"নারীর প্রতি সহিংসতা আর কবে কমবে?"


Published: 2021-01-18 15:58:22 BdST, Updated: 2021-03-04 05:39:41 BdST

আরোশি আঁখিঃ মহামারীর এই অসুখ হয়তো একদিন সেরে উঠবে, কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা আদৌ কি কমবে??

নারী শব্দটার সাথে অবলা আর অবহেলা শব্দটা যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। মানসিক ও শারীরিক আঘাত সহ্য করতেই মনে হয় নারীর জন্ম হয়েছে। জন্ম থেকে শুরু বৃদ্ধ পর্যন্ত তার দায়ভার বয়ে বেড়ায় কোন না কোন পুরুষ। যেমন বাবা, স্বামী এবং সন্তান। যদিও দিন পাল্টেছে নারীরা গুটি গুটি পায়ে যখন নিজের লক্ষ্যে অর্জনে প্রস্তুত।আবার অনেকে পৌঁছে গিয়েছে সেই মুহুর্তেও কমেনি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা। ঘরে, বাইরে বা অফিসে কোথাও তৈরী হয়নি নারীর শতভাগ নিরাপত্তা।

অবহেলা অবমাননার চাঁদরে মুড়িয়ে রেখেছে তথাকথিত এই পুরুষ সমাজ। যেখানে একজন নারীর পরিচয় মা, মেয়ে,অর্ধাঙ্গিনী সেখানে এই সমাজের কিছু নরপিশাচরা তাদের বিভিন্ন নোংড়া নামে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে যেমন -মাল,সেক্সি, সুন্দরী এগুলো উস্কানিমূলক শব্দ নারীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। বাচ্চারাও পাচ্ছে না এই নরপিশাচদের থেকে মুক্তি। তাই তো এখনই সময় নারীর প্রতি সহিংসতারোধে সবাইকে এক হয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। যখন নারীরা পাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি তখনই দেশ পাবে ভিন্নধর্মী সফলতা এবং পরিচয়।

"হয়তো নারী বটের ছায়া দিতে পারেনি,
কিন্তু নারী নিম গাছের মত সমস্তটা দিয়ে আগলে রাখতে ভুলিনি "

নারী যেই শব্দের সাথে মিশে আছে আমরা সব পারি। না না হয়তো নারীর একার পক্ষে বিশ্বজয় সম্ভব নয় অবশ্য তা পুরুষের দ্বারা ও সম্ভব হয়নি নারীর সহায়তা ছাড়া৷ কিন্তু নারী যেটা পারে তা হলো সহ্য করা। যুগের পর যুগ নারীরা কেবল তাদের সাথে ঘটে যাওয়া সহিংসতা সহ্য করে চলছে। অনেকেই প্রতিবাদের ভাষা জানিয়েছেন তবে অধিকাংশ সবকিছু আড়ালেই চেপে সব পারি শব্দটাকে বাহবা জানিয়েছেন। যদিও শখ করে নয় কেবল লোক লজ্জা ও ভয়ে।

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া সর্বত্র চোখে পড়ে নারীর প্রতি অবমাননা। দিন দিন উন্নয়নের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এই সহিংসতার মাত্রা। একজন নারী যার উপর ঘরে, বাহিরে সব জায়গায় উঠতে বসতে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত হোক বা অপ্রতিষ্ঠিত নারীরা কোথাও পাচ্ছে না সঠিক নিরাপত্তা। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সকলের প্রতি সহিংসতার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী হয়ে জন্মানো কি আজন্ম পাপ হয়ে রয়ে যাবে? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। ইদানীং ফেসবুক নামক সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনেত্রী হোক বা যে কোন নারী তাদের কমেন্ট বক্সে দেখা মেলে একদল বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচয় দেওয়া পুরুষের। এই বিকৃত একদল মানুষ যেন কেবল নারীর ত্রুটি খুঁজতেই ব্যাস্ত।

বিভিন্ন ধরণের পর্যালোচনা থেকে জানা যাচ্ছে নারীরা নানাভাবে হচ্ছে সহিংসতার শিকার।
আর প্রধানত সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে যা তা হলো যৌন নির্যাতনের আধিক্য। করোনা কালে যৌন নিপিড়ন এর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকাংশেই।

তাছাড়া ও ইভটিজিং, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, গলায় ফাঁস দিতে বাঁধ্য করা, অমানবিক নির্যাতন করা ছাড়াও এসিড নিক্ষেপ এর মত ভয়নক জিনিস ও সমাজে বিদ্যমান তবে আগের মত নেই এই বিষয়টা।

