জেসিন্ডা আরডার্নের গল্প


Published: 2019-03-30 19:15:03 BdST, Updated: 2019-08-20 20:38:37 BdST

মোফাজ্জল করিমঃ বর্তমানের ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীতে’ মনে হচ্ছে অবশেষে একজন সত্যিকার অর্থে মানবতাবাদী সংবেদনশীল রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব হয়েছে। যেন পৃথিবীর সর্বদক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি উন্নত অথচ স্বল্প আলোচিত দেশের একজন মানুষ, একজন নারী, একজন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, একটি মোমের আলো জ্বালিয়ে সারা দুনিয়ার মাস্তান মাস্তান নেতা-নেত্রীদের বলছেন : তোমরা যে পথে চলেছ তা ভুল। তোমরা মানুষকে নয়, মানুষের হৃদয়কে জয় কর।

আর তা তোমরা করতে পারবে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। মানুষের দুঃখে দুঃখিত হয়ে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলে। ১৫ মার্চের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর একজন সন্তানহারা মায়ের মত, একজন ভ্রাতৃহারা বোনের মত, দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মানুষটি। তিনি আর কেউ নন, তিনি সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নাম জেসিন্ডা আরডার্ন।

১৫ তারিখের আগে বিশ্ববাসী তাঁর নামও জানত না বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। এমনকি প্রতিযোগিতামূলক চাকরির জন্য প্রার্থী পরীক্ষার্থীরাও ট্রাম্প-পুতিন-কিম-মারকেল-মে-মোদি-ইমরান-ম্যাখোঁ ইত্যাদি বিশ্বমোড়লের নাম ঠোঁটস্থ কণ্ঠস্থ করে। অতিশয় জরুরি মনে করলেও কুল্লে পঞ্চাশ লাখের মত জনসংখ্যা অধ্যুষিত নিউজিল্যান্ড নামক নিরীহ-নির্বিরোধ দেশটি সম্বন্ধে কারো কোনো আগ্রহ থাকার কথা নয়। আর সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম না জানলে সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষায় কেউ ফেল মারবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিউজিল্যান্ডের পরিচিতি তো শুধু সে দেশের ক্রিকেটের জন্য।

বছর কয়েক আগে তাদের ক্রিকেট দল আমাদের দেশে এসে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হয়েছিল। আমরা সেই যে সেবার ঘি খেয়েছিলাম, তার সুখস্মৃতিতে তালু শুঁকতে শুঁকতে এবার দল পাঠালাম ওদের দেশে খেলতে। এবার আমরা এমন নাকাল হলাম যে সেটা আর কহতব্য নয়। তবু আল্লাহর লাখ লাখ শুকুর, আমাদের দল অল্পের জন্য ১৫ মার্চের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়নি।

তা জেসিন্ডা আরডার্নকে আগে কেউ চিনুক আর না চিনুক, ১৫ তারিখের পর থেকে সারা বিশ্বে তিনি যে সবচেয়ে আলোচিত একজন মানুষ, সবচেয়ে প্রশংসিত ও শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ওই ভয়াবহ ঘটনার পর তিনি যেভাবে পুরো বিষয়টির মোকাবেলা করে চলেছেন, তা এককথায় অভূতপূর্ব। প্রথম থেকেই টিভি পর্দায় তাঁকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ইনভলভ্’, হয়ে পড়েছেন।

যেন নিহত-আহতরা বাইরের কেউ নয়, তাঁরই স্বজন, তাঁরই পরিবারের সদস্য। আর তাঁর কথাবার্তায়, আচার-আচরণে অন্য সব কিছু থেকে মানবিক দিকটা ফুটে উঠেছে বেশি। একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্পূর্ণ ভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতির মানুষ হওয়া সত্ত্বেও জেসিন্ডা আরডার্ন যেভাবে সন্ত্রাসকবলিত কমিউনিটি—অর্থাৎ মুসলমানদের পাশে প্রথম মুহূর্ত থেকে অবস্থান নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়।

