"করোনাকালে কেমন আছে প্রকৃতি?"


Published: 2020-08-07 20:18:00 BdST, Updated: 2020-09-30 22:53:26 BdST

আবদুল্লাহ আল মামুন: প্রকৃতির বাহুডোরে মানব সভ্যতা টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। প্রকৃতি মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভালোবাসা দিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির এই ভালোবাসার মূল্য দিতে পারেনি পারছেনা গত কয়েকশ বছর ধরে। মানুষ নিজ প্রয়োজনে প্রকৃতির গাছপালা, পশু-পাখি উজার করে বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে।

নিজেদেরকে আরও উন্নত করে তোলার জন্য গড়ে তুলছে কলকারখানা যার কালো ধোঁয়া বায়ুকে দূষিত করছে, বর্জ্য দূষিত করছে মাটিকে। নিজেদের স্বার্থে প্রকৃতির আশীর্বাদ ভুলে গিয়ে মানুষ প্রকৃতি ধ্বংসের এক হিংস্র খেলায় মেতে উঠেছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাতে ঘরবন্দি জীবনে মানুষের দম যখন আটকে যাওয়ার মত অবস্থা তখন আটকে যাওয়া দমকে নতুন করে নিতে শুরু করেছে প্রকৃতি। করোনা মানুষের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসলেও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ নিয়ে এসেছেই বলা যায়। প্রকৃতি ধ্বংসে মানুষকে যখন কেউ আটকাতে পারছেনা তখন করোনা আটকে দিয়েছে মানুষকে। প্রকৃতি তার আগের রূপে ফিরতে শুরু করেছে, চলতে শুরু করেছে স্বমহিমায়।

দীর্ঘ লকডাউনে পুরা পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা শিথীল হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে বড় বড় কারখানাগুলো। যার ফলে সারা বিশ্বে কমে গেছে কার্বন নিঃসরনের মাত্রা। এপ্রিলের শুরুতে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরন দেখা গেছে তা গত বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বার্ষিক কার্বন নিঃসরন কমপক্ষে ৭% কম হবে যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক জলবায়ু বিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফ বলছে দীর্ঘ লকডাউনে চীনে কার্বন নিঃসরনের মাত্রা কমেছে ২৫ শতাংশ। একই সাথে চীনে কার্বন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নিঃসরন কমিয়েছে ৫০ শতাংশ। একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান সাময়িকী সাইন্টেফিক আমেরিকা বলছে সেখানকার কার্বন নিঃসরন ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। কোপার্নিকাস এটোমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস (সিএএমএস) এবং কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (সি৩এস) বলছে লকডাউনে কার্বন নিঃসরন কমে আসায় ওজন স্তরে যে বিশাল গর্ত আগে তৈরী হয়েছে পৃথিবী তা নিজ থেকেই সারিয়ে নিয়েছে।

কার্বন নিঃসরন এবং অন্যান্য গ্যাসের নিঃসরন কমে যাওয়ায় কমে গেছে বায়ু দূষনের পরিমানও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে নিন্ম মানের বায়ুর জন্য প্রতি বছর পৃথিবীতে শ্বাসজনিত রোগে মারা যায় ৪.৬ মিলিয়ন মানুষ। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্শাল ব্রুকি বলছেন দুই মাস চীনে বায়ু দূষণ কম হওয়ায় সেখানে ৫ বছরের নিচ অন্তত ৪০০০ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা পেয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে অন্তত ৭০০০০ হাজার। গত বছর থেকে ভারতের নয়াদিল্লীতে দূষিত বায়ু মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ালেও এখন সেখানে বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া যাচ্ছে।

এই মহামারীতে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বন ও বন্য প্রাণীরা। বন উজার বন্ধ হচ্ছে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই করোনাকালীন সময়ে আমাজন বনে বন উজার কমেছে আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ। যানবাহন বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ-এপ্রিলে বনগুলোতে বন্য প্রাণীগুলোর মহড়া বেড়ে গেছে, যা আগের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি। আফ্রিকার বনগুলোতে আগের তুলনায় বন্যপ্রানী নিধন কমেছে অনেক। সামুদ্রিক প্রাণীগুলোও অবাধ বিচরন শুরু করেছে যার চিত্র সমুদ্র সৈকতগুলোতে দেখা যাচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র তটে সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর ডিম দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রে দেখা যাচ্ছে ডলফিনের অবাধ বিচরণ। জার্মান পরিবেশ বিজ্ঞানী রেইনার ফ্রোয়েস বলছেন ইউরোপে মাছ শিকার এবং পানিতে দূষণ কমে যাওয়ায় সামনে মাছের জৈববস্তুপুঞ্জ (বায়োমাস) এবার অনেক বেশি পাওয়া যাবে কিছু মাছের ক্ষেত্রে এটা দ্বিগুন হতে পারে।

