বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট বনাম অর্থবাণিজ্য!


Published: 2019-04-15 14:04:54 BdST, Updated: 2019-04-20 10:57:28 BdST

আমিনুল ইসলাম : কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এর মাঝে কয়েকজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যে সরাসরি জড়িত থাকার জন্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা আছে।

আমার খুব কাছের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে, আমি নিজেও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম তখন।

আমাদের মাঝে চমৎকার বন্ধুত্ব। তার বাড়ি কুষ্টিয়া। তিনি চাচ্ছিলেন কুষ্টিয়ায় বাবা-মা'র কাছাকাছি থেকে কোথাও চাকরি করতে। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলেন লেকচারার পদে।

তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে আমার যা ধারণা ছিল সেটা হচ্ছে, শিক্ষক হতে হলে নেটওয়ার্ক থাকা লাগে, শিক্ষকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকতে হয়, তাদের তেল দিয়ে বেড়াতে হয় কিংবা বাজার! সেই সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকার দরকার আছে।

কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়কার প্রো-ভিসিকে আমি চিনতাম। আমি এর আগে কখনো কুষ্টিয়া যাইনি। সিদ্ধান্ত নিলাম আমার সহকর্মী যখন ইন্টারভিউ দিতে যাবে, আমি তার সঙ্গে যাবো, তাহলে কুষ্টিয়া জেলাটা ঘুরে আসা হবে। যাবার আগে ওই প্রো-ভিসিকে ফোন দিয়ে বললাম, আমি কুষ্টিয়া যাচ্ছি ঘুরতে। আপনার সঙ্গে দেখা হলে মন্দ হয় না। তো গেলাম কুষ্টিয়াতে।

আমার সহকর্মী লেকচারার পদে আবেদন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড মেডেল পাওয়া, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া কেউ একজন সেখানে আবেদন করেছে; আমি ভেবে রেখেছিলাম, এতে বরং বিশ্ববিদ্যালয়টিরই আনন্দিত হওয়া উচিত। কারণ এমন রেজাল্টধারী কেউ সাধারণ অর্থে সেখানে যাবার কথা না। স্রেফ কুষ্টিয়া বাড়ি বলে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখানে যাবেন।

ইন্টারভিউর জন্য বাইরে অন্যান্য প্রার্থীরা অপেক্ষা করছেন, আমি আমার সহকর্মী বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি। আমরাও অপেক্ষা করছি। তো, যারা শিক্ষক হবার জন্য আবেদন করেছেন সেখানে; এরা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। কথা গুলোর ধরণ অনেকটা এমন :

-আপনি কতো টাকা দিয়েছেন?
-কাকে দিয়েছেন টাকা?
-আপনার নিশ্চয়তা কতো ভাগ?
-না হলে কি টাকা ফিরত দিবে? কোন শর্তে টাকা দিয়েছেন?

আমি বুঝতে পারছিলাম না- আমি কি বাজারে আছি নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে! এরা এমন ভাবে কথা বলছিল, আমি মোটামুটি বুঝতে পারছিলাম এটা খুব স্বাভাবিক প্র্যাকটিস সেখানে! এই ধরনের কথা কেউ এতো প্রকাশ্যে বলে বেড়ানো'র কথা না। অথচ তারা বলে বেড়াচ্ছে!

আমার চোখ রীতিমত কপালে উঠার যোগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে টাকা দিয়ে হওয়া যায় এটা আমার এর আগ পর্যন্ত জানা ছিল না। আমি জানতাম- শিক্ষকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, রাজনীতি ইত্যাদি'র মাধ্যমে হয়ত সম্ভব।

তো, ইন্টার্ভিউ শেষে গেলাম আমার ওই সহকর্মী বন্ধুর এলাকায়। সেখানে তার পাড়ার পরিচিত একজন তাকে জিজ্ঞেস করছে,

-কেন এসছ কুষ্টিয়ায়?
মানে, অনেকদিন পর পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলে লোকজন যেমন জিজ্ঞেস করে। তো আমার বন্ধু বললেন,
-ইন্টার্ভিউ দিয়ে এসছি কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে ওপাশের ভদ্রলোক বললেন,
-কাকে ধরেছ? কতো টাকা দিয়েছ?
আমার চোখ আবার কপালে উঠার যোগার! বুঝতে পারলাম ওই পুরো এলাকাতেই এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

আমি পরের দিন গেলাম প্রো-ভিসির সঙ্গে দেখা করতে। যেহেতু তার সঙ্গে আমার আগে থেকেই চেনা-জানা আছে, তাই আমি তাকে নিঃসঙ্কোচে জিজ্ঞেস করলাম,
-এই যে সবাই টাকা টাকা করছে শিক্ষক হবার জন্য, আপনারা এর কিছু করছেন না কেন?
তিনি আমার কথা শুনে এমন একটা হাসি দিলেন-যেন ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক! আমি আর এই নিয়ে কিছু বলিনি।

তো এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের কয়েকজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে। কাউকে দিয়েছে অনুপস্থিত থাকার কারণে, কাউকে দিয়েছে টাকা নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে।

অবাক কাণ্ড হচ্ছে, যারা টাকা দিয়ে শিক্ষক হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই; নেই কোন শাস্তির ব্যবস্থা! তাহলে যারা টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা কী এভাবে পড়াতেই থাকবে? এমন নীতি-নৈতিকতা নিয়ে এরা কি করে ছাত্রদের পড়াবে? আর ছাত্ররাই বা এদের কাছ থেকে কি শিখবে? ছাত্ররা কি এমন শিক্ষকদের আদৌ কখনো সম্মান করতে পারবে?

আপনারা এদের শাস্তি দিলেন না, শাস্তি দিলেন শুধু অল্প কয়েকজন শিক্ষককে; যেখানে কিনা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেকেই হয়ত জড়িত। মানে আর কিছুই না। ভাগ-বাটোয়ারা। আপনাদের ভাগে কম পড়েছে, আর যারা শাস্তি পেয়েছে, তারা হয়ত ভাগে বেশি পেয়ে গিয়েছিল, এই জন্য আপনারা সবাই মিলে শাস্তি দিয়েছেন কেবল তাদের!

এই হচ্ছে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থা!

আর শিক্ষকদের অনুপস্থিতি? শুনলাম দুই- একজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে এই জন্য।

অথচ এই কালই না পত্রিকায় পড়লাম দেশের অন্তত ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা নিয়মিত তাদের অফিস করেন না। এর মাঝে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তো মনে হয় বিশ্ব-রেকর্ড করে ফেলেছেন। বছরের ৩৬৫ দিনের মাঝে তিনি প্রায় ২৫০ দিনই নাকি অনুপস্থিত ছিলেন!

অথচ এই ভিসিকে দিনে-রাতে দেশের নানান টেলিভিশনের টকশোতে দেখা যায়।

এই সব টকশোতে তিনি আমাদের নীতি-নৈতিকতা শেখান!

একটা সমাজ কতোটা নিচে নেমে গেলে এইসব অনৈতিক মানুষগুলো আমাদের নীতি-নৈতিকতা শেখায়, সেটাও বোধকরি ভাবার সময় এসছে।

আমিনুল ইসলাম
গবেষক ও শিক্ষক, সুইডেন

ঢাকা, ১৫ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।