এক কিংবদন্তির গল্প


Published: 2019-11-11 21:14:06 BdST, Updated: 2019-12-06 14:03:22 BdST

ড. তোফায়েল আহমেদঃ কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লার ভাষায় বললে বলতে হয়, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি’। আমিও এখানে একজন কিংবদন্তি ভিসির কথা বলার চেষ্টা করছি। তিনি ২৯ বছর বয়সে প্রথম ভিসি হন (১৯২৬)। ৫১ বছর বয়স পর্যন্ত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫২ সাল পর্যন্ত) একটানা মোট ২৭ বছর ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিহার রাজ্যের রাজ্যপাল (১৯৫২-৫৭), ভারতের প্রথম মুসলিম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৬২-৬৭) ও রাষ্ট্রপতি (১৯৬৭-৬৯) এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি তালিকায় তৃতীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি সক্রিয় রাজনীতিবিদ না হলেও রাজনীতি বিযুক্ত ছিলেন না। তার রাজনীতিবিষয়ক মতামতে কোনো লুকোচুরিও ছিল না। তিনি মূলত মনেপ্রাণে ছিলেন একজন সুফি।

অন্যদিকে গান্ধীবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, মওলানা ইলিয়াছের তাবলিগি কর্মকাণ্ড এবং দেওবন্দিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। কোনো কারণে মওলানা আবুল কালাম আজাদের পছন্দের ব্যক্তি ছিলেন না, আবার মুহাম্মদ আলি জিন্নাহরও ছিলেন ঘোর অপছন্দের ব্যক্তি। তিনি গান্ধীবাদী হয়েও গান্ধীর অনেক মতের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন এমন নজির আছে। তিনি আর কেউ নন, দিল্লির জামেয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত উপাচার্য ড. জাকির হোসেন।

আজকাল বাংলাদেশ-ভারত সর্বত্র ভিসিদের নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর কোনো শেষ নেই। তাই মনে হলো ভিসি ড. জাকির হোসেনের জীবনালেখ্য বর্তমানের অনেক ভিসির বিবেকবোধ জাগ্রত করতে কিছুটা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ড. জাকির হোসেন ১৮৯৭ সালে হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১০ বছর বয়সে বাবা ও ১৪ বছর বয়সে মা মারা যান। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ‘ইতাওয়া ইসলামিয়া’য় মওলানা বাশিরউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে ১৪-১৫ বছর বয়সে আলিগড় মোহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল (এমএকিউ) কলেজে ভর্তি হন।

প্রথমে ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরে ইংরেজি, দর্শন ও অর্থশাস্ত্র নিয়ে স্নাতক হন। ভালো বৃত্তি নিয়ে আইনশাস্ত্রে এমএ করার সময় আলিগড়ে খণ্ডকালীন প্রভাষকের চাকরি হয়ে যায়। ১৯২০ সালের অক্টোবরে তার নিজের ভাষায় জীবনের এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ফেলেন। তা হচ্ছে ব্রিটিশরাজের সঙ্গে কোনোরূপ সহায়তা না করা। তার পেছনের ঘটনাটি হচ্ছে, ১২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধী, মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী আলিগড় শহরে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে ছাত্র-যুবকদের সমাবেশে বক্তৃতা করেন। আলিগড় ছিল ব্রিটিশবান্ধব প্রতিষ্ঠান। সভা শেষে আলিগড়ের ছাত্ররা খেলাফত ও অসহযোগ এবং গান্ধীকে নিয়ে নানা কটূক্তি করতে থাকেন। জাকির হোসেন তাতে খুব কষ্ট পান এবং মনে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে থাকে।

একদিকে মহৎ কাজে যোগ দেয়ার প্রবল ইচ্ছা, অন্যদিকে আলিগড়ের মায়া ও নিশ্চিত জীবন। পরদিন শহর ছেড়ে যাওয়ার আগে আলি ভ্রাতৃদ্বয় পুনরায় ক্যাম্পাসে আসেন, ছাত্রদের মধ্যে কোনোরূপ সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ও কষ্টে একপর্যায়ে তারা কেঁদে ফেলেন। জাকির হোসেনসহ অনেকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। রাতে জাকির হেসেনের প্রচণ্ড জ্বর আসে। তারা কয়েকজন দ্রুত সংগঠিত হয়ে যান। স্কলারশিপ ও চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে জাকির ও বন্ধুদের কয়েকজন দিল্লিতে হাজির হন। হাকিম আজমল খান, আনসারি সাহেব, মওলানা মোহাম্মদ আলি প্রমুখের কাছে জাকির কথা দেন যে প্রচলিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হলে তিনিসহ অনেকে আলিগড় ছেড়ে দেবেন। ২৯ অক্টোবর ‘জামেয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া’ শুরু হয়।

