জিপিএ কম, বিদেশে কী পড়তে যেতে পারব?


Published: 2019-02-19 12:06:57 BdST, Updated: 2019-06-21 04:09:48 BdST

আমিনুল ইসলাম : কোন সাবজেক্টে পড়লে বিদেশে পড়তে যেতে কিংবা স্কলারশিপ পেতে সুবিধা হবে? আমি বোধকরি নিয়ম করে প্রতিদিন এই ধরনের অনেক এসএমএস পাই। বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিস্টেম নিয়ে এর আগে আমি আস্ত একটা লেখা লিখেছিলাম। ঠিক বুঝতে পারছি না, এই ছেলে-পেলে গুলো সেটা পড়েছে কিনা। তবে এই ধরনের এসএমএস পেলে আমি আজকাল আর উত্তর দেই না।

এর প্রথম কারণ হচ্ছে- আপনারা যেই প্রশ্নগুলো করেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দুই মিনিট গুগল করলেই জেনে যাওয়ার কথা। অন্য কাউকে প্রশ্ন করার প্রয়োজন কেন পড়ছে, আমার ঠিক জানা নেই!

এরপরও অল্প কিছু বিষয় লেখা যাক।

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ব্যাচেলর লেভেলে বিদেশে পড়তে যেতে আমি কাউকেই সাজেস্ট করবো না। এর প্রধান কারন হচ্ছে- ব্যাচেলর লেভেলে বিদেশে স্কলারশিপ পাওয়া যায় না বললেই চলে। পাওয়া যায়, তবে খুবই কম। তবে আপনার বাবা-মায়ের যদি অনেক অর্থ থাকে, পুরোটা নিজ খরচে পড়তে পারবেন, এমন যদি অবস্থা হয়, তাহলে যেতে পারেন। নইলে যাওয়া উচিত হবে না। এর কারণ হচ্ছে- আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, অনেক ছেলে পেলে টিউশন ফি'র টাকা জোগাড় করতে না পেরে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে স্রেফ কাজ-কর্ম করে বেড়ায় বিদেশে। একটা সময় পড়াশোনাই ছেড়ে দিতে হয় এদের। শেষমেশ এরা থেকে যায় ইন্টারমিডিয়েট পাশ! আবার কেউ কেউ বয়স কম থাকাতে পার্ট টাইম কাজ করে যেই কাচা টাকা পায়, সেই টাকায় বখেও যায়।

তাহলে কি করা উচিত?
দেশে ব্যাচেলরটা যেভাবেই হোক কমপ্লিট করে আসা উচিত। তো, দেশে কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করলে বিদেশে পড়তে যেতে এবং স্কলারশিপ পেতে সুবিধা হবে?
এই ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব দর্শন অবশ্য আলাদা। আমি নিজে হলে, অতি অবশ্যই আমার যেই বিষয় নিয়ে পড়তে ভালো লাগে, আমি সেটা পড়বো।

তবে ইউরোপে প্রায় ১৫ বছর থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যেই ছেলে-পেলেগুলো দেশে বায়োটেকনোলজি, কেমিস্ট্রি, কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা এই টাইপ বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশুনা করে বিদেশে মাস্টার্স কিংবা পিএচডি করতে আসে, তাদের জন্য ব্যাপারটা অনেক সহজ।

একটা ব্যাখ্যা দেই- কেন সহজ।
ধরুন পৃথিবীতে এখনও অনেক রোগ আছে যার কোন চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। তাই আমাদের জীবন এবং বেঁচে থাকার জন্য হলেও অনেক গবেষণার দরকার। তো এই গবেষণা কারা করে? ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং গবেষক যারা বায়োটেকনোলজি কিংবা এই টাইপ সাবজেক্ট পড়ায় কিংবা গবেষণা করে। তো, এই শিক্ষক কিংবা গবেষকরা কি স্রেফ নিজেরা নিজেরা গবেষণা করে? না, এদেরও সহযোগীর দরকার হয়। এই সহযোগী হচ্ছে মাস্টার্স এবং পিএচডি স্টুডেন্টরা। এইসব দেশের সরকার এই ধরনের বিষয় গুলোর জন্য অনেক ফান্ড দেয়। যার কারণে এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে খুব সহজেই স্কলারশিপ পাওয়া যায়। যার কারণে বায়োটেকনোলজি, কেমিস্ট্রি কিংবা এই রিলেটেড সাবজেক্ট গুলোতে যারা দেশে পড়াশোনা করেছে, তারা খুব সহজে বিদেশে চান্স পেয়ে যায়।

ওই একই ব্যাপার প্রযোজ্য কম্পিউটার সায়েন্সের ক্ষেত্রে। এই যেমন আমি যে দেশে থাকি, সে দেশকে বলা হয় ই-কান্ট্রি। অর্থাৎ এই দেশের সকল কর্মকাণ্ড অন লাইনে করা যায়। এমনকি আমরা সিগনেচারও করি ডিজিটালি। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের অবস্থাই আস্তে আস্তে এমন হয়ে যাচ্ছে। এখানেতো এমন কি এমনও বলা হয়- আমরা চাকরি পাওয়ার জন্য আসলে রোবটে র সঙ্গে যুদ্ধ করছি! তো, এই রোবট কিংবা এর সফটওয়্যারগুলো কারা বানাচ্ছে? কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা এই টাইপ সাবজেক্টের ছেলেপেলেরাই। যার কারণে এসব দেশে এসে এরা খুব সহজে ভালো চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, এদের এই ধরনের স্কিল্ড মানুষ দরকার। আর অন্য সাবজেক্টে পড়া ছেলেপেলেগুলো এই রোবটগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করছে চাকরি পাওয়ার জন্য। যার কারণে অনেকেই চাকরি পায় না!

তো, এর জন্য কি আপনার দেশে ভালো কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হবে কিংবা ভালো জিপিএ পেতে হবে?
উত্তর হচ্ছে না- মোটেই না।
সোজা চোখ বন্ধ করে যে কোন একটা ইউনিভার্সিটিতে এইসব সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে যেতে পারেন। নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে এমন কোন কথা নেই। মফস্বলের পাবলিক ইউনিভার্সিটি, যে কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও কোন ক্ষতি নেই। আমি এমন অনেক ছেলেপেলেকে বিদেশে পেয়েছি, যারা দেশে এমন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে এসছে, যার নাম পর্যন্ত আমি শুনিনি। কিন্তু এরা এখানে এসে ভালো চাকরি করছে, মাস্টার্স, পিএচডি করছে স্কলারশিপ নিয়ে।

আর রেজাল্ট কিংবা জিপিএ? খুব একটা ইমপররট্যান্ট না। এরা ভর্তি করার সময় রেজাল্ট হয়ত দেখে, তবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ না। আপনি নিজের সাবজেক্ট সম্পর্কে কেমন জানেন, আপনার মোটিভেশন কি? ইত্যাদিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন অনেক ছেলেপেলেকে দেখেছি যারা দেশের নামকরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক ভালো জিপিএ নিয়ে বিদেশে পড়তে এসছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালো একটা স্কলারশিপ পা'নি কিংবা পড়া শেষে চাকরিও পায়নি। এর কারণ হচ্ছে তারা হয়ত এমন সব সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করেছে, যেই সাবজেক্ট গুলোর এই সব দেশে তেমন ডিমান্ড নেই।

তাই, নিজের ক্যারিয়ার যদি বিদেশে করবেন কিংবা বিদেশে আপনি পড়তে যাবেন, এমন ভাবনা থেকে থাকে তাহলে কোন ইউনিভার্সিটিটে ভর্তি হবেন, জিপিএ কতো পাওয়া উচিত এইসব না ভেবে বরং ভাবা উচিত কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করবো আর নিজেকে কিভাবে উন্নত করবো এই নিয়ে। এই উন্নত করার ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে- ইংরেজিটা ভালো করে শিখতে হবে, চমৎকার করে মেইল লেখার প্র্যাকটিস করতে হবে যাতে নিজের লেখা দিয়ে অন্যদের ইমপ্রেস করে ফেলা যায়, সেই সঙ্গে যেই সাবজেক্টে পড়াশোনা করছি, সেই সাবজেক্টের যে কোন ক্ষুদ্র একটা বিষয়ে যেন অন্তত ভালো জানা থাকে। অর্থাৎ যে কোন একটা দিকে যেন ভালো দক্ষতা থাকে।

এইতো হয়ে গেল। আর ব্যাচেলরের পড়াশোনা যখন একদম শেষ পর্যায়ে, অর্থাৎ ফাইনাল ইয়ার থেকেই গুগল করে পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট ঘেঁটে ওদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তি হওয়ার নিয়মগুলো জেনে সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

অন্য কাউকে মেসেজ করে- নিয়ম জানার তো কোন প্রয়োজন দেখছি না। আমরা যদি আজ থেকে ১৫ বছর আগে নিজের মতো করে চলে আসতে পারি, যখন দেশে ইন্টারনেটই সেই অর্থে ছিল না, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের তো অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করার আমি অন্তত কোন প্রয়োজন দেখছি না।

আমিনুল ইসলাম
শিক্ষক, ইউরোপ
সাবেক শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।