গণভবনে নুরু ও ডাকসুকেন্দ্রিক রাজনীতি


Published: 2019-03-17 22:07:02 BdST, Updated: 2019-10-15 22:43:48 BdST

জুনাইদ আল মামুন,যুক্তরাষ্ট্রঃ গণভবনে নুরুর বক্তব্য খুবই চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বয়সের তুলনায় বেশ উঁচু মানের এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে আমি আশাবাদী। রাজনৈতিক কূটনীতি সে ভালভাবেই রপ্ত করেছে। সে ছাত্রলীগ করে নাকি শিবির করে নাকি এখন কোন দলই করে না তা বেশ স্পষ্ট।

তার রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্যই ছাত্রলীগের এবং পারিবারিকভাবে আওয়ামীলীগের। এরকম ইতিহাস থাকার পরও কোন একটা যৌক্তিক আন্দোলনে যদি কেউ অংশগ্রহণ করে তবে তাকে যে নৈতিকভাবে স্থলিত প্রমাণ করার জন্য ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ও সংশ্লিষ্টরা তাকে 'শিবির' আখ্যা দেয় এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে।

অর্থাৎ, কেউ শিবিরের সাথে যুক্ত থাকুক বা না থাকুক, সে এই অপবাদে দুষ্ট হতে পারে যে কোন সময়। একইভাবে সেটা রোকেয়া হলের আন্দোলনরত মেয়েদের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। তাদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করে জামাত-শিবির-ছাত্রীসংস্থার সদস্য হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো সেই একই ব্যক্তিকে যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রয়োজন হবে তখন তাকে ঠিকই সংবর্ধনা দিয়ে ডাকা হয় এবং একসাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহবান জানানো হয়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে যদি নুরু আজকে গণভবনে না যেত তবে তার উপর আগে যে অপবাদ গুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা আবার দেখা দিত এবং সেগুলোর ফলাফল হত নেতিবাচক।

শুধু নুরু নয়, ডাকসুর সকল নেতৃবৃন্দকেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। নুরু ইচ্ছা করলেই না যেতে পারত। স্রোতের বিপরীতে থাকার চেষ্টা করতে পারত। তাতে কী হতো? তাতে লিটন নন্দীদের মতো টিএসসির মোড়ে দাঁড়িয়ে শুধু দাবী জানানোই হতো। নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন টিএসসিতে জানানো দাবী আর গণভবনে জানানো দাবীর পার্থক্য কোথায়? কূটনৈতিক আলোচনা কিংবা দর কষাকষির টেবিলে খেলোয়াড়দের র‍্যাংকিং একটা ডিসাইডিং ফ্যাক্টর।

আপনি যার সাথে দর কষাকষি করছেন সে আপনাকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে তা প্রমাণিত হয় আপনি ঠিক কোন অবস্থানে থেকে দাবী জানাতে পারছেন এবং দর কষতে পারছেন। এক টেবিলে বসে আলোচনা আর মোল্লা ওমরের মতো গুহার ভেতর থেকে ভিডিও প্রকাশ করে কিছু একটা 'দাবী' করার ভেতর পার্থক্য আছে।

এটা যুক্তি আসতে পারে যে সাধারণ ছাত্রসমাজ তার পিছনে আছে, তারা নতুন নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তিক্ত সত্য হলো যে ছাত্ররা নির্বাচনের আগের রাতে ভোট ফেরাতে পারে না, ভোট দিতে না দিলে বাসায় গিয়ে বসে থাকে, কিংবা হলের একটা সিট আর ভোটাধিকারের অপরচুনিটি কস্ট হিসাব করে সিটকেই প্রাধান্য দেয় তাদের নিয়ে আন্দোলন করে এই নির্বাচন আবার অনুষ্ঠিত করা যাবে এটা সম্পূর্ণ হাস্যকর ধারণা।

এর চেয়ে ছাত্রীদের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। আর অস্ত্র সজ্জিত বাহিনী মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা এখনো ছাত্র সমাজের তৈরি হয়নি। এটি বিগত কয়েকটি আন্দোলনেই দেখা গিয়েছে। সুতরাং নুরুর রাজনৈতিক রেটরিক সমৃদ্ধ বক্তব্য এবং একই সাথে ছাত্রদের আন্দোলনে সাথে থাকা দুটিই দরকার আছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ কোনভাবেই হতো না যদি না বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা সত্ত্বেও আপামর জনতা যুদ্ধে অংশ না নিত। সুতরাং নুরু কিংবা সেমন্তি আন্দোলনে এসে মার খেলেই কিংবা গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেই এই নির্বাচন আবার হয়ে যাবে বা নির্বাচনে সুষ্ঠুতা আসবে সেটির কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

এর চেয়ে নুরুর দাবীগুলো আমার কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী মনে হয়েছে। সমস্যার মূলে গিয়ে চিন্তা করে সে দাবী জানিয়েছে। যে আবাসন সংকট ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার চর্চায় সীমাবদ্ধতা এনেছে সে সেই সংকট দূর করার দাবী জানিয়েছে। সিটের রাজনীতি ডাকসুতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মেয়েদের হলের আন্দোলনের চিত্র আর ছেলেদের হলের আন্দোলনের চিত্র দেখলেই বুঝা যাবে।

নুরু দাবী জানিয়েছে ডাকসু নির্বাচন যেন নিয়মিত হয়। একই সাথে এই নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে যে উদ্বিগ্নতা ও আশংকা ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে। সে অভিযোগ জানিয়ে বলেছে এই আশংকা গুলো যেন পরবর্তী নির্বাচনে না থাকে তা যেন নিশ্চিত করা হয়। ২৮ বছরের অচলাবস্থা ভেঙে এমন সময় ডাকসু নির্বাচন হলো যখন আওয়ামীলীগ টানা তৃতীয়বারের ক্ষমতায়।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারের প্রভাব, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা এবং একই সাথে জনগনের সক্ষমতাও পরিষ্কার ভাবে দেখা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নিশ্চিত হয়েছে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে তাদের প্রভাব বজায় রাখার।

সুতরাং এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে পুনরায় নির্বাচনের দাবী জানানো রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে যায়। কিন্তু সত্যিকারের দাবী এটিই হওয়া উচিত যে ডাকসু নির্বাচন যেন নিয়মিত হয় এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যারা পড়াশোনা করছে বা ছাত্র অবস্থায় আছে এদের বেশিরভাগেরই ভোটদানের অভিজ্ঞতা নেই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে। সে কারণেই শুধু নির্বাচনের আগে পরে কী ধরণের রাজনৈতিক পরিবেশ থাকা উচিত, সমতার রাজনীতিতে এর গুরুত্ব কতখানি তা একমাত্র তখনই তারা বুঝতে পারবে যখন নিজে এই প্রক্রিয়ার সরাসরি অংশ হবে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, চর্চা শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব না। জনগণ, রাজনীতিতে যারা অংশ নেয় সকলেরই দায়িত্ব। আর বই বা পত্রিকা পড়ে, ফেসবুকে জ্বালাময়ী আন্দোলনের স্ট্যাটাস দিয়েও এটি অর্জিত হয় না। সুতরাং নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ছাত্ররা এর গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং সেটির প্রতিফলন শুধু ডাকসু নির্বাচনেই না, সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আচার-অনুষ্ঠানে প্রতীয়মান হবে বলে আমি মনে করি।

ঠিক একইভাবে নুরুর অন্যান্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবীও যথেষ্ট যৌক্তিক। এসকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুঝা উচিত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন দিকে ধাবমান।

তাই নুরু কেন গণভবনে গেল, কেন প্রধানমন্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করলো, কেন সে 'সুলতান মনসুর' হয়ে যাচ্ছে এসব আলাপ বাদ দিয়ে তার দাবীর সুদূরপ্রসারী ফলাফল চিন্তা করেন এবং সেই দাবী বাস্তবায়নে কার ভূমিকা কী সেটি ভাবেন। ডাকসু একটি ছাত্র রাজনীতির মঞ্চ।

এখানে আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে লিটন নন্দীর মত এত আন্দোলন করেও তিন অংকের ভোট আর বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তা করলে ছাত্রদলের চেয়ে বেশি ভোট পাবেন বলে মনে হয় না। বরং ভোটের হিসাব বাদ দিয়ে ছাত্রদের মাঝে আপনার দাবী এবং আদর্শের মূল্যায়ন কতটুকু সেটি চিন্তা করা উচিত। নুরু তার জায়গায় যতটুকু সম্ভব করেছে।

শিবির ট্যাগধারী, নির্বাচনের আগে পরে নির্যাতিত হওয়া নুরুকে গণভবনে দাওয়াত দিয়ে নিতে হয়েছে এটা নুরুর রাজনৈতিক বিজয়। এই নির্বাচনে যদি সে ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে তবে ভাবুন তার সাথে আপনার পার্থক্য কোথায়।

আর যদি সে এর অন্যথা কোন উপায়ে নির্বাচিত হয়ে থাকে তবে ভাবুন আপনারা কেন সেই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করতে পারেন নি। আপনাদের সম্মিলিত অকার্যকারিতার দায় নুরুর কাঁধে একা দিবেন কেন?

জুনাইদ আল মামুনঃ গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ঢাকা, ১৭ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।