দেওবন্দের মুরুব্বিরা এমওকিউ মসজিদে জামেয়া গঠনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। জামেয়ার নতুন সদস্যরা তখন এমওকিউতেই অবস্থান করতে থাকেন। হাকিম আজমল খানকে আচার্য, মওলানা মোহাম্মদ আলিকে ভিসি এবং ক্যামব্রিজে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সতীর্থ ড. এএম খাজাকে অধ্যক্ষ করে তরুণ শিক্ষকদের নিয়ে জামেয়ার যাত্রা হয়। তখন অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কারণে দেশে টালমাটাল অবস্থা। লেখাপড়ার চেয়ে আন্দোলনের প্রাধান্য বেশি। খেলাফতের নেতারাই জামেয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। হাকিম আজমল খানই প্রধান দাতা।

আন্দোলনের উত্থান-পতনের সঙ্গে জামেয়ার ভাগ্য জড়িয়ে যায়। ছাত্রদের অনেককেই জেলে যেতে হয়। জাকির হোসেন আন্দোলনের সমর্থক হয়ে নিয়মিত খদ্দর পরলেও আইন অমান্য আন্দোলন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখেন। তিনি শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লেখালিখি ও গবেষণায় সময় দেন। ওই সময়ের মধ্যে তিনি প্লেটোর রিপাবলিক এবং Cannan’s Political Economy-এর উর্দু অনুবাদ করেন। দুই বছর পর জামেয়া থেকে জাকির হোসেনকে পিএইচডি প্রোগ্রামে জার্মানি পাঠানো হয়। পরে হামিদ, মুজিব, আবিদ হেসেনসহ জামেয়ার আরো বেশ কয়েকজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিত হন। বার্লিনের ভারতীয় মহলে খুব অল্প সময়ে জাকির হোসেনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডলে জার্মান পণ্ডিতদেরও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। অনেক জার্মান তরুণী জাকিরের অনুরাগী হয়ে পড়েন।

কিন্তু জাকির হোসেন ছিলেন বিবাহিত, মাত্র ১৮ বছর বয়সে শাহজাহান বেগমকে তিনি বিয়ে করেন। তিনি অবাধে সবার সঙ্গে মেলামেশা করতেন, একই সঙ্গে তার বিবাহিত জীবন সম্পর্কেও ছিলেন সজাগ ও বিশ্বস্ত। মুজিব যিনি ছিলেন জাকিরের ছায়াসঙ্গী, সরোজিনী নাইডুর ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (চুট্টু), তার বোন নামবিয়ার, হামিদ এবং তার জার্মান স্ত্রী লুভা, জার্মান তরুণী গারডা ফিলিপসব্রনসহ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে জাকির হোসেন তিনটি বছর তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন বলে তার জীবনীকার মুজিব মনে করেন।

ডিগ্রির শেষ পর্যায়ে ১৯২৫ সালে একদিন ভারতীয়দের এক বৈঠকে ঘোষণা দেন যে ডিগ্রি শেষে তিনি দেশে ফিরে জামেয়াতেই যোগ দেবেন। সবার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা। তিনিই নীরবতা ভেঙে বললেন, হামিদ, মুজিব, আবিদ তোমরা যেয়ো না। তোমরা এত কষ্টকর জীবনে অভ্যস্ত নও। ১৯২৬ সাল, খেলাফত আন্দোলন থেমে গেছে। জামেয়ার ভবিষ্যৎ খুবই অনিশ্চিত। তবুও সবাই সমস্বরে প্রতিবাদ করেন। তারা বললেন, আপনি পারলে আমরা কেন পারব না? আমরা সবাই ফিরে যাব।

ফিলিপসব্রনও সঙ্গে যেতে চান। তিনিও নাছোড়বান্দা। এ কুমারী দু-এক বছর পর জামেয়ায় এসে উপস্থিত হন এবং ১৯৪৩ সালে জামেয়াতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে জামেয়ার স্কুল সেকশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। ড. জাকির হোসেন তার স্ত্রী শাহজাহান বেগমকে গারডার বিষয়ে সবকিছু অবহিত করেন এবং তিনিও তার স্বামীর কথা মেনে নেন। ড. জাকিরের ওপর গারডার অনেক বেশি দাবি থাকত। ড. জাকিরও তার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দিতেন।

জামেয়ায় এ নিয়ে কানাঘুষা হতো না তা নয়, কিন্তু শাহজাহান বেগমের কোনো ক্ষোভ ছিল না। ড. জাকিরের ঘনিষ্ঠজন যারা একসঙ্গে বার্লিনে ছিলেন, তারা জানতেন এ এক শারীরিক সম্পর্ক রহিত অত্যাশ্চর্য প্লেটোনিক প্রেম। জামেয়া ফিরে এসে দেখলেন ৭০-৮০ জনের একটি জমায়েত। একটি বাণিজ্যিক ভবনের বড় একটি হলঘর, যেখানে সবাই খায়, নামাজ পড়ে, আবার ঘুমায়। রাস্তার অন্য পাশে তিনটি ঘরে পড়াশোনা হয়। চতুর্থ একটি কক্ষকে ড. জাকির হোসেন অফিস বানালেন। যেখানে তারা আটজন মেঝেতে পা গুটিয়ে খদ্দরের তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেন।

উপুড় হয়ে নিচু টেবিলে লেখেন। ড. মুজিব লিখেছেন, জাকির হোসেন হাঁটু বা বালিশকেও টেবিল বানিয়ে লিখতেন। ১৯২৬ সাল থেকে জাকির হোসেন একাধারে জামেয়ার ভিসি, অর্থ সংগ্রাহক, হিসাবরক্ষক, সচিব, উর্দু সাময়িক জামেয়ার সম্পাদক ও লেখক। জামেয়া এবং আশপাশে সবার সব সমস্যার পরামর্শক ও ত্রাতা। মুজিব লিখেছেন, বেশকিছু ‘Fools and bores’ তার অনেক সময় নষ্ট করত। তিনি অকাতরে তাদের সহ্য করতেন। কার কত বেতন তা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানত না। কারণ তিনিই তো হিসাবরক্ষক। একদিন আবিদ, মুজিব এরা জেনে গেলেন যে ভিসির বেতন তাদের চেয়ে কম। তারা সবাই এসে দস্তুর মতো তাকে ঘেরাও করেন এবং বেতন তালিকা প্রকাশের জন্য জোরজবরদস্তি শুরু করেন।

তাদের কথা হচ্ছে, শিক্ষকরা কখনো ভিসি থেকে বেশি বেতন নিতে পারেন না। অবশেষে দেখা গেল, ভিসির বেতন মাসিক ১০০ টাকা, আর সব পিএইচডিধারী শিক্ষকদের দেয়া হয় ৩০০ টাকা। তাদের দাবি ভিসির বেতন ৩০০ টাকার বেশি হতে হবে। তিনি কিছুতেই তারটা বাড়াবেন না। তখন আপস ফর্মুলা হলো, সব শিক্ষকের বেতন ১০০-তে নামিয়ে আনতে হবে। শেষে তা-ই তিনি মেনে নিলেন। পরে সবার অজ্ঞাতে তিনি যে কর্মটি করলেন তা হচ্ছে, তিনি তার বেতন ৮০-তে নামিয়ে আনলেন। সেই ৮০ টাকা থেকে তিনি ৪০ টাকা নগদ গ্রহণ করতেন, আর ৪০ টাকা বকেয়া রাখতেন। বলতেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য হবে তখন নেবেন। পরে শিক্ষকরা সেটিও জেনে যান, তারা তাদের বেতন পুনরায় ৮০ টাকায় নামিয়ে আনেন।

ভিসি ড. জাকির হোসেনের অফিসকক্ষে ও শয়নকক্ষে তেমন কোনো আসবাব ছিল না। তিনি বিছানায় বসে বালিশের ওপর কষ্ট করে লিখতেন। তিনি একটি কাজে কয়েক দিনের জন্য অন্যত্র গেলে ড. মুজিব রুমে একটি ছোট টেবিল ও চেয়ার দিয়ে আসেন। ড. হোসেন ফিরে এসে তা দেখে রেগে যান এবং রুম থেকে ওইসব বের করে দেন। তিনি মাঝে মাঝে খুব প্রয়োজন হলে স্ত্রীর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে কিছু অর্থ চাইতেন। কিয়ামগঞ্জে ড. জাকির হোসেনের পিতা-পিতামহের অনেক সম্পত্তি ছিল। তার আত্মীয়স্বজনই তা ভোগ করত। সেখান থেকে তিনি কিছুই পেতেন না।

শাহজাহান বেগম তার পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে মাসে ১০ টাকা অনিয়মিতভাবে হলেও পেতেন। ৪০ টাকা বেতনের সঙ্গে ১০ টাকা যোগ করে এই ৫০ টাকায় ভিসি ড. জাকির হোসেনের সংসার চলত। প্রয়োজনে শাহজাহান বেগম জামেয়ার পাশে ‘সুব্বা’ নামে এক বানিয়ার কাছ থেকে ধার-দেনা করতেন। বিষয়টি ভারতবর্ষ জানল ১৯৬৭ সালে, যখন রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেনের অভিষেক অনুষ্ঠানে একজন বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে বানিয়া সুব্বা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

সর্বশেষ তিনটি ঘটনা উল্লেখ করে লেখাটি এ পর্যায়ে শেষ করে দেব। ১৯৪৬ সাল, কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তিন মাসের মাথায় তিনি জামেয়া মিল্লিয়ার সিলভার জুবলি আয়োজন করেন। সে অনুষ্ঠানে তিনি জিন্নাহ, নেহরু, আজাদ ও লিয়াকত আলি খান এ চারজনের মাঝখানে উপবিষ্ট হন এবং ড. মুজিবের ভাষায়, জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তৃতাটি করেন। উপমহাদেশের ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে এ চার নেতাকে এক মঞ্চে বসানো কতখানি শক্তিমত্তা ও দক্ষতার পরিচায়ক, তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। দ্বিতীয় ঘটনা, সাল ১৯৩৩। জামেয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর জাকির হোসেন ছাত্রদের মধ্যে জিলাপি বিতরণ আর খোশগল্প করছিলেন।

পিয়ন এসে কানে কানে কিছু একটা বলল। তিনি বললেন, যাও আসছি। পিয়ন দ্বিতীয়বার আবার এল এবং তিনি একই উত্তর দিলেন। তৃতীয়বার এসে বলল, স্যার রেহানা মারা গেছে। তিনি দৌড়ে গেলেন। রেহানা ছিল তার অতি আদরের ছোট মেয়ে। তার স্ত্রী বলেছেন, এর পর থেকে অনেকদিন রাতে তিনি নীরবে এত কান্নাকাটি করতেন যে সকালে তার বালিশটি ভেজা পাওয়া যেত। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বারবার ডাকা সত্ত্বেও আপনি কেন গেলেন না? তিনি বলেছিলেন, এই হাসিখুশি ছেলেগুলোর আনন্দ ম্লান হবে ভেবে একটু সময় নিচ্ছিলাম। তৃতীয় বিরল ঘটনাটি ফিলিপসব্রনকে নিয়ে। তাকে বারণ করা সত্ত্বেও হিটলারের জার্মানিতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা তিনি খুঁজে পাননি। ১৯৩২ সালে তিনি দিল্লিতে জামেয়ায় চলে আসেন। তিনি ছিলেন বার্লিনের ধনাঢ্য এক ইহুদিকন্যা। জামেয়ায় দীর্ঘ ১১ বছর থাকার পর তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

অসুস্থ অবস্থায় তিনি জাকির হোসেনকে অনুরোধ করেন যখন সময় হয় তখন যেন তার শিয়রে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং অনুরোধ করেন তাকে যেন ইসলাম ধর্মের রীতি অনুসারে দাফন করা হয়। ড. জাকির নিয়মিতভাবে ফিলিপসব্রনের শয্যাপাশে কোরআন তিলাওয়াত করতেন এবং তা শুনতে শুনতে একসময় ফিলিপসব্রন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকেও জামেয়া প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।

উপমহাদেশের মহাপ্রাণ মানুষটি ২৭ বছর ভারতের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এখানে শুধু জামেয়া মিল্লিয়ার কিছু কথা তুলে ধরা হলো। আলিগড়ের উত্তাল সময়ের বিষয় অন্য কোনো সময়ে তুলে ধরা যাবে। অন্যান্য দায়িত্ব ছাড়াও আরো ১৬-১৭ বছর বিহারের রাজ্যপাল, ভারতের উপরাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে তাকে জামেয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। এখন বাংলাদেশে উপাচার্য মহোদয়দের নিয়ে জাতির দুর্ভাবনার শেষ নেই। তাই কিংবদন্তির এ উপাচার্যকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তার জীবন থেকে কিছু শেখার চেষ্টা থেকেই এ রচনার সূচনা।

ড. তোফায়েল আহমেদ

ভিসি, কুমিল্লার ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
vc@britannia.edu.bd

ঢাকা, ১১ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।