ব্লু-ইকোনমি: নতুন দিগন্তের হাতছানি


Published: 2019-05-30 21:23:06 BdST, Updated: 2019-06-24 15:33:08 BdST

একেএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী: সমুদ্রে অবস্থিত বিশাল জলরাশি এবং এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে ব্লু-ইকোনমির মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এদেশের কাক্সিক্ষত, দ্বি-অংকের জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ, অন্যান্য লক্ষমাত্রা অর্জনের জন্য বিশাল এই সমুদ্র সম্পদকে অতিদ্রুত আমাদের অর্থনীতির মূল ধারায় সংযুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, এ দেশের সমুদ্র সীমায় প্রচুর সম্ভবনা রয়েছে। পানির নিচের এসব সম্পদকে আমরা সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে আমাদের অর্থনীতির গতি আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও ভিশন-২০৪১ অর্জনে ব্লু-ইকনমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র সম্পদের অবদান মাত্র ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অথবা ৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিদ্রুত সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমাকে অর্থনীতির কেন্দ্রে রূপান্তর করে বাংলাদেশ সামুদ্রিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র সম্পদের অবদান কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

ব্লু-ইকোনমিকে আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে আরও বেগবান করার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অথবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় একটি উইং খোলার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট) রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব:) মো. খুরশেদ আলম জানান সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে দেশ। সাগরের বিশাল জলরাশি এবং এর তলদেশের অফুরন্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক বিপ্লবের ঘটানো প্রক্রিয়া চলছে। সমুদ্র জয়ের পর সেই বিপ্লব বাস্তবায়নের রোডম্যাপ এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যে সামুদ্রিক অর্থনীতি বিকাশের জন্য ২৬টি কার্যক্রম চিহ্নিত করেছে সরকার। এগুলো হল: শিপিং, উপকূলীয় শিপিং, সমুদ্র বন্দর, ফেরীর মাধ্যমে যাত্রী সেবা, অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবহন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প, মৎস্য, সামুদ্রিক জলজ পণ্য, সামুদ্রিক জৈব প্রযুক্তি, তেল ও গ্যাস, সমুদ্রের লবণ উৎপাদন, মহাসাগরের নবায়নযোগ্য শক্তি, ব্লু-এনার্জি, খনিজ সম্পদ (বালি, নুড়ি এবং অন্যান্য), সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ, উপকূলীয় পর্যটন, বিনোদনমূলক জলজ ক্রীড়া, ইয়টিং এবং মেরিনস্, ক্রুজ পর্যটন, উপকূলীয় সুরক্ষা, কৃত্রিম দ্বীপ, সবুজ উপকূলীয় বেল্ট বা ডেল্টা পরিকল্পনা, মানব সম্পদ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নজরদারি এবং সামুদ্রিক সমষ্টি স্থানিক পরিকল্পনা (এমএসপি)।

খুরশেদ আলম জানান, প্রত্যেকটি কার্যক্রমকে আরও কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং শিক্ষিত মানব সম্পদ অর্থনীতির চালিকা শক্তি, যা বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লবে সহয়তা করবে। দক্ষ প্রকৌশলী, নৌবাহিনী, প্রযুক্তিবিদ, মৎস্য প্রযুক্তিবিদ, জৈব প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ মানুষদের হাত ধরে ব্লু-ইকোনমির সফলতা আসাতে পারে।

বর্তমান সরকার ব্লু-ইকোনমির সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার উপর বিশেষ নজর দিচ্ছে। সমুদ্র গবেষণা ও মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য সাম্প্রতিক কালে সরকার বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং একটি মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেছে।

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, পর্যটন, সামুদ্রিক পরিবহন এবং তেল গ্যাস অনুসন্ধানসহ ব্লু-ইকোনমির বিভিন্ন সম্ভবনাকে আবিষ্কার করে কাজে লাগাতে একটি ‘টেকসই ব্লু-ইকোনমি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করার জন্য বাংলাদেশ মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই)-র সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানান।


২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে প্রথমে মিয়ানমার এবং পরে ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এতে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ১৮৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম উপকূল হইতে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সকল প্রকার প্রাণিজ ও খনিজ সম্পদের উপর আমরা একচ্ছত্র মালিকানা লাভ করি।

এ সমুদ্রসীমায় তেল, গ্যাস, মূল্যবান খনিজ সম্পদ, মৎস্য আহরণ এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। বিশ্ব অর্থনীতিতে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকান্ড হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ ও উদ্ভিদ।

৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল আসছে সাগর থেকে। সুনীল অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।


ঢাকা, ৩০ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।