারী ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জমায়েত হতে শুরু করে এবং সর্বাত্মক হরতাল পালন করে। বেলা ১২টা থেকে সভা শুরু হয় এবং উক্ত সভায় ছাত্রনেতারা বক্তব্য রাখেন।

সভায় গাজীউল হককে সভাপতি করা হয়। ছাত্র সমাজ শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ বাতাশ মুখরিত করেন। “মায়ের অপমান সহ্য করবনা। মাতা তোমাদের অপমানের প্রতিশোধ নিব। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। মানিনা, মানবনা। নাজিম-নুরুল নিপাত যাক, চলো চলো এ্যাসেম্বিলিতে চলো ইত্যাদি।”

শেখ মুজিব এই আন্দোলন মিছিল ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার জন্য জেলের মধ্য থেকে গাজীউল হক কে ঐতিহাসিক চিঠি লিখে সমস্ত দিক নির্দেশনা দেন। ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিক সহ অনেকে শাহাদৎ বরণ করেন। শেখ মুজিব জেল থেকে এক বিবৃতিতে ভাষা শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং গুলিবর্ষনের প্রতিবাদে নিন্দা জ্ঞাপন করেন।

আজ একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে সারা পৃথিবীতে জায়গা করে নিয়েছে। মাতৃভাষা হয়েছে বাংলা । ২০২১ সাল হবে বাংলাদেশের সুর্বণজয়ন্ত্রী ও ২০২০ সাল মুজিব জন্মশত বার্ষিকী। বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব যেমন অভিন্ন তেমনী মাতৃভাষার প্রতি দরদ, মমত্ব ও ত্যাগের মহিমায় অনন্য শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিব জন্মশত বর্ষে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাকে বিনম্র চিত্রে শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: সৈয়দ নাজমুল হুদা
শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।