বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে জোর করে আটকে রাখা কেন?


Published: 2017-12-23 13:03:42 BdST, Updated: 2018-06-23 06:44:01 BdST

রাজু নুরুল : বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন- দেখতে অতি সুদর্শন, দুধে আলতা গায়ের রঙ, হাসলে যেন মুক্তা ঝরে! আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম। আমি প্রায়ই সেই শিক্ষকের দিকে ‘হা’ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, পুরুষ মানুষ এতো সুন্দর হওয়ার দরকার কী? পুরুষের গায়ের চামড়া হবে বাদামী রঙের, হালকা পোড়া পোড়া তামাটে রঙের হলে আরো ভাল!

তো আমাদের সেই স্যার কি যেন একটা কোর্স পড়াতেন আমাদের! মৌর্য আমলের ইতিহাস, মনসামঙ্গল এবং আরো নানাবিধ কুটপ্যাঁচাল! আমি আরেক দফা অবাক হতাম তখন। আরে বাপ! আমিতো ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হই নাই, আমি আসছি অর্থনীতি পড়তে, সেইখানে এই কুটিল প্যাঁচালের দরকারটা কি বাবা?

স্যার ক্লাস নিতেন দুপুর আড়াইটায়! সোয়া একটার ক্লাস শেষে আমরা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া হলে যাইতাম আর সরাসরি ডাইনিং হলে গিয়ে নাকে-মুখে দুইটা দিয়া দৌড়ে রুমে গিয়া দুই পিট তাস পিটাইয়া আবার ক্লাসে দৌড় মারতাম। কোনভাবেই ক্লাস শুরুর অংশ মিস করা যাবে না। কারণ শুরুতেই নাম ডাকা হবে যে!

স্যারের ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই নামডাকা পর্ব! এরপর স্যার চেয়ারে বসে লম্বা বক্তৃতা শুরু করতেন। উপরোক্ত বিষয়ে স্যারের জ্ঞান প্রবাদতুল্য! কিন্তু এই রসকষহীন বিষয়, দুপুর আড়াইটা আর স্যারের ভাবলেশহীন দীর্ঘ লেকচারে আমাদের ঘুম পাইতো।

সুনসান সমাজ বিজ্ঞান ভবন, তার পেছনে কোকিল-শালিক-ডাহুকের ডাক, স্যারের একটানা সুরেলা কন্ঠ, আমাদের মধ্যে একটা অতি চমৎকার ভাব সৃষ্টি করতো! আমরা পেছনে বসে কাটাকুটি খেলতাম বা ঘুমিয়ে পড়তাম।

কিন্তু ক্লাসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক! কারণ, ১০ নম্বরের চাবুক! ক্লাসে না থাকলে টিউটোরিয়াল দেয়া যাবে না, পরীক্ষা দেয়া যাবে না, তারপর হাতে পায়ে ধরো...

এই দশটা মার্কসই সবকিছু ঠিক করে দিত! কেউ অতি অখাদ্য মানের ছাত্র হয়েও এসব ক্লাস-ফ্লাস করে, শিক্ষকের মন তুষ্ট করে ভাল মার্কস পেয়ে যেত। আর আমরা, ঘাড় ত্যাড়া গোঁয়ার গোবিন্দ, ‘ভাল লাগলে ক্লাসে যামু, না লাগলে নাই’ টাইপের ছাত্ররা কম মার্কস পেয়ে ব্যাক বেঞ্চার হয়ে থাকাটা পাকাপোক্ত করতাম!

হাসি পাইতো খুব। ভাবতাম, কই আসলাম? কিন্ডারগার্টেন? যেখানে নাম ধরে হাজিরা ডাকা হয়, ক্লাসে না আসলে নাম্বার কাটা যায়, আর নিয়মিত ক্লাস করলেই তাকে ভাল ছাত্রের তকমা দেয়া হয়! হায় সেলুকাস!

অথচ বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জায়গা যেখানে যার ইচ্ছা ক্লাসে যাবে, যার ইচ্ছা নয়। প্রত্যেকে তার নিজের পছন্দ খুঁজে নেবে। আমরা এমন অনেক টিচারের ক্লাস করতে গেছি, যিনি দর্শন পড়াতে ঢাকা থেকে আসতেন (সরদার ফজলুল করিম), নাটকের শিক্ষকের ক্লাস করেছি, বাংলার শিক্ষকের ক্লাস করতে সেই কলা ভবনে ছুটে যেতাম...

সম্প্রতি এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ক্লাস এটেন্ডেন্স না থাকার কারণে পরীক্ষা দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। অভিমান ভরা মর্মস্পর্শী একটা পত্রও লিখে গেছে সে।

সোমবার সংবাদমাধ্যমে জানতে পারলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন তিনি ক্লাসে এটেনডেন্সের বিপরীতে মার্কস রাখাটাকে সমর্থন করেন না। মাননীয় উপাচার্য, আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আপনার মাধ্যমে দেশব্যাপী জনমত তৈরি হোক। এটেডেন্সের নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্ডারগার্টেনের তকমা থেকে মুক্তি পাক।

জোর করে ক্লাসে আটকে রাখা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় হোক মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবাধ ক্ষেত্র!

লেখক : রাজু নুরুল
উন্নয়নকর্মী
[কার্টেসি : পরিবর্তন]

ঢাকা, ২৩ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।