জীবনযুদ্ধ মানেই মধ্যবিত্ত


Published: 2019-01-31 21:57:52 BdST, Updated: 2019-09-17 05:00:17 BdST

এ এইচ এন জনিঃ মধ্যবিত্ত বলতে আমরা কি বুঝি? মধ্যবিত্ত একটি শব্দমাত্র কিন্তু এই ছোট্ট একটি শব্দটি এতোটাই অর্থবহুল যার অর্থ একটা অভিধানের ভিতর প্রকাশ করা সম্ভব নয়।ছোট করে বলতে গেলে মধ্যবিত্ত বলতে এমন একটা জীবনকে বোঝায় যেখানে স্বাদ আছে কিন্তু সাধ্য থাকে না। যে জীবনের সহ্যক্ষমতা অনেক। বাসে কোথাও গেলে স্টুডেন্ট ভাড়া দেয়। রিকশাতে শেষ কবে চড়েছে মনে থাকে না তাঁদের। কখনও কখনও ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে চলে যায় ক্লান্তিহীনভাবে, যেন সে চলে যায় রুপকথার সিনবাদের যাদুর গালিচা করে। কারন তাঁরা মধ্যবিত্তের সন্তান। তবুও তাঁরা গর্বিত যে তাঁরা মধ্যবিত্ত।

তাঁদের কাড়িকাড়ি টাকা নেই উড়ানোর মতো।তাঁরা পকেটভর্তি টাকা নয়,মাথাভর্তি টেনশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।তাঁদের টাকা না থাকলেও আছে নিজের পরিবারের একটু হাসি দেখার মত ক্ষমতা। তাঁদের আছে পকেটে ১০ হাজার টাকা রেখে রাস্তার পাশের সস্তা টংয়ে বসে ডার্বির ধোয়া উড়ানোর মত সাহস। তাঁদের আছে মানিব্যাগে দুই টাকার নোট নিয়ে ফরমাল ড্রেস পরে কয়েক কিলো হাঁটার সাহস। তাঁদের বডিতে তিনশ টাকার পাঞ্জাবীটা দিব্বি মানিয়ে যায়। আবার সেই পাঞ্জাবী দুই বছর এমনিতেই চলে যায়।

মধ্যবিত্ত পরিবার !এরা না গরীবনা ধনী ।এই শ্রেণীর লোকেরা পৃথিবীতে আসে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জন্য !!মধ্যবিত্ত পরিবারে মানুষ স্বপ্ন দেখে না বা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় !কারন স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট খুবই মারাত্মক । তাঁদের জীবনটা হল ঘরপোড়া গরুর মত খুব অল্পতেই ভয় পায় । তাঁরা ইচ্ছা থাকলেই কোন কিছু করতে পারে না।তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপে পা ফেলতে হয় চিন্তা ভাবনা করে ! তাঁরা চাইলেও আর দশ জনের মত জীবনটা কাটাতে পারে না। কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁদের নিয়তি ঠিক করা থাকে,পড়ালেখা করে তাঁদের কিছু করতে হবে !তাঁদের সংসারের হাল ধরতে হবে।

মধ্যবিত্তদের একটা গুণ আছে সেটি হচ্ছে নিজেদের কষ্টগুলোকে চাপিয়ে রাখা।এরা লেখাপড়াতেও মধ্যবিত্ত। কষ্ট করে, প্রাইভেট না পড়ে,টিউশনি করে স্কুল,কলেজের গন্ডি পার করলেও ঠেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যবিত্তদের জীবনের কাহিনিগুলো নিয়ে মহাকাব্য লিখতে বসলে, কতগুলো ট্রাজিক মহাকাব্য লেখা যাবে তাঁর অন্ত নাই।

এদের টাকা আসে বাড়ি থেকে গুনে গুনে। মাসে ত্রিশ দিন,ত্রিশ দিনে নব্বইটা মিল। মিল গুনে গুনে টাকা পাঠায়।অবশ্য তাঁদের বাবা মায়ের ইচ্ছা থাকে বেশি দিবে কিন্তু উপায় থাকে না।এই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা সকালে খায় না।কেনণা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে একটা মিলের টাকা চলে যায়।তাঁরা সকাল দুপুরের খাবার একসাথে খায়,এই খাবারটির নাম ও তাঁরা ভালবেসে দিয়েছে (Breaklunch=Breakfast + Lunch)। থাকা খরচ বাঁচাতে এরা এসে ওঠে হলের গণরুমে।

চারজনের রুমে চব্বিশ জন। এদের থাকার কোন অসুবিধা হয় না কারণ এরা সবাই মধ্যবিত্ত । বাড়িতে বলে তাঁরা অনেক ভাল আছে,গর্ব করে বলে সরকারি রুমে থাকে খরচ লাগে না। বছরের শুরুতে তাঁরা প্লান করে ভ্রমণে যাবে,প্লান শেষে যখন বাড়িতে টাকা চায় তখন বাবা বলে ভ্রমণে যাস না। ভ্রমণের গাড়িতে শুধু দূর্ঘটনা ঘটে,বলেই বাবা ফোনটা কেটে দেই,ফোনের এ পাশ থেকে তাঁদের সন্তানেরা বুঝতে পারে ব্যাপারটা। বুঝতে পারে বাবা দূর্ঘটনাটা বলতে অর্থসংকটের কথা বোঝাচ্ছে।

