‘আত্মরক্ষার্থে’ পুলিশ বাধ্য হয়ে ট্রিগার চেপেছে! গল্প এখানেই শেষ নয়...প্রবাসী শিক্ষার্থীদের ভাবনা: “দেশে ন্যায় বিচারের বাণী ডুকরে ডুকরে কাঁদছে”


Published: 2020-09-04 20:32:18 BdST, Updated: 2020-10-31 13:04:02 BdST

শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ, দিল্লি থেকে: মেজর (অব) সিনহা মোহাম্মাদ রাশেদ খান। অকালে ঝড়ে পড়া একটি মেধা। তিনি ছিলেন দেশ দরদী বারুদ। একই সঙ্গে দেশ মাতৃকার জন্যে ছিলেন সাহসী যোদ্ধা । তার সব কিছুই এখন কেবলই স্মৃতি। মেজর সিনহা হত্যায় সাজানো হলো সেই পুরনো গল্প, ‘আত্মরক্ষার্থে’ পুলিশ বাধ্য হয়ে ট্রিগার চেপেছে! গল্প এখানেই শেষ নয়। পুলিশ দাবি করল, দুই বোতল মদ ও গাঁজা পাওয়া গেছে সিনহার কাছে। তার ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা যে ব্যর্থ হয়েছে সেটা স্পষ্ট। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নড়বড়ে অবস্থার কারণে আষাঢ়ে গল্প শুনিয়ে পার পেয়ে যায় অভিযুক্তরা।

৩১শে জুলাই। কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মাদ রাশেদ খান। দুই পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তলের গুলিতে নিভে যায় একটি স্বপ্ন। এমন চৌকস সেনা কর্মকর্তার নির্মমভাবে হত্যার ফলে গোটা জাতি আজ স্তম্ভিত। সমালোচনার ঝড় বইছে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে। মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকান্ড নিয়ে কী ভাবছেন প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা। এসব কিছু তুলে ধরেছেন আমাদের দিল্লি প্রতিনিধি শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ

নিয়াজ মোর্শেদ

 

নিয়াজ মোর্শেদ, (ডিপার্টমেন্ট অফ মেকাট্রনিক্স, বয়েথ ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি) ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা নড়বড়ে হওয়ার কারণে আষাঢ়ে গল্প শুনিয়ে পার পেয়ে যায় অভিযুক্তরা। তাছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকায় বরাবরের মতই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তিনি সিনহার হত্যার ব্যাপারে আরো জানান, সংবিধানের কাছ থেকে হয়তো মেজর সিনহা অধিকারের নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন, কিন্তু সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে একদল পুলিশ। যখন এভাবে মৌলিক অধিকার খর্বের আয়োজন চলে, তখন সংবিধান পরিণত হয় স্রেফ একটি পুস্তকে। দেশের বিচারব্যবস্থা হয়ে উঠে অপ্রয়োজনীয়। এককথায়, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যা সরকার, সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ, বিচার বিভাগ, সংবিধান সর্বপরি রাষ্ট্রীয় স্তম্ভগুলোর উপর একেকটি আঘাত।

মেজর সিনহা রাশেদ হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গুলোর একটি বহিঃপ্রকাশ। ইতিপূর্বেও দেখা গেছে যে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপরাধের সাথে জড়িত না থেকেও বিভিন্নভাবে মাদকের সাথে জড়িয়ে পুলিশ সাধারণ জনগণকে হেনস্থা করে আসছে এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে নামমাত্র বন্দুক এবং গোলাবারুদ উদ্ধারের নামে বিভিন্ন নাটক সাজিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিভিন্নভাবে সমালোচিত
হয়েছে ।

একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে, প্রতিটি নাগরিকের সরকারের কাছ থেকে ন্যায়বিচারের পাওয়ার অধিকার রয়েছে। হত্যার বিচারের অগ্রগতি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট এবং আমি আশা করি বিচারটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ এবং প্রকৃত আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সেই সাথে আইন ও শাসন এর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা লাভ করুক।

মোঃ মুজাহিদুল ইসলাম নাহিদ

 