একটি উপাসনালয় ও তার অনুসারী ভক্তদের মর্যাদা ও অনুভূতির কথা বিবেচনা করে তিনি তাঁর পোশাক-আশাক, কথাবার্তা ও আচরণে শুধু সংযমের পরিচয়ই দেননি; বরং সেই প্রাচীন প্রবচন ‘হোয়েন ইন রোম ডু অ্যাজ দ্য রোমানস্ ডু’ মেনে চলে মুসলমান মহিলাদের মত হিজাব পরেছেন এবং বক্তৃতার সময় আরবি ভাষায় যথাস্থানে দু’আ-দরুদ পাঠ করেছেন। আর ওই সংকটকালে পুরো দেশবাসীকে যূথবদ্ধ রাখার মানসে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়দীপ্ত উক্তি : ‘উই আর ওয়ান’—আমরা সবাই এক তো আমার মনে হয় টনিকের মতো কাজ করবে।

লক্ষণীয় বিষয়, প্রধানমন্ত্রী আরডার্ন যা বলেছেন, যা করেছেন—সবই স্থিরমস্তিষ্কে। কোনো উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন নয়, সেই কমিটিকে ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে’ রিপোর্ট দাখিল করতে বলা নয়, কিংবা কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাদের সম্পৃক্ততার আভাস দেওয়া নয়।

শুধু এই সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তিনি যে কতটুকু ব্যথিত ও স্বজন হারানোর শোকে শোকাভিভূত, সেটাই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর আচার-আচরণে। ঘটনাটিতে যে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তার জন্য যে এর গুরুত্ব কম, অথবা এই সম্প্রদায়টির বিরুদ্ধে ইউরোপ-আমেরিকায় উঠতে-বসতে সন্ত্রাসের যে অভিযোগ উঠছে, সে জন্য এ ধরনের কিছু তো ঘটতেই পারে—এ রকম কোনো কথাবার্তা প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে বেরোয়নি বা তাঁর ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও’ তা পরিলক্ষিত হয়নি।

বরং বিভিন্ন পদক্ষেপের ভেতর দিয়ে তিনি এটাই বুঝিয়ে চলেছেন যে ক্ষুদ্র অভিবাসীগোষ্ঠীই হোক আর বৃহৎ শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠীই হোক বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাউরি জাতিই হোক—আমরা সবাই এক, উই আর ওয়ান। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, শরীরের এক অংশে কোথাও ব্যথা হওয়া মানে সারা শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়া। এভাবে এই সংকটকালে সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছেন।

ঐক্য, সংহতি ও পরস্পরের জন্য সহমর্মিতাই কেবল পারে একটি বহুজাতিক সমাজে সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার রোধ করতে। প্রধানমন্ত্রী আরডার্ন নিশ্চয়ই এটা বুঝতে পেরেছেন, তাঁর দেশের মুসলমানরা ১৫ মার্চের এরূপ একটা চরম বিদ্বেষমূলক অন্যায় আক্রমণের পর—তারা সংখ্যায় যত নগণ্যই হোক বা তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি যত তুচ্ছই হোক—বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে ইসলামী উগ্রপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে।

প্রতিশোধস্পৃহা দেখা দিতে পারে তাদের মধ্যে। এটা যাতে না হয়, সে জন্য শুরুতেই তিনি একাত্মতা ঘোষণা করে মুসলমানদের সঙ্গে মিশে গেলেন। ‘আমরা সবাই এক। তোমাদের ওপর যে আঘাত হানা হয়েছে, তা আমার গায়েও লেগেছে। আমিও ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমরা সবাই মিলে এই আক্রমণকারীকে প্রতিহত করব।’

প্রকাশ্যে এই সুউচ্চ ও সুস্পষ্ট মেসেজটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর দেশবাসীর কানে পৌঁছে দেওয়ার পর আর যা যা করা হলো, তার ভেতর ছিল সারা দেশে একই সময়ে সবাই মিলে একসঙ্গে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা, দেশব্যাপী আজানের মধুর ধ্বনি প্রচার করা এবং মুসলমানদের সঙ্গে গণপ্রার্থনায় শরিক হওয়া।

দুই.