এদিকে কারখানাগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে পানি দূষণের মাত্রাও আগের তুলনায় কমে গেছে যেটা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য ইতিবাচক। সমুদ্র, নদী এবং খালগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে স্বচ্ছ পানি। পানির নিচে বসবাস করা প্রাণীগুলো পরিষ্কার পানি পেয়ে মেতে উঠেছে আনন্দের খেলায়। ইতালির ভেনিসের খালগুলোতে একেবারে স্বচ্ছ পানি দেখা মিলছে, সেখানে অসম্ভব সুন্দর পানি প্রবাহ দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মার্চের ১৮ তারিখ থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্চের ২৬ তারিখ থেকে অফিস-আদালত, শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সকল গণজমায়েত ও গণপরিবহন চলাচল, সীমিত করা হয়েছে অন্যান্য পরিবহন। যার ফলে সর্বত্র মানুষের আনাগোনা কমেছে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাতে। যে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় তিন লক্ষ যান্ত্রিক পরিহন অবিরাম ধোঁয়া ছেড়ে বিশুদ্ধ বায়ুকে দূষিত করতো সেই রাজধানীও কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি পেয়েছে।

দীর্ঘ লকডাউনে ঢাকা ও এর আশে পাশের কল-কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় ঢাকার আকাশে বায়ু দূষনের পরিমাণ কমেছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার আকাশে বায়ু দূষণের মাত্রা স্বাভাবিক সময়ে ২৫০-৩০০ পর্যন্ত থাকে। লকডাউনের কয়েকদিন পর এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা ১৯৫ ও ১৫৭। আরও কয়েকদিন পর এই মাত্রা নেমেছে ৯৩ তে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হিসাব মতে বায়ু দূষণের মাত্রা ০-৫০ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতিকর নয়, ৫০-১০০ পর্যন্ত সহনীয় অবস্থা।

শুধু বায়ু দূষণই নয় রাজধানীতে লোক সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং লোকজনের অবাধ বিচরণ কমার কারণে কমেছে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ সহ অন্যান্য পরিবেশ দূষণগুলো। ঢাকার আকাশে এখন নেই যানবাহন, কলকারখানার কালো ধোঁয়া। ফলে ঢাকার আকাশ এখন চিরায়ত বাংলার আকাশের মত পরিষ্কার, এখানে দেখা যাচ্ছে সাদা কালো মেঘেদের খেলা, রাতের আকাশে মিট মিট করছে তারকারাজি। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয় অন্যান্য শহর গুলোতেও পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমেছে।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। দূষণ নেই, নেই প্রাণের কোলাহল। পাহাড়গুলো খুঁজে পেয়েছে তার পূর্বেকার সৌন্দর্য। পাহাড়ের ছোট ছোট ঝরণা, লেক আর নদীর পানি এখন এত স্বচ্ছ যে দৃশ্য আগে কেউ দেখেনি। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এখন আর কোলাহল নেই। সৈকতে দেখা যাচ্ছে স্বর্নালি লতা, নানান প্রকারের দুর্লভ ঘাস। সামুদ্রিক প্রাণীরা অবাধে বিচরণ করছে বেলাভূমিতে, ডিম পাড়ছে বালুর মধ্যে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতও যেন তার আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। লাল কাকড়াগুলো এখন পুরা সৈকতকে নিজের মত মনে করে চারদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে বাঁধা দেওয়ার মত কেউ নেই। বন-জঙ্গল গুলোতেও এখন মানুষের অবাধ বিচরণ নেই, নেই বন্যপ্রানী শিকার। সুন্দরবন ফিরে যাচ্ছে তার আগের চেহারায়। সব বন জঙ্গলেই দেখা মিলছে অনেক দুর্লভ প্রজাতির প্রাণীদের।

এই মুহূর্তে করোনাকে যদিও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ বলা হচ্ছে তবে মানুষের মত করোনার কিছু প্রভাব প্রকৃতির উপরও পড়ছে। দীর্ঘ ৫ মাস ধরে এশিয়ার সমুদ্র সৈকতের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে ওশান এশিয়া নামক একটি সংস্থা। তাদের মতে গত পাঁচ মাসে এশিয়ার বিভিন্ন সৈকতে বিপুল পরিমাণ সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস, পিপিইর দেখা মিলেছে। এই সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই পরিবেশের ক্ষতির কারণ।

এগুলো তৈরী হয় ফেব্রিক্স ও প্লাস্টিক দিয়ে যেগুলো বায়োগ্রিডেবল নয় ফলে মাটি দূষণের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে সামুদ্রিক প্রাণীগুলো এইসব রঙিন মাস্ক ও গ্লাভসের প্রতি আকৃষ্ট হয় খুব সহজেই, এগুলো গলাধঃকরণ করতে গিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো মৃত সামুদ্রিক মাছের দেখা মিলতে পারে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক:


শিক্ষার্থী
পরিসংখ্যান বিভাগ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০৭ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।