মোঃ মুজাহিদুল ইসলাম নাহিদ (পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, কুকুরোভা ইউনিভার্সিটি Cukurova University তুর্কি) মেজর অব. সিনহা হত্যার ব্যাপারে ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জাতিকে নেতৃত্ব দেবার আসন থেকে কয়েক গজ দূরে অবস্থান করে। তাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহে তাদের চিন্তা চেতনা খুব গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ণ করা উচিত। আজকে বাংলাদেশে ন্যায় বিচারের বাণী এতটাই ডুকরে ডুকরে কাদছে যে, দেশের মধ্যে ঘটে যাওয়া মেজর সিনহাকে হত্যার মত চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতিতেও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে।

এটা নি:সন্দেহে জাতির জন্য একটা অশনি সংকেত। আমরা ছাত্রসমাজ চাই, দেশে সমস্ত প্রকার অন্যায়ের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হোক। আর এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জনগণের সাথে পুলিশের সকল কথোপথন রেকর্ড করার পূর্ণ অধিকার সবাইকে দেওয়া হোক। জনগণকে পুলিশের সার্ভিসের ভিত্তিতে রেটিং দেবার, প্রতিটি সার্ভিসের পরে সার্ভিস দাতা পুলিশের ব্যাপারে কমেন্ট করার অধিকার দেওয়া হোক। আর তাঁদের বেতন কাঠামো জনগণের রেটিং এর উপরে নির্ধারণ করার সুপারিশ করছি। সেই সাথে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে বিচারিক আদালতে গোপনে ধারণকৃত রেকর্ডকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার আইনি বৈধতা দান এখন সময়ের দাবী।

মোঃ ইকবাল হোসাইন

 

মোঃ ইকবাল হোসাইন (ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অটোমেশন, জিয়াংসু ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চীন) তিনি আলাপচারিতায় ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, গ্লোবাল ইনডেক্স এ বাংলাদেশের উন্নতি চোখে পড়ার মতো জিডিপি , শিক্ষার হার যাই বলে ঊর্ধ্বগতি। এটা দেখে হয়তো আমরা জাতি হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেই পারি। তবে একটা জাতি তখনই সফল যখন সেই দেশে আইনের শাসন ব্যাপক ভাবে মানা হয়। প্রায়শই শুনা যায় পেপার পত্রিকাতে আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন চাঁদাবাজি, বিচাবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এক এক জনের অবৈধ সম্পদের হিসাব দেখলে চক্ষু চড়ক গাছ হওয়ার কথা।

বাংলাদেশে প্রশাসনিক চাকুরী বরাবরই লোভনীয় ছিল। আমাদের প্রশাসনকে দিয়ে শোষন করার রেকর্ড মনে হয়না অন্যদেশে আছে। রিসেন্টলি মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড তার জ্বলন্ত উদাহরণ। একজন স্পেশাল ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তাকে নিরস্ত্র পেয়েও ৬ টা গুলি করা পুলিশ কতটা বেপরোয়া তা নির্দেশ করে। একটি হাইলি ডেকোরেটেড এক্স আর্মি অফিসারকে হত্যা করার পর একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে ওসি প্রদীপ গং রা নাকি এই পর্যন্ত ১৬০ টি ক্রস ফায়ার দিয়েছে এবং দেশে বিদেশে ওসি প্রদীপ এর আছে ২০০ কোটির সম্পদ। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই উপায় মনিটরিং নিশ্চিত করা আর পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক বলয় থেকে মুক্ত রাখা আর কোন পুলিশ কর্মী অন্যায় এর সাথে জড়িত হলে তাকে বরখাস্ত সহ ফৌজদারি আইনে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ।

বিচার বহি্ভূত হত্যাকাণ্ডকে নিষিদ্ধ করা ও সর্বোচ্চ তদন্তের ব্যবস্থা করা । যেন কোন নিরীহ লোকের জীবন এবং তার পরিবারকে ক্ষতির সম্মুখীন না হতে হয়। সর্বোপরি ডিজিটালাইজড করা যেন দেশের যেকোন প্রান্তে বসে পুলিশের সার্ভিস নেওয়া যায় । আমরাও চাই আমাদের পুলিশের ভালো কাজ গুলো উঠে আসুক। একটি কল্যাণমুখী নিরাপত্তা বাহিনীতে পরিণত হয়ে দেশে কাজে লাগুক।

জি এম আবু তাহের

 

জি এম আবু তাহের (রিসার্চ স্কলার, ইংরেজি ভাষা ও শিক্ষা, আলিগর মুসলিম ইউনিভার্সিটি, ভারত) সোস্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমে, প্রকাশিত নানা তথ্য, প্রমান করেই চলছে আজকের এই দেশে পুলিশের ভয়াবহ হিস্রতা। এমন কি হত্যার পরেও তার লাশের সাথে দুর্ব্যবহার মেনে নেয়নি সমাজ। পুরাদেশ বাসি তথা শিক্ষিত সমাজ এই নারকীয় হত্যার বিচার চায় খুব দ্রুত। মানুষকে তার কথা বলার সময় পরজন্ত দেইনাই, পুলিশের দাম্ভিকতা, আর দায়িত্ত্বের প্রতি সম্মান অনেক নিচর নেমে গেছে। যা মেজর সিনহা হত্যা প্রমাণ করেছে। মেজর সিনহা শুধু একটা নাম নয়, তিনি ছিলেন একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা, মুক্তি যোদ্ধার সন্তান, চৌকস সামরিক কর্মকর্তা।

মেজর সিনহা ছিলের অস্ত্রহীন, তাকে অস্ত্র দেখিয়ে পুলিশ মামলা সাজাতে থাকে, সাবেক ওসি প্রদীপ ও লিয়াকত তারা তাদের অপকর্ম ঢাকতেই কেড়ে নেয় এক সোনালি স্বপ্ন। এভাবে শত শত মানুষকে ক্রস ফায়ার দিয়ে, সাথে অর্থ বাণিজ্য করে সম্পদের পাহাড় করা সেই ওসি প্রদীপ কুমারসহ এই নির্মম হত্যার সাথে জড়িত সকলের খুব দ্রুত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করে শাস্তি চাই।

মোঃ শামসুল আকরাম সুমন

 

মোঃ শামসুল আকরাম সুমন (উচ্চ অখণ্ডতা সিস্টেম বিভাগ ( High integrity System) ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইয়েড সায়েন্সেস, জার্মানি) কোন দেশে হত্যা কখনই কাম্য নয়। আর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রের ইমেজ ক্ষুন্ন হয়। মানবতার কলঙ্ক হয়। সম্প্রতি একজন চৌকস অব. সেনা কর্মকর্তার নির্মমভাবে হত্যার ফলে গোটা জাতি আজ স্তম্ভিত। আমাদের মত তরুণদের মনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার যেন অন্ত নেই। যিনি কিছু দিন আগেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বলয়ের দায়িত্বে।

তার মেধা আর যোগ্যতায় অল্প বয়সেই পদোন্নতি পেয়ে তিনি মেজর পদে আরোহণ করেছিলেন। সেই মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের কথাই বলছি। কিন্তু বিপথগামি ও দুর্নীতি পরায়ন দুই পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তলের গুলির আঘাতে সেই মেধাবী মুখ সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের দেহটি লটিয়ে পড়ে মাটিতে। এই পরিকল্পিত ও নিষ্টুর হত্যাযজ্ঞের খবর দেশের গন্ডি পেরিয়ে তাবৎ দুনিয়ায় নিন্দার ঝড় উঠে।

এ ব্যাপারে শুরু হয়েছে তদন্ত। অজানা এক রহস্যের দানা যেন সব কিছুকে কালো আধারে ডেকে রেখেছে। প্রশ্ন উঠেছে এর নেপথ্যের নায়কদের মুখোশ কি আদৌ উন্মোচিত হবে? ঘুরে ফিরে এমন হাজারো প্রশ্নের জবাব কে দেবে? এ ব্যাপারে সব মহল এখন জেগে উঠেছে। দু:খজন হলেও সত্য সিনহার সহযোগীদের আচরণও এখন সেই জালে বন্দি। এই জট খুলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হোক এটাই আমাদের মত তরুণ দের মনের চাওয়া।

ঢাকা, ০৪ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।