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন যখন এভাবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র অভিবাসীদের প্রতি সদাচরণের এক অভিনব নজির স্থাপন করলেন, তখন আমরা অনুমান করতে পারি, বিশ্বের অনেক দেশের মহাপরাক্রমশালী পেশিমানবরা অন্তরে অন্তরে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিলেন।

তাঁরা হয়ত নিজেদের মধ্যে ‘হটলাইনে’ বলাবলি করছিলেন : এই মহিলা এটা আবার কী শুরু করল? শত শত বছরের চেষ্টার পর, বিশেষ করে ‘নাইন ইলেভেনের’ ফাঁদ পেতে বাছাধনদের যে মাইনকা চিপায় ফেললাম, যেভাবে এখন তাদের মানবতার শত্রু, সভ্যতার শত্রু, সন্ত্রাসী নাম্বার ওয়ান ইত্যাদি তকমা দিয়ে, গলায় একটা কার্ড ঝুলিয়ে রাস্তায় নামাবার সব জোগাড়যন্ত্র শেষ করে আনলাম, যেভাবে আফগানিস্তানে, ইরাকে, সিরিয়াতে সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়লাম, তার সব গুড়ে এক ট্রাক বালি ঢেলে দিল এই বেটি।

কেন রে বাবা, এত দরদ দেখানোর কী আছে ওদের জন্য। ওরা তো প্যালেস্টাইনে, সিরিয়াতে, ইরাকে, ইয়েমেনে মশা-মাছির মত রোজই মরছে ঝাঁকে ঝাঁকে। তার সঙ্গে না হয় আরও দুই-চার কুড়ি যোগ হয়েছে তোমার দেশে। তার জন্যে তোমার অত মাদার তেরেসা সাজার শখ হল কেন? নাহ, এসব বেকুবগুলোর জন্য দেখছি অস্ত্রশস্ত্রের কারবার লাটে উঠবে, অস্ত্র কারখানাগুলোতে লালবাতি জ্বলবে।

...নাইন ইলেভেনের পর আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামকে যারা ভিলেন হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তৎপর, তারা মুখে যা-ই বলুক না কেন, ভেতরে ভেতরে তো আমার মনে হয় দারুণ নাখোশ প্রধানমন্ত্রী আরডার্নের এমন গান্ধীবাদী আচরণে। এদের গুরু মার্কিন ‘ভবঘুরে’ ব্যক্তিটি ( ট্রাম্পের নামের একটি অর্থ কিন্তু ভবঘুরে। আর ভবঘুরেরা কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই। অতএব, তাদের সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক থাকা ভালো।

তিনি আমাদের শৈশবের দেখা কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় লাল মিয়ার মতো। তার পায়ে বল গেলে দুই দলের গোলকিপারই তটস্থ হয়ে পড়ত, কোন পোস্টে যে লাল মিয়া তার কামানের গোলার মত বল মারবে তার ঠিক নেই!) নাকি ঐক্য-সংহতি ইত্যাদির ধার ধারেন না। তিনি বিশ্বাস করেন বিভাজননীতিতে। আর এই বিভাজননীতি শুধু তিনি কেন, রাজনীতিতে অনেক সুচতুর নেতা-নেত্রীরা হরহামেশা কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটছেন দেখা যায়।

জাতীয় ঐক্য-ফৈক্য তাঁদের কাছে কিছু না। আর ওই নীতি এস্তেমাল করেই ট্রাম্পের রাজকীয় (নাকি মাস্তানীয়) উত্থান! তিনি ঝানু ব্যবসায়ী মানুষ। কী করে ঝটপট দুটো কাঁচা পয়সা বানাতে হয় ইহুদিদের সঙ্গে আঁতাত করে, আবার আরবদের খায়-খাতির করে, তাদের চান্দিতে নুন রেখে ডাসা ডাসা বরই খেতে হয়, সংখ্যালঘু অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেপিয়ে তুলতে হয়, এগুলো তিনি খুব ভালো করেই জানেন।