জাতিসংঘের "ডেকলারেশন অন দ্য ডেকলারেশন অফ ভায়োলেন্স এগেইন্স্ট উইমেন" থেকে বলা হয়, সহিংসতা হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রকাশ। এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে প্রধান সামাজিক কৌশল গুলোর মধ্যে একটি যার দ্বারা নারীদের কে পুরুষের অধীনস্থ অবস্থানে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়।

২০১৫ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি বিবাহিত মহিলা বা মেয়েরা সঙ্গীদের থেকে নানা মাত্রার নির্যাতনের স্বীকার। এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশ নারী শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হয়েছে। যাদের সিংহভাগ কখনও কাউকে কিছু জানায়নি। ০৩ শতাংশের ও কম ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে কমপক্ষে ২৩৫ জন নারীকে তাদের স্বামী বা স্বামীর পরিবার হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্যমতে নারী ও মেয়েদের জন্য সরকারের ৯ টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কোন একটির মাধ্যমে আইনি মামলা দায়ের করা ১১,০০০ এরও বেশি নারীর মধ্যে কেবল ১৬০ টি ঘটনার সফলভাবে দণ্ডাদেশ এসেছে যা প্রায় এক শতাংশ মাত্র। বাকি কেস বিচারহীনভাবেই রয়ে গেছে।

এখনই সময় টেনে ধরতে হবে নারীর বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া সহিংসতার লাগাম। আর গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ এর দূর্গ৷ ইসলাম ধর্মে যেখানে নারীর সর্বত্তম সন্মান নিশ্চিত করা হয়ছে। সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা অন্যতম ধর্মবিরোধী কাজ বলে গণ্য হয়। একজন নারী সমাজে অনেক গুলো পরিচয় বহন করে তাই তাদের সুরক্ষা অবশ্যই রাষ্ট্র হতে নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব না। ঘরে ঘরে দেখা যাবে এমন সমস্যা বিদ্যমান।

সমাজের নারী পুরুষ সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে এই সমস্যা দূর করতে। সতর্ক করতে হবে প্রতিটা ব্যাক্তিকে। প্রয়োজনে কঠিন থেকেও কঠিন তর আইন তৈরী করতে হবে যাতে সোচ্চার না হলেও আইনের ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। পৈশাচিক স্বভাব কে এড়িয়ে চলে। এক সময় বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা ছিলো এসিড নিক্ষেপ৷ প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে অথবা ব্যাক্তিগত আক্রোশ থেকে এমনকি রাগ থেকেও এমন নির্যাতন চলতো।

পরে যখন আইন কঠিন হয় এই বিষয়ে তারপর থেকে ধীরে ধীরে সমাজ মুক্তি পাই এমন পৈশাচিক কাজ থেকে। তবে ইদানীং যে পরিমান ধর্ষণ হচ্ছে তার সবগুলোর সঠিক বিচার বা তদন্ত নেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে তাই সমস্যা থেকেই যাচ্ছে৷ আইনের যে ভয় তা ভেতরে প্রবেশ না করায় সমাজের নারীরা হচ্ছে লাঞ্চিত। নারী রা সম্মান ও আশ্রয় হারানোর ভয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করে যায়।

তারা সবকিছু মেনে নেয় কারণ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয় নিয়ে ততটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে না যতটা তারা তেলে মাথায় তেল দিয়ে থাকে। নারী পুরুষ সকলকেই ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে হবে তাহলে সকল সমস্যার সমাধান সহজ হবে। পরিবার থেকে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং পরিবার থেকেই সেক্স এডুকেশন নিয়ে বিস্তারিত জানাতে হবে কৌতুহল মিটাতে হবে যাতে করে বাস্তব জীবনে এর প্রভাব না পড়ে আা কৌতুহল না বাড়ে।

সন্তানের সামনে তার মাকে কখনও নির্যাতন দূরে থাক হেয় করে কথা বলা যাবে না এতে বাচ্চার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে হবে। ঘরে সারাদিন পরিশ্রম করা মানুষটাকে মূল্যায়ন করতে হবে। গৃহকর্মীরা অন্যের বাড়িতে কাজ করতে পারে তাই বলে তাদের অসম্মান করা যাবেনা বরং তাদের প্রতি স্নেহশীল হতে হবে।

সরকারকে পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যাবস্হা করা লাগবে। সরকারী বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। নারীর জন্য গড়ে তুলতে হবে এক সুস্থ সমাজ এবং নিরাপদ আশ্রয়। ধর্ষক, ইভটিজারসহ যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সোশ্যাম মিডিয়ায় যারা আজে বাজে কমেন্ট করতে পিছ পা হয়না তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। ইনশাআল্লাহ তাহলেই সমাজ থেকে এই অসুখ বিদায় নেবে।

লেখক: আরোশি আঁখি
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।