অগ্রগতি দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ!


Published: 2019-07-29 21:34:44 BdST, Updated: 2019-08-23 03:20:58 BdST

নিলুফার লাকীঃ আমি তখন খুব ছোট, স্কুলে যাবার বয়স হয়নি।বাবাই ছিলেন খেলার সাথী, সারাক্ষণ বাবার কোলে বসে কত রকম গল্প যে হতো; বাবার অফিস থাকা কালীন সময়টায় বাড়িতে যত ঘটনা ঘটতো তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বাবার কোলে বসে বর্ননা করা ছিলো আমার প্রধান কাজ।

বড় ভাই-বোনেরা ওদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করছি কিনা পর্দা আড়াল থেকে লক্ষ্য করতো। মাঝমধ্যে কিছু অভিযোগ তো থাকতোই, বাবা বাইরে গেলে তেড়ে আসতো বড় ভাই আর বুবু। মায়ের আচঁলের আড়ালে লুকিয়ে নিতাম নিজেকে, বাবা বাসায় না থাকলে অভয়দানের মহাআশ্রয় ছিলো মা।

বাবা একদিন বিকালে সরকারী বাসভবনের মস্ত বারন্দায় বসে বই পড়ছিলেন,(বারান্দাটার পাশ দিয়ে একটা রাস্তা এঁকেবেঁকে কোন এক তেপান্তরে পৌঁছেছে) আমি বাবার কোলে গিয়ে আমার আসন গ্রহন করেছি মাত্র, তক্ষুনি বহুদূর থেকে একটা সুরের আওয়াজ শুনতে পেলাম, সুরটা ক্রমাগত সামনে এগিয়ে আসছিলো।

খুব আহল্লাদিত চার বছরের মেয়েটা বাবার গলা জড়িয়ে আবদার করে বলে উঠলো 'বাবা আমার বিয়েতে কিন্তু এমন বাজনা বাজাতে হবে'। বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বাবা সম্মতি জানালেন। বাজনাদারদের আগমনের অপেক্ষায় অধির আগ্রহে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। সামনে এগোতে থাকা সুর ক্রমাগত স্পষ্ট হতে থাকলো। কাছে আসা বাজনার স্বরুপ উদঘাটিত হতেই আমি চোখ বন্ধ করে বাবার বুকে মাথা রাখলাম।

দুটু গরুর গাড়ির চাকার ঘর্ষনে এই সুরের লয় সৃষ্টি হয়েছে, গাড়িদুটু যত এগিয়ে আসছে শব্দ ততই প্রকট হচ্ছে। বাবা হো হো করে হেসে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না সামলানো কঠিন হয়ে উঠলো।

দিন এগিয়েছে, আমিও বিয়ে যোগ্য হয়ে উঠলাম একদিন। ১৯৭৭সাল, বিয়ে হলো নওগাঁ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বিয়ের পর কোরবানি ঈদে প্রথম শশুড়ালয়ে যাচ্ছি,শুনেছি শশুড়বাড়ির পথঘাট মেঠোপথের আধিক্যে পরিপূর্ন। ট্রেন থেকে নেমে আমাকে উঠতে হলো একটা সাজানো গরুর গাড়িতে।

গাড়োয়ান অভয় দিতে থাকলেন আন্তরিক ভাবে। বেশ বড় সর একটা গরুরগাড়ির সমানে দাঁড়িয়ে আমার চার বছর বয়সের ঝাপসা স্মৃতি আমাকে নিয়ে গেল বাবার কোলে বসা সেই মূহূর্তে, আমার আবদারের সত্যতা আমাকে হকচকিত করলো। কাকতালীয় ভবিতব্য কি একেই বলে?

নতুন বৌকে নিতে আসা গরুর গাড়ির ভিতরটা বাহারি সাজে সাজানো,পুরুগদির উপর নকশা করা নতুন চাদর পাতা, দুটু বালিশ, সাথে পাশ বালিশ, বিছানায় ফুলের পাঁপড়ি ছড়ানো। গরুর গাড়ির চালক সামনে বসলেন, আদরের ছোট দেবর আমাকে অভয়দান করে চালকের পাশে গিয়ে বসলো। দেবর তখন মাত্র এস,এস,সি পাশ করেছে।

দেবরের হাত শক্ত করে ধরে উঠে বসলাম গদিআটা নরম বিছানায়, আব্রু রক্ষার জন্য গাড়ির প্রবেশ পথে এবং পেছনে সুন্দর পর্দা ঝুলছিলো। আমার প্রেমিক স্বামী ও আমাকে অনুসরণ করে ভেতরে উঠে এলেন।

মেঠো পথ বেয়ে চলতে শুরু করলো গরুর গাড়ি,আমি কান পেতে রইলাম চার বছর বয়সে শোনা সেই বাজনার অপেক্ষায়। একটু আধটু সুরের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম কিন্তু সেদিনের শোনা আশপাশ কাঁপানো বাজনা বাজছিলোনা ।

কারণ জানতে চাইলাম চালকের পাশে বসা দেবরের কাছে, ওর উত্তর ছিলো বৃষ্টির পর মেঠো পথ কাদায় একাকার, তাই লোহার পাতগুলোয় জোড়ালো শব্দ হোচ্ছেনা। বিয়ের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রতি কোরবানি ঈদে ট্রেন থেকে নেমে গরুর গাড়িই ছিল শশুড়বাড়ির আঙ্গিনায় পৌঁছাবার একমাত্র বাহন। তারপর আধোকাঁচা- আধোপাকা রাস্তায় দেবরের মোটর সাইকেলের পিছনে করে অল্পসময়ে বাড়ি পৌঁছে যেতাম, ফেরার পথে দেবরের বাহনটিই রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিত।

দশবছরের মধ্যে ছকছকে তকতকে পাকা রাস্তা তৈরী হয়ে গেল, তারপর থেকে নিজেদের গাড়িতেই যাতায়াত। এখন বাড়ির পাশে বিশাল সরকারী রাস্তা অবস্থান করছে, সার্ভিস লাইনের বাস শ্যামলী, হানিফ, শাহ ফতেআলীসহ সবধরনের যানবাহন সকাল বিকাল যাতায়াত করছে। নির্জন গ্রামে এখন জমজমাট দোকান -পাটের ব্যস্ততা, বিভিন্ন ও রকমারি দোকানের সমাবেশ। রাত ১০/১১টা পর্ষন্ত চলে কেনাবেচা। ঘরে বসে খাবারের অর্ডার দিলে গরমগরম চাহিদা অনুযায়ী খাবারের প্যাকেট চলে আসে হাতের মুঠোয়। বাচ্চারা নামকরণ করছে কেশালগ্রামের গুলিস্তান।

সব বাড়িতে বিজলীবাতি , গ্রামের মানুষগুলো আগের চাইতে অনেক আন্তরিক ও সভ্য মনে হয়, শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। শীত,গরম, শ্রাবনের ধারা, ফাল্গুনি পূর্নিমার চাদ উপভোগ করতে বারবার শশুড়বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে; পাকা রাস্তার দু'পাশে শাল-সেগুনের সারি দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিকে প্রশান্ত করবার জন্যে। ভীষণ ভাবে miss করি গরুর গাড়িতে চড়ে মেঠো পথের জার্নিকে।

অগ্রগতি দিয়েছে বেগ-------কেড়ে নিয়েছে আবেগ,
গ্রামের পথে যাত্রা করলে এই উক্তির সত্যতা তীব্র ভাবে অনুভব করি।

ঢাকা, ২৯ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।