ফলে ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর ম্যাডাম জেসিন্ডা আরডার্ন যে অকস্মাৎ কিস্তির চাল দিলেন, এরপর ট্রাম্প সাহেব কী করেন, কী ফন্দি আঁটেন কে বলবে। প্রিয় গায়ক স্বর্গীয় কিশোরকুমারের একটা মজার গান, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’। এটা লুকোচুরি সিনেমার গান। ভারি মজার গান।

ওটাতে দুটো লাইন আছে এমন : ‘...গোলগাল বিশু নন্দী/দিনরাত আঁটে ফন্দি।’...আমাদের মার্কিন ভবঘুরে সাহেবও কিন্তু দেখতে মোটামুটি গোলগাল। তিনিও দিনরাত ফন্দি আঁটেন কী করে মুসলমানদের জন্য আমেরিকাকে ‘আউট অব বাউন্ডস্’ করা যায়, মেক্সিকোর সঙ্গে সীমানাপ্রাচীর কতটুকু উঁচু হলে মেক্সিকানরা পোলভল্ট দিয়েও দেয়াল টপকাতে পারবে না ইত্যাদি।

অতএব, ম্যাডাম আরডার্নকে বিশ্ববাসী সাধুবাদ জানালেও গুরুদেব ট্রাম্প যে বিষয়টা সহজভাবে নেবেন, তা মনে হয় না। তিনি বা তাঁর মত ঘোলা জলের মাছ শিকারিরা কি শান্তিতে থাকতে দেবেন বিশ্ববাসীকে? ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর লাগাতার বিষোদ্গারের কারণ যতটা না জঙ্গিবাদ ঠেকানো, তার চেয়ে বেশি অশ্বেতাঙ্গদের তাদের দেশগুলোতে প্রবেশ নিষেধ করা।

শ্বেতাঙ্গ জনগণকে সস্তা স্লোগানে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের ভোট আদায় করা। ট্রাম্প গত নির্বাচনে এই কৌশল কাজে লাগিয়ে অপ্রত্যাশিত সাফল্য লাভ করেছেন। ইউরোপে হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, সুইডেন প্রভৃতি দেশেও শ্বেতাঙ্গদের সুরক্ষা প্রদানের মায়াকান্না কেঁদে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নিচ্ছে চরম দক্ষিণপন্থীরা। এককথায়, শ্বেত সাম্রাজ্যবাদ বা শ্বেত মৌলবাদ—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে এখন শুরু হয়েছে অশ্বেতাঙ্গ ঠেকাও আন্দোলন।

যারা এর প্রবক্তা, তারা অতি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং অন্তরে পোষণ করে হিটলারের অতি-জাতীয়তাবাদী নীতি। এরা জাতীয়তাবাদের নামে, ধর্মের নামে, গাত্রবর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের নামে একটি দেশকে, তার সরকারকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। তারা মনে করে, তারা যা ভাবে, তাদের যা আদর্শ, তা-ই একমাত্র ভাবনা, একমাত্র আদর্শ—অন্য সব কিছু বর্জ্য। আর এই তথাকথিত শ্রেষ্ঠ আদর্শকে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় অন্য সব আদর্শ, অন্য সব জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে নির্মূল করে। এটা নিঃসন্দেহে ফ্যাসিজমের চূড়ান্ত রূপ।

তিন.

অন্য ধর্মে বিশ্বাসী বা ভিন্ন গাত্রবর্ণের মানুষকে দূরে ঠেলে না দিয়ে বরং তাদের কাছে টেনে নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন জেসিন্ডা আরডার্ন। এটাই মানবতা। হাজার হাজার ভাষাভাষী, বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ যে আসলে এক আদমের সন্তান, তা চৌদ্দ শ বছর আগে মহানবী রাসুল্লাহ (সা.) তাঁর বিদায় হজের অমর ভাষণে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে গেছেন :

‘লা-শরিক তুমি নিখিলের স্বামী আল্লাহ দয়াময়/হযরত কহে উদাত্ত কণ্ঠে প্রভু গো তোমার জয়/আরাফার মাঠ মুক্ত গগন দীপ্ত সবিতা শান্ত পবন/লক্ষ হৃদয় শুনি সে বচন/মন্ত্রমুগ্ধ রয়।... নাহি ভেদাভেদ আযমী-আরবী/এক আদমের সন্তান সবি...।’ (‘বিদায় হজ্ব’ : কবি আবুল হোসেন)

হে মানবজাতি, সে তো বিধাতার বিশাল উদ্যানে ফোটা বিচিত্র বর্ণের, বিচিত্র সৌরভের হাজার রকমের ফুল। কারো নাম গোলাপ, কারো নাম জুঁই, কেউ চাঁপা, কেউ বকুল, কেউ গন্ধরাজ। এদের কারো গন্ধ তীব্র, কারো কোমল, কেউ গন্ধহীন। কেউ রঙিন, কেউ শ্বেতশুভ্র। কিন্তু সবার পরিচয় একটাই—তারা ফুল।

মানুষও তো তাই। কেউ শ্বেতাঙ্গ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে বলে সে সাদা, আরেকজন আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ দম্পতির সন্তান, তাই সে কালো। আবার কেউ তামাটে, কেউ পীত। কিন্তু সবার মৌলিক পরিচয়, সাধারণ পরিচয়, একটাই—তারা মানুষ। তাদের সবার আছে দু’টি হাত, দু’টি পা, দু’টি চোখ, একটি নাক ইত্যাদি।

এমন নয় যে আফ্রিকার শিশুটি জন্মায় একটি হাত নিয়ে, মার্কিন মুলুকের শিশুটি জন্মায় তিনটি চোখ নিয়ে। জন্মের পর সবাই কেঁদে ওঠে একই ‘ভাষায়’। এমন নয় যে ইংরেজ শিশুটি কাঁদে ইংরেজিতে, চীনা শিশুটি চায়নিজে, আর বাঙালি শিশুটি বাংলায়। ক’দিন পর সবার মুখে ফুটে ওঠে একই অনাবিল স্বর্গীয় হাসি।

ব্যথা পেলে সবাই যন্ত্রণায় কাতরায়, খুশি হলে হাসে। সবচেয়ে বড় কথা—বিভিন্ন বর্ণের বিভিন্ন জাতির মানুষের চামড়ার নিচে প্রবহমান রক্তের রঙ একই—লাল। সেই যে ‘নানা রঙের গাভী রে ভাই, একই রঙের দুধ/জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত।’

আহা, এর চেয়ে সুন্দর কথা আর হয় না, এর চেয়ে বড় সত্য আর কি আছে? দেশে-বিদেশে যারা মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তারা কবে বুঝবেন, ‘জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত’? কী যে ভালো লাগছে, অন্তত একজন জেসিন্ডা আরডার্ন বুঝতে পেরেছেন, মানুষের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয়—সে মানুষ।

শেষ করার আগে বহুকাল পূর্বে সত্তরের দশকের শেষভাগে মেলবোর্নের মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগাত্রে যে ‘গ্রাফিতিটি’ (দেয়াললিপি বা দেয়ালচিত্র) দেখেছিলাম, তা স্মৃতি থেকে উদ্ধার করতে চাই, শুধু সাদা মানুষদের মন-মানসিকতা সম্বন্ধে একটু ধারণা দেওয়ার জন্য : ‘গড্ ক্রিয়েটেড দ্য ব্ল্যাক/অ্যান্ড হি ক্রিয়েটেড দেম অ্যাট নাইট;/ইট ওয়াজ ডার্ক অল অ্যারাউন্ড/অ্যান্ড হি ফরগট্ টু পেইন্ট দেম ইন হোয়াইট।’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

ঢাকা, ৩০ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।