পরে বাবার মন খারাপের কথা ভেবে সন্তান,বাবাকে ফোন দিয়ে জানাই, " বাবা আমিও ভেবে দেখলাম ভ্রমণের গাড়িতেই বেশি দূর্ঘটনা ঘটে তাই ভাবছি যাব না। সন্তানের এতোটা সহজে বাবার কথাটা বুঝে ফেলার ব্যাপারটা বাবাও উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু কোন উপায় থাকে না কিছু করবার।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমদিন থেকেই বাবা- মা দিন গোনে আর কতদিন পর তাঁর সন্তান চাকরি করবে। একটা বছর যেতেই বলে, " তুইতো আর তিন বছর পর চাকরি করবি" স্বপ্ন দেখে বাবা- মা তাঁর সন্তান এটা হবে। তাঁদের সন্তান কি চাকরি করবে সেটাও ঠিক করে দেয় তাঁদের বাবা- মা।মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা তাঁদের বাবা মায়ের স্বপ্নটাকেই নিজের স্বপ্ন করে জীবন যুদ্ধে ঝাপ দেয়।

পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষ থাকা উচিত। একটা উচ্চবিত্ত অন্যটা নিন্মবিত্ত। মধ্যবিত্ত নামে কোন কিছু থাকা অনুচিত। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের আত্মসম্মান আর ইগো,দুইটাই খুব বেশি থাকে। সে জন্মের সময়েই একগাদা ইগো সাথে করে নিয়ে জন্মায়। সে স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয় এবং একপর্যায়ে সে বুঝতে পারে জীবনটা স্বপ্ন নয়, জীবনটা বাস্তব। সে সব সময় সুখ খোঁজে, জীবনের মানে খুঁজে বেড়ানো তার স্বভাব ।

সে অল্পতে সন্তুষ্ট হতে পারে না।আবার অল্পতে অসন্তুষ্টুও থাকতে পারে না।সে সবার কাছে ভালোবাসা খোঁজে কিন্তু,এটা তার কাছে অপরাধ। উচ্চবিলাসী হওয়া তার জন্য গুনাহের পর্যায়ে পড়ে। তার আবেগ অত্যাধিক বেশি থাকে । কিন্তু সে খুব ছোট থাকতেই আবেগকে গলা টিপে খুন করতে শিখে ফেলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই আবেগপ্রবন,পাগলাটে,স্বপ্ন বিলাসী সন্তানদের কেউ বুঝতে চায় না। তাকেই সবকিছু সামলে চলতে হয়।

এত কিছু পরেও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানটি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে আমি সুখেই আছি।বলবে না কেন যে সুখে আছি? সুখ জিনিসটা কি তাতো তাদের উপলব্ধিও হয়নি কোনদিন। মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে যখন দেখে প্রাইভেটকার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে,সে তখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যে তার যখন টাকা হবে সে কি রংয়ের কার কিনবে? তাতে কার পাশে বসে সে ড্রাইভ করবে! রাস্তায় দাড়িয়ে সে মুহূর্তেই স্বপ্নে হারিয়ে যায়।

স্বপ্নের ঘোর যখন ভাঙে,তখন মনে পড়ে এখনও অনেক পথ হাটতে হবে,ক্লাসরুম এখনও অনেক দূরে। আবার যখন মাথার উপর দিয়ে বিমান চলে যায় তখন সে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে পাইলট হবে আর তাঁর বাবা- মাকে তাতে চড়িয়ে ঘোরাবে।স্বপ্ন ভাঙতেই দেখে বাবা- মা তাঁর সামনে নানা জায়গায় সেলাই করা করা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে। তখন মনের ভিতর হু-হু করে কেঁদে ওঠে।

ছেলেমেয়েদের থেকে বেশি স্বপ্নবিভোর থাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা- মা। তাঁরা স্বপ্ন দেখে তাদের ছেলে অনেক বড় হবে।সমূদ্র তীরে তাঁদের একটা বাড়ি করে দেবে, সেখানে বসে তাঁরা সমূদ্রের ঢেউ উপভোগ করবে! স্বপ্ন ভাঙতেই মা দেখে সবজি কাটতে গিয়ে হাত কেটে রক্ত বের হচ্ছে। এটাই হলো মধ্যবিত্ত পরিবার। আমি এরকম পরিবারের ই ছেলে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় মনে কোন আক্ষেপ নেই,নেই কোন রাগ,ক্ষোভ।

ভালবাসা, সে কি জিনিস,সেটা হয়তো এই পরিবারে না জন্মালে বুঝতাম না। যে পরিবারে বাবা বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে উপার্জন করে, সেই পরিবারের ছেলে হয়েও একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই ঠান্ডা লাগে, একটু রোদে থাকলেই গরম লাগে, এতো ভালবাসা কি কখন এ,সি কারে বসে বসে বোঝা যায়? মাঝে মাঝে মন খারাপ হয় উচ্চবিত্তদের খাবার,পোষাক দেখে।

আবার যখন মনে পড়ে বাবার অতি যত্নে লালন করা, মায়ের কষ্টের বিনিময়ে হাসিখুশি রাখাটা তখন সবকিছু ভুলে আবার পথচলতে শুরু করি।এটাই আমি, এটাই আমার মধ্যবিত্ত পরিবার। ড্যাডি,মম বলে আমাদের তৃপ্তি মেটে না। বাবা,মা ডাকেই খুঁজে পায় অনাবিল সুখ।

এ এইচ জনি
শিক্ষার্থী
বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া